ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত
ইয়ারা হাওয়ারি
প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০২৩ ০১:৩৮ এএম
টানা কয়েক দিন বোমাবর্ষণের পর ১২ অক্টোবর ইসরায়েলি সরকারের নির্দেশনা আসে। গাজা উপত্যকার উত্তরে বসবাসরত ১ দশমিক ১ মিলিয়ন ফিলিস্তিনিকে দক্ষিণের দিকে স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়। গাজা উপত্যকার ভেতরেই ফিলিস্তিনিদের একমাত্র শহর অবস্থিত। ইসরায়েলি নির্দেশনা ঘোষণার সময় আশ্বাস দেওয়া হয়, ২৪ ঘণ্টার ভেতর তারা নিরাপদেই স্থানান্তর করতে পারবে। সড়কপথে তাদের কোনো বিপদের মুখোমুখি হতে হবে না। ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে অনেকে হেঁটে দক্ষিণমুখে রওনা দেয়। কেউ কেউ ট্রাকে চেপে গাজা উপত্যকা ত্যাগ করে। কতিপয় ‘সৌভাগ্যবান’ ফিলিস্তিনি গাড়িতে তাদের মাল বোঝাই করে ওই স্থান ত্যাগ করে।
বিগত
কয়েক দিন ধরেই গাজা উপত্যকার উত্তরাংশে ইসরায়েল বোমা হামলা চালিয়ে গেছে। একাধারে
বোমাবর্ষণের ফলে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সুযোগও হয়ে পড়ছে মন্থর। ইসরায়েল সরকার
প্রতিশ্রুতি দিলেও তা রক্ষা করছে না। দক্ষিণের দিকে উদ্বাস্তুবাহী কনভয়ের ওপরও
তারা হামলা চালাচ্ছে। ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানাচ্ছে, ইসরায়েলের সেনাবাহিনী জানিয়েছিল সালাহ আল দিন রোডটি নিরাপদ
আশ্রয়ে যাওয়ার পথ হিসেবে সাময়িক সময়ের জন্য নিরাপদ। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর
অভয়বার্তা পাওয়ার পর অসংখ্য মানুষ এই সড়কে ভিড় করে। অক্টোবর ১৩ তারিখেই অন্তত ৭০ ফিলিস্তিনিকে
হত্যা করে ইসরায়েলি সেনারা।
শেষ
পর্যন্ত অনেকেই দক্ষিণমুখে পালাতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু অনেকে যে পালাতে পারেনি এও
সত্য। অনেকের পক্ষে নড়ার ক্ষমতাও নেই। কেউ হামলায় আঘাত পেয়েছে অথবা কেউ একেবারেই
চলাচলের জন্য সক্ষম নয়। অমানবিক এই পরিস্থিতিতে গাজা অঞ্চলে অবস্থিত একাধিক
হাসপাতালের চিকিৎসক ও সেবাকর্মীরা কোনোভাবেই স্থানত্যাগ করতে রাজি হচ্ছে না। কারণ
এমন যন্ত্রণায় কাতরানো মানুষের আর্তনাদ শোনার পর তাদের সামান্য একটু শান্তি দেওয়ার
জন্য হলেও তারা পেছনে রয়ে গেছে। এমন অনেকেই আছে যারা গাজা উপত্যকা ত্যাগ করতে রাজি
নয়। তাদের
ধারণা একবার এই অঞ্চল ত্যাগ করলে আর কোনোদিন ফিরে আসা সম্ভব হবে না। আজীবনের জন্য
উদ্বাস্তু হতে হবে।
১৯৪৮
সালে নাকবার নারকীয় ঘটনার কথা মনে পড়ে। ওই সময় প্রায় সাড়ে সাত লাখ ফিলিস্তিনিকে
বাস্তুচ্যুত করা হয়েছিল। গাজায় অবস্থানরত ফিলিস্তিনিদের মনের অনুভূতি সহজেই বোঝা
যায়। ১৯৪৮ সালে তাদের পূর্বপুরুষরা বাস্তুচ্যুত হয়েছিল এবং এবার তারা একই ঘটনার
শিকার। ইসরায়েল সরকার এই বৈষম্যের কথা জানে। তারা ভালোমতোই জানে ১ দশমিক ১ মিলিয়ন
মানুষকে এক দিনের মধ্যে
স্থানান্তর করা অসম্ভব। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের গাজা উপত্যকা ছেড়ে চলে যাওয়ার
নির্দেশ দেওয়ার পেছনেও উদ্দেশ্য রয়েছে। এ সুযোগে ইসরায়েল সরকার মানবতাবিরোধী
কার্যক্রম চালাতে পারবে। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি যুক্তিই দেবে, হামাস ফিলিস্তিনিদের মধ্যে আত্মগোপন করে আছে।
বিভিন্ন
সংস্থা বলেছে, ফিলিস্তিনিদের
স্থান ত্যাগের নির্দেশ
দিলেও আন্তর্জাতিক আইনের ব্যত্যয় ঘটানোর কোনো সুযোগ তাদের নেই। তারা ইসরায়েলের
নেতৃস্থানীয়দের এই নির্দেশনা পুনর্বিবেচনা করার অনুরোধ করেছে। ইসরায়েল সরকার অবশ্য
একটি জাতিকে সমূলে বিনাশ করার পরিকল্পনা রাখঢাক করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ইসরায়েলের
একাধিক রাজনীতিক এবং মন্ত্রী বিগত এক সপ্তাহ ধরে গাজাকে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়ার
নির্দেশ দিচ্ছেন। তাদের বক্তব্যে মানবিক চেতনার ছিটেফোঁটাও নেই। ইসরায়েলের
প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফিলিস্তিনিদের ‘মানুষরূপী জন্তু’ বলেও অভিহিত করেছেন।
মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্র অন্যদিকে মিসরের ওপর চাপ প্রয়োগ করে চলেছে যেন গাজা ও সিনাই উপত্যকার
মধ্যবর্তী রাফাহ সীমান্ত দিয়ে মানবিক করিডর গড়ে তোলে। ধ্বংসাত্মক এই সময়ে মানুষকে
নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব সবার আগে বর্তায়। উদ্বেগের বিষয় হলো, কেউ যদি গাজা উপত্যকা ছেড়ে চলে যায় তাহলে তাদের আজীবনের
জন্যই এই ভূমিত্যাগ করতে হবে। এটিকে অযৌক্তিক ভয় বলা চলে না। ফিলিস্তিনিদের
ইতিহাসে এমন ঘটনা অসংখ্যবার ঘটেছে। ইসরায়েল সরকার কখনও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মানবিক পরামর্শে কান দেয়নি। আনুমানিক
৭ মিলিয়ন ফিলিস্তিনি স্থায়ীভাবে শরণার্থীর জীবনযাপন করছে। নিজ বাসভূমে তাদের ফিরে
যাওয়ার সুযোগ নেই একেবারেই। গাজার দক্ষিণাংশে ফিলিস্তিনিরা আশ্রয় নেবে নাকি
নিজেদের ঘরেই বিপদ মোকাবিলা করতে থেকে যাবেÑ এই সিদ্ধান্ত এখনও অনেককে ভোগাচ্ছে। অন্যদিকে ইসরায়েলি
সেনারা স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। উন্মুক্ত এক কারাগারের কাঁটাতারের
বেড়ার সামনে অসংখ্য ফিলিস্তিনি ট্যাংক জড়ো হচ্ছে।
ইসরায়েল সরকার এক যুদ্ধাপরাধীকে নিয়োগ দিয়েছে। এই যুদ্ধাপরাধী সেনাদের মধ্যে নৈতিক উৎসাহ বাড়ানোর কাজে নিয়োজিত। ১৯৪৮ সালের দেইর ইয়াসিন গণহত্যার দায়িত্বে থাকা সেনারা এবার স্থল অভিযানে নেমেছে। উদ্দেশ্য একটিই, এদের নিশ্চিহ্ন করে দাও। মুছে ফেল ইতিহাসের পাতা থেকে। পরিবার, সন্তান, স্বজন সবাইকে হটাও। এই প্রাণীদের বাঁচার কোনো অধিকার নেই। এ অভিযানের পরিণাম হবে ভয়াবহ। হামাসের নেতৃত্বকে দুমড়ে-মুচড়ে একাকার করে দেওয়ার এই পরিকল্পনা সফল হবে বলে মনে হয় না। এই স্থল অভিযানের মাধ্যমে ইসরায়েলিরা গাজার উত্তরাঞ্চলের দখল পেয়ে যাবে। ফিলিস্তিনিদের আরও ক্ষুদ্র এক উন্মুক্ত কারাগারে ঠেলে দেবে তারা। গাজার সীমানা ছাড়িয়ে ক্রূর ওই অঞ্চলে হবে তাদের বাস। যেভাবেই দেখুন না কেন, এটি একটি গণহত্যা। একটি জাতিকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার নীলনকশা। নিশ্চিহ্ন করার এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল নাকবার সময়। এখনও চলছে।
আলজাজিরা
থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ : আমিরুল আবেদিন