সম্পাদকীয়
সম্পাদক
প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর ২০২৩ ১৪:২৮ পিএম
‘শুভংকরের ফাঁকি’ শব্দযুগল আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত। শুভংকর সম্পর্কে প্রচলিত গল্পটি হলোÑ প্রাচীন বাংলার খ্যাতিমান এক গণিতজ্ঞ শুভংকর, যিনি শুভংকরী নামক পাটিগণিতের রচয়িতা। মুখে মুখেই জটিল সব অঙ্ক তিনি করে ফেলতে পারতেন, যা মানসাঙ্ক নামে পরিচিত। হিসাবনিকাশের মারপ্যাঁচে সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দিয়ে ফায়দা হাসিল করার কৌশল সমাজে ‘শুভংকরের ফাঁকি’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। একই সঙ্গে স্মর্তব্য, মধ্যযুগীয় কবি ও সংগীতজ্ঞ জ্ঞানদাস তার গীতিকাব্যে লিখেন, ‘সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু/ অনলে পুড়িয়া গেল/ অমিয়া সাগরে সিনান করিতে/ সকলি গরল ভেল।’ ১৪ অক্টোবর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর ‘ডিম এখন আকাশে’ শিরোনামে প্রকাশিত শীর্ষ প্রতিবেদনটি এই গৌরচন্দ্রিকার উপক্রমণিকা ঘটিয়েছে।
১৩ অক্টোবর ‘ডিমে পুষ্টি ডিমে শক্তি, ডিমে আছে রোগমুক্তি’Ñ এই স্লোগান
প্রতিপাদ্য হিসেবে ধারণ করে বিশ্ব ডিম দিবস দেশেও পালিত হয়েছে। কিন্তু ডিম দিবসে ডিম
নিয়ে আরও বেশি অস্বস্তির খবর উঠে এসেছে। আমরা জানি, কয়েক দিন আগে সরকার তিনটি নিত্যপণ্যের
দাম নির্ধারণ করে দিয়েছিল। ডিমও এর অন্তর্ভুক্ত। সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে প্রতি ডজন
ডিম ১৪৪ টাকা হিসেবে খুচরা বাজারে বিক্রি হওয়ার কথা। কিন্তু কার্যত এরপরও ডিমের ডজন
১৫৫-১৬০ টাকার নিচে নামেনি। গত দুদিনের চিত্র তাও ছাপিয়ে গেছে। খুচরা বাজারে ডিমের
ডজন এখন ১৭০-১৭৫ টাকা। ডিমের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকার কারণে কয়েক দিন আগে ডিম আমদানির
অনুমতি দেওয়া হয়। তিন দফায় ১৫ কোটি ডিম আমদানির অনুমতি দেওয়া হলেও এ পর্যন্ত কোনো ডিম
দেশে আসেনি। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, আমদানিকারকরা ডিম আমদানির ক্ষেত্রেও নানা অজুহাত
দাঁড় করিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, আমদানির ওপর ৩৩ শতাংশ শুল্ক আরোপের কারণে সরকার নির্ধারিত
দামে ডিম আমদানি লাভজনক হবে না। অন্যদিকে দেশের ডিম উৎপাদকদের ভাষ্য, ‘পোল্ট্রি ফিডের
শুল্কও চড়া’। তারা আরও বলেন, কৃষি খাতে সার ও বিদ্যুতে যেহেতু ভর্তুকি দেওয়া হয়, সেহেতু
পোল্ট্রি খামারিদেরও সরকারের সহযোগিতা করা উচিত। আমদানিকারক, উৎপাদকসহ বাজার তদারকির
সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ভোক্তার বিড়ম্বনা লাঘবে কোনো ভূমিকা তো রাখেইনি,
উপরন্তু অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজির কৌশল ক্রমেই ধরন পাল্টাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ভোক্তা
আরও বেশি নাকাল।
১৪ অক্টোবর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত ভিন্ন এক প্রতিবেদনে জানা
যায়Ñ পরিকল্পনামন্ত্রী বলেছেন, ‘বাজার নিয়ন্ত্রণ করার শক্তি দুনিয়ার কারও নেই। বাজার
নিজেকেই নিজে নিয়ন্ত্রণ করে। এগুলো নিয়ে তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করা যায়।’ বিদ্যমান বাস্তবতার
প্রেক্ষাপটে পরিকল্পনামন্ত্রীর এই বক্তব্যে আমরা বিস্মিত না হয়ে পারি না। মুক্তবাজার
অর্থনীতি শুধু আমাদের দেশেই নয়, আরও অনেক দেশেই প্রচলিত। মুক্তবাজার অর্থনীতি মানে
নিশ্চয়ই এই নয় যে, বাজারে স্বেচ্ছাচারীরা আস্ফালন করবে, ভোক্তার পকেট কেটে নিজেদের
পকেট স্ফীত করবে। আমরা অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের
দায়িত্বশীলসহ সরকারের মন্ত্রীদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাইÑ এ ধরনের মন্তব্যে অসাধুরা অপকৌশলের
পথ সুগম করার আরও সুযোগ পায়। অতীতে বহুবার সরকারের দায়িত্বশীল কয়েক মন্ত্রী বাজারে
সিন্ডিকেটের কারসাজির কথা স্বীকার করেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, সিন্ডিকেটের হোতাদের হাত কি
আইনের হাতের চেয়েও লম্বা।
গরিবের পুষ্টি ডিম, বয়লার মুরগি, পাঙাশ ও তেলাপিয়া মাছও এখন বৃহদাংশের
ক্রয়সাধ্যের বাইরে। জরুরি খাদ্যপণ্য নিয়ে সিন্ডিকেটের হোতাদের তুঘলকি কাণ্ডের সুযোগ
বিশ্বের অনেক দেশেই বিরল। দেশীয় উদ্যোক্তাদের স্বার্থরক্ষায় পোল্ট্রিশিল্পের সুরক্ষার
তাগিদ ইতোমধ্যে নানা মহল থেকে বহুবার দেওয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র খামারিরা নিজেদের কর্মসংস্থানের
পাশাপাশি অন্যদের কর্মের ক্ষেত্র প্রসারিত করতে সক্ষম হলেও বিদ্যমান বাস্তবতায় এখন
তাদের নিজেদেরই টিকে থাকা দায়। ডিম নিয়ে অস্থিতিশীলতা নিরসন কেন করা সম্ভব হচ্ছে নাÑ
এ প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায়ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদেরই। আমরা জানি, ডিমের বাজার হাতে
গোনা কয়েকটি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সরকার নির্ধারিত দাম কার্যকর না হওয়ার পেছনেও
কি তাদেরই কারসাজি রয়েছেÑ এই জিজ্ঞাসাও সংগতই সামনে আসে। এতদিনেও সরকার নির্ধারিত দাম
কার্যকর করার যথাযথ উদ্যোগ কেন নেওয়া হলো না? সংশ্লিষ্টদের দক্ষতা নাকি সদিচ্ছার অভাব?
খাদ্যপণ্যের বাজারে সরকার কঠোরভাবে হস্তক্ষেপ করার ব্যাপারে অনাগ্রহী থাকলে কোনোভাবেই
তা কল্যাণকর ফল বয়ে আনবে না। ডিম নিয়ে সরকারের উদ্যোগ যেন ‘অশ্বডিম্ব’ প্রসব না হয়।
সত্যিকার অর্থেই আমরা আশু এর কার্যকারিতা দেখতে চাই।