স্মরণ
আফরিদা ইফরাত
প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০২৩ ১১:৩৩ এএম
তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী ইলা মিত্র। সবাই তাকে ‘রানীমা’ বলে ডাকত। ১৯২৫ সালের ১৮ অক্টোবর কলকাতায় ব্রিটিশ সরকারের বাংলার অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেলারেল নগেন্দ্রনাথ সেনের পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ইলা সেন। শিক্ষাজীবন বেথুন স্কুল ও বেথুন কলেজে। কৈশোরে তিনি খেলাধুলায় পারদর্শী ছিলেন। ১৯৩৫-৩৮ সালে রাজ্য জুনিয়র অ্যাথলেটিক চ্যাম্পিয়ন এবং ১৯৪০ সালে জাপানে অনুষ্ঠিত অলিম্পিকে প্রথম বাঙালি মেয়ে হিসেবে নির্বাচিত হন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে অলিম্পিক আসরটি বাতিল হয়ে যায়। ১৯৪৫ সালে মালদহের নবাবগঞ্জ থানার রামচন্দ্রপুরহাটের জমিদার মহিমচন্দ্র মিত্রের ছোট ছেলে রমেন মিত্রের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পর ইলা সেনের নাম ‘ইলা মিত্র’ হয়। স্বামীর উৎসাহে ও সাহচর্যে তিনি কৃষক অধিকার আন্দোলনে নিজেকে যুক্ত করেন।
ইলা মিত্র
‘তেভাগা’ কিংবা ‘সাত আড়ি জিন’ দুটোই সমার্থক। তেভাগা বাংলার প্রতিটি
মানুষ বুঝত। আর সাত আড়ি জিন ছিল আঞ্চলিক শব্দ। নিয়মটা ছিলÑ বিশ আঁটি ধান কাটা-মাড়াই
ও ঝাড়াই করে জোতদারের গোলায় তুলে দিতে হবে। বিনিময়ে কৃষক মজুরি হিসেবে পাবে তিন আঁটি
ধান। এটাই ছিল জিন কাটা। এই তিন আঁটিতে মজুরি পোষাত না বলেই অনেক আগে থেকেই নাচোলের
কৃষকদের মধ্যে বিক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করলেও তা প্রশমিত হতে পারেনি নেতৃত্বের কারণে।
অর্থাৎ তাদের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কেউ ছিল না। পরে কমিউনিস্ট পার্টির কৃষক সংগঠন সেখানে
গেলে কৃষকরা নতুন আশা নিয়ে বুক বাধে এবং সংগ্রাম কমিটির হয়ে আওয়াজ তোলে, সাত আঁটি জিন
দেওয়ার।
১৯৪৮ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোলে ইলা মিত্র আন্দোলনে যুক্ত
হন। তিনি প্রথম সন্তান প্রসবের পর তার শাশুড়ির তত্ত্বাবধানে সন্তানকে রেখে আন্দোলনে
যোগ দিতে নাচোলে যান। তখন ইলা মিত্রের নির্দেশে ফসলের এক-তৃতীয়াংশ এবং তিন আড়ির পরিবর্তে
সাত আড়ি ফসল ভাগচাষিদের পাওয়ার বিষয়টি চালু হয়। প্রথমে ইলা মিত্রকে কৃষকরা বিশ্বাস
করত না; কারণ মিত্র দম্পতি জমিদার। পরবর্তীতে তিনি মিশে যান আন্দোলনে। ধীরে ধীরে নাচোলের
কৃষকরা মিত্র দম্পতিকে বিশ্বাস করতে লাগল। শুধু বিশ্বাস করা নয়, তারা তেভাগা আন্দোলনের
মহীয়সী নেত্রী ইলা মিত্রকে শ্রদ্ধাভরে ডাকতে লাগল রানীমা বলে। তিনি হয়ে উঠলেন নাচোলের
রানীমা।
তেভাগা আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন সাঁওতালদের সঙ্গে পুলিশের এক সংঘর্ষের
পর দুর্ভাগ্যবশত ১৯৫০ সালের ৭ জানুয়ারি ইলা মিত্র রহনপুর স্টেশনের অদূরে পুলিশের হাতে
ধরা পড়েন। কারাবন্দি অবস্থায় অবর্ণনীয় পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন। তার ও কৃষকদের ওপর
নির্মম নির্যাতনের জন্য আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়লেও শেষমেশ জমিদার-জোতদাররা জুলুম ও
শোষণের রাজত্ব টিকিয়ে রাখতে পারেনি। জমিদারের নির্যাতনের দেয়াল ভেঙে কৃষককুলের বিজয়
হয় ১৯৫০ সালে জমিদারিপ্রথা বিলুপ্তির মাধ্যমে। ১৯৫৪ সালে চিকিৎসার জন্য প্যারোলে মুক্তি
পেয়ে তিনি পশ্চিমবঙ্গে চলে যান। সুস্থ হয়ে সেখানেই থেকে যান। তার মহান অবদানের জন্য
পশ্চিমবঙ্গের জনগণ তাকে চারবার বিধান সভার সদস্য নির্বাচিত করে।বিনম্র শ্রদ্ধায় তাকে
স্মরণ করি।