সম্পাদক
প্রকাশ : ১২ অক্টোবর ২০২৩ ১৩:২৫ পিএম
সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলোয়
দালালের দৌরাত্ম্য জেঁকে বসেছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, যেখানেই সেবা সেখানেই দালাল।
আর এ দালালের দৌরাত্ম্যে জেরবার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। ভূমি, খাদ্য, শিক্ষা, বিআরটিএ,
পাসপোর্ট, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস থেকে সরকারি হাসপাতালÑ সবখানেই
দালাল চক্রের আধিপত্য। ভূমি দফতরে দলিলের নকল চাই-পরচা চাই, তাহলে দালাল ধরতে হবে।
হাসপাতালে রোগী ভর্তি করাতে হবে, ধরো দালাল। হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সিট চাই, ধরো দালাল।
অপারেশনের তারিখ এগোতে হবে, ধরো দালাল। পাসপোর্ট করাতে হবে, ধরো দালাল। জন্ম-মৃত্যু
নিবন্ধন সনদে ভুল সংশোধন করাতে হবে, ধরো দালাল। বিআরটিএতে পরীক্ষায় পাস করে চালকের
সনদ তুলবেন, ধরো দালাল। শিক্ষা বোর্ডে সার্টিফিকেটে নাম সংশোধন করাতে হবে, ধরো দালাল।
সিটি করপোরেশন, পৌরসভায় ট্রেড লাইসেন্স করানো প্রয়োজন, ধরো দালাল। এমন দালালনির্ভরতা
সবখানেই। অথচ দালালের দৌরাত্ম্য নিয়ে কথাবার্তা কম হয়নি। সংবাদপত্রে প্রতিনিয়ত দালালের
দৌরাত্ম্য নিয়ে প্রতিবেদনও প্রকাশ পাচ্ছে। কখনও কখনও কর্তৃপক্ষের তরফে সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলো
দালালমুক্ত করতে অভিযানও চলছে। কিন্তু অবস্থার যেন পরিবর্তন নেই। এরকমই দালালের দৌরাত্ম্যের
একটি খবর এসেছে ১১ অক্টোবর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ। ‘দালাল ধরলেই সব সমস্যার সমাধান’
শীর্ষক প্রতিবেদনে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন, বিআরটিএ’র পরীক্ষায় পাস করেও তারা ড্রাইভিং
লাইসেন্স পাচ্ছেন না। নানা অজুহাতে বারবার লাইসেন্সপ্রত্যাশীদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
অথচ যারা দালালের মাধ্যমে অফিস কর্মকর্তাদের সঙ্গে চুক্তি করেছে, তারা দ্রুত লাইসেন্স
হাতে পাচ্ছে। ভুক্তভোগীরা প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদকের কাছে তাদের অভিযোগে
বলেছেন, ‘অফিসের বেশ কয়েকজন কর্মচারী আছেন, যারা দালালপ্রকৃতির নির্ধারিত লোক ঠিক
করে রেখেছেন। এ দালালরাই টাকার বিনিময়ে গ্রাহকের সঙ্গে চুক্তি করে লাইসেন্স দ্রুত
পাইয়ে দেন।’ ভুক্তভোগীদের আরও অভিযোগ, দালালদের মাধ্যমে আড়াই হাজার টাকা দিয়ে অনেকেই
১০ দিনের মধ্যেও লাইসেন্স পেয়েছেন।
সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলোয়
‘দালালরাজ’ প্রতিষ্ঠিত হোক এমনটি কখনোই প্রত্যাশিত নয়। আজকে ‘দালালচক্র’ যেভাবে দেশের
প্রতিটি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে রয়েছে, তাদের দৌরাত্ম্যে প্রতিনিয়ত সেবাপ্রত্যাশী
মানুষের যে ভোগান্তি, পকেট থেকে বাড়তি টাকা বেরিয়ে যাওয়া তা শুধু তিক্ত অভিজ্ঞতাই নয়,
একই সঙ্গে আমাদের দুর্নীতিরও চিত্র। সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় সরকারের বেতনভোগী কিছু অসাধু
কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে যেভাবে বাড়তি উপার্জনের আশায় দালালদের প্রশ্রয় দেওয়ার
অভিযোগ উঠছে, তাও দুর্নীতি রোধের পথে অন্তরায়। দালালচক্রের রমরমা বাণিজ্যের বিরুদ্ধে
ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ থাকলেও তাদের হাত-পা বাঁধা। ফলে ভুক্তভোগীরাও অধিকাংশ সময় নিজেদের
নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে চান না। প্রতিকার পাবেন না জেনেই তারা অভিযোগও জানাতে চান না।
যার উদাহরণ প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনেও রয়েছে। ফলে বিভিন্ন অজুহাতে
বারবার ঘুরতে ঘুরতে হয়রান মানুষকে একসময় দালালেরই শরণাপন্ন হতে হয়। আমাদের প্রশ্নÑ
এ দালালচক্র থেকে কি সাধারণ মানুষের মুক্তি নেই?
শুধু চট্টগ্রাম
বিআরটিএ অফিসেই যে দালালচক্রের সক্রিয়তা রয়েছে, তা তো নয়। বরং সেবা প্রদানকারী সব প্রতিষ্ঠানেই
সক্রিয় এ চক্র। তারা নানানভাবে মানুষকে ভুল বুঝিয়ে প্রতারিত করছে। আমরা অতীতে দেখেছি,
যখনই দালালের দৌরাত্ম্য নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ পায়, তখনই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ
দালালদের ঠেকাতে নিরাপত্তা কড়া করার প্রতিশ্রুতি দেয়। তাদের বিরুদ্ধে সাময়িক অভিযানও
চালান। কিন্তু তার পরই থেমে যায় সব ধরনের নজরদারি। আজকে বিআরটিএ’র লাইসেন্স দেওয়ার
প্রক্রিয়াটি অ্যানালগ থেকে ডিজিটাল সিস্টেমে পরিবর্তিত হয়েছে। তাতে সঙ্গতভাবেই আশা
করা যায়, পরীক্ষায় উত্তীর্ণরা যথাযথভাবে দ্রুততম সময়ে লাইসেন্স হাতে পাবেন। তাদের বাড়তি
ভোগান্তি পোহাতে হবে না। কিন্তু প্রতিবেদনের তথ্য বলছে এর উল্টোটি; যা কোনোভাবেই কাম্য
নয়। প্রত্যেক সেবাগ্রহীতা যেন বিনা আয়াসে সেবা নিতে পারেন, তাকে যেন হয়রান হতে না হয়,
তার থেকে যেন বাড়তি টাকা আদায় করা না হয় সেজন্যই সরকারের নানা উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা।
তার পরও যখন কতিপয় অসাধুর খপ্পরে পড়ে অসহায় মানুষকে দালালের কাছে যেতে হয়, বাড়তি টাকা
খরচ করতে হয় তা দুঃখজনক। আমরা সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলো দালালমুক্ত করতে বলি। সেবাপ্রার্থীদের
ভোগান্তি দূর করতে যাবতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য বলি। যেহেতু সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলোয়
সেবাপ্রার্থীদের হয়রান হওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। দালাল নিয়ে অভিযোগও নতুন নয়। তাই সংশ্লিষ্ট
কর্তৃপক্ষকে অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে যেমন সদর্থক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য
বলি, তেমন দালালের দৌরাত্ম্যের বিরুদ্ধেও কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলি।