স্মরণ
আমিরুল আবেদিন
প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০২৩ ১০:২৯ এএম
আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৩ ১০:৩৬ এএম
১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সরকার ভাষা আন্দোলনের প্রস্তুতি নস্যাৎ করতে ঢাকায় সমাবেশ, মিছিল ও সভার ওপর ১৪৪ ধারা জারি করে। এ ১৪৪ ধারা ভাঙা হবে কি না, এ নিয়ে ছাত্র-রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দেয়। ওইদিন দুপুর ১২টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত আলোচনা হয়। উপস্থিত ছাত্রনেতাদের মধ্যে আবদুল মতিন ও গাজীউল হকের নেতৃত্বে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি’ ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে মত দেয়। ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন কমরেড আবদুল মতিন। পঞ্চাশের দশকে আবদুল মতিনকে ‘ভাষামতিন’ বলে ডাকা শুরু হয়। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস লেখক বদরুদ্দীন উমর, বশীর আল-হেলালসহ আবুল কাসেম ফজলুল হক, হাবিবুর রহমান শেলী, মুস্তফা নূরউল ইসলাম, এম আর আখতার মুকুল, কে জি মুস্তফা তাদের লেখায় ‘ভাষামতিন’ ব্যবহার করেন। ভাষাসংগ্রামী কাজী গোলাম মাহবুব, মহবুব আনাম, আবদুল গফুর, হাসান ইকবাল, এম আর আখতার মুকুল, কে জি মুস্তফা, আলাউদ্দিন আল আজাদ প্রমুখও ‘ভাষামতিন’ সম্বোধন করেন। যার কারণে সবার কাছে তিনি ‘ভাষামতিন’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
ভাষা সৈনিক আবদুল মতিন
সিরাজগঞ্জের চৌহালী
উপজেলার ধুবালিয়া গ্রামে ১৯২৬ সালের ৩ ডিসেম্বর জন্ম আবদুল মতিনের। বাবার কর্মজীবনের
সুবাদে তার ছেলেবেলা কেটেছে পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিংয়ে। সেখানে স্কুলজীবন শেষ করে ১৯৪৩
সালে দেশে ফিরে রাজশাহী গভর্নমেন্ট কলেজে ভর্তি হন। ১৯৪৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে
ভর্তি হন। ১৯৪৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেন এবং পরে মাস্টার্স
করেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে। ১৯৫২ সালে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির
আহ্বায়ক হিসেবে ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আবদুল মতিন।
ভাষা আন্দোলনের
পর তিনি ছাত্র ইউনিয়ন গঠনে ভূমিকা রাখেন। পরে সংগঠনটির সভাপতিও হন। শুরু হয় কমিউনিস্ট
আন্দোলনে সক্রিয় হওয়া। ১৯৫৪ সালে পাবনা জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক হন। মওলানা
ভাসানী ‘ন্যাপ’ গঠন করলে তিনি ১৯৫৭ সালে তাতে
যোগ দেন। ১৯৫৮ সালে তার উদ্যোগে ‘পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) গঠিত হয়। ১৯৯২ সালে বাংলাদেশের
ওয়ার্কার্স পার্টি গঠনে সক্রিয় ভূমিকা ছিল তার। যদিও ২০০৬ সালে ওয়ার্কার্স পার্টি
থেকে তিনি পদত্যাগ করেন। ২০০৯ সালে ওয়ার্কার্স পার্টি পুনর্গঠিত হলে আবদুল মতিন আবারও
যোগ দেন। ভাষা আন্দোলন বিষয়ে তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বই রচনা করেছেন। তার রচিত বিভিন্ন
গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘বাঙালী জাতির উৎস সন্ধান ও ভাষা
আন্দোলন’, ‘ভাষা আন্দোলন কী এবং কেন’এবং ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস’। এ ছাড়া প্রকাশিত হয়েছে তার
আত্মজীবনীমূলক বই ‘জীবনপথের বাঁকে বাঁকে’। তার প্রতিটি বইয়ে রাজনীতি,
দর্শন ও ইতিহাসের সত্তার বহিঃপ্রকাশ রয়েছে।
২০১৪ সালে আবদুল
মতিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের
শিক্ষার্থীদের জন্য নিজের দেহ দান করে গেছেন। তা ছাড়া মরণোত্তর চক্ষুও দান করে গেছেন।
আজীবন দেশহিতব্রতী এই লড়াকুর প্রয়াণ দিবসে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।