× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সমাজ

রাধাপদ রায় সময়ের দুঃসহ স্মারক

দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু

প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০২৩ ১৩:০৪ পিএম

 দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু

দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু

‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’Ñ চণ্ডীদাসের এই চিরন্তন বাক্যটির পাশাপাশি লোকজাগরণের কিংবদন্তি লালন সাঁই বলেছেন, ‘অনন্তরূপ সৃষ্টি করলেন সাঁই/শুনি মানবের উত্তম কিছুই নাই/দেব-দেবতাগণ করে আরাধন/জন্ম নিতে মানবে।’ পুনর্জন্মে অবিশ্বাসী লালন সাঁই আরও আকুতি জানিয়েছেন, ‘কত ভাগ্যের ফলে না জানি/মন রে পেয়েছ এই মানবতরণী/বেয়ে যাও ত্বরায় সুধারায়/যেন ভারা না ডোবে।’ লালন ইহজাগতিকতার হাতছানিতে সাড়া না দিয়ে পারেননি। লালনেরই সৃষ্টি, ‘এমন মানব জনম আর কি হবে/মন যা করো ত্বরায় করো এই ভবে।’ সেই লালনকে তো সমাজের দহন কম স্পর্শ করেনি। দহনে দগ্ধ হচ্ছেন আজও অনেক মুক্তমনা। রাধাপদ রায় তাদেরই একজন। বলবানদের বর্বরতার শিকার রাধাপদ রায় সময়ের দুঃসহ স্মারক।

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার ভিতরবন্দ ইউনিয়নের গোদ্ধারের পাড় গ্রামের বাসিন্দা স্বভাব কিংবা চারণকবি বলে খ্যাত অশীতিপর রাধাপদ রায় মানুষ নামধারী পশুদের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার মর্মস্পর্শী খবর সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে সচেতন অনেকেরই এখন আর অজানা নয়। ৪ অক্টোবর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিকিৎসকরা বলেছেন তার অবস্থা ভালো নয়। রাধাপদের শরীরে সৃষ্ট ক্ষত এতটাই বিস্তৃত ও গভীর যে তার উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। কিন্তু তার আর্থিক সঙ্গতি নেই উন্নত চিকিৎসার। যখন এ লেখাটি লিখছি, তখন রাধাপদের ওপর হামলার দায়ে পুলিশ কর্তৃক মামলার প্রধান আসামীকে গ্রেফতারের খবর মিলে।  হামলাকারীদের পরিচয় সংবাদমাধ্যমে আরও দুই দিন আগেই উঠে এসেছিল।

নাগেশ্বরী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, ‘এ ঘটনায় তিনজনকে আটক করা হয়েছিল, তবে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’ প্রশ্ন হচ্ছে, এমন একটি গুরুতর ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে কাউকে আটক করে শুধু জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত? তা ছাড়া আক্রান্তের পরিবারের সদস্য ও সমাজসচেতনদের বক্তব্য আর নাগেশ্বরী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বক্তব্য এবং সংবাদমাধ্যমে উঠে আসা সর্বশেষ তথ্যের মধ্যে যে অসামঞ্জস্যতা রয়েছে এর ব্যাখ্যা ওই পুলিশ কর্মকর্তা কী দেবেন জানি না। স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, হামলাকারী রফিকুল ইসলাম ও কদুর আলী গংরা ভিতরবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শফিউল আলম শফির মদদপুষ্ট। তা তো হবেই। আমাদের অভিজ্ঞতায় এটুকু স্পষ্ট, সমাজবিরোধী অপশক্তির হোতারা ক্ষমতাবানদের ছত্রছায়াতেই থাকে এবং তাদের ওপর বলবানদের আশীর্বাদও অবিরত বর্ষিত হয়। আমাদের অভিজ্ঞতায় তো এও আছে, এই বলবানদের আশীর্বাদেই নানা ক্ষেত্রে দুষ্কর্মকারীরা পার পেয়ে যায় এবং আশংকার  বাইরে রাখার অবকাশ থাকে না যে, রাধাপদের ওপর হামলাকারীরাও হয়তো পার পেয়ে যাবে।

চারণকবি রাধাপদ রায়ের ওপর হামলা


হয়তো অনেকেরই স্মরণে আছে, কয়েক মাস আগে নরসিংদীর বেলাবোয় ‘পুলকিত আশ্রম’ নামে লালনের আখড়ায় সমবেত বাউল শিল্পী ও সাধুসঙ্গের ওপর কীভাবে দুর্বৃত্তরা হামলে পড়েছিল। ইতঃপূর্বে বগুড়ায় কিশোর বাউলের চুল কেটে ন্যাড়া করার ঘটনাটিও হয়তো অনেকেই বিস্মৃত হননি। রাজবাড়ীতে একসঙ্গে ২৮ বাউলের চুল-দাড়ি-গোঁফ কেটে দেওয়ার ঘটনাও দূর অতীতের নয়। রাধাপদ রায় গান গেয়ে বেড়ান এবং সমাজের অন্ধকার দূর করায় তৃণমূল পর্যায়ে একজন নিবেদিত কর্মী। অশীতিপর রাধাপদ, বাউল শিল্পী কিংবা আমাদের সংস্কৃতিকর্মীরা একটি বিশেষ মহলের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন। সংস্কৃতি ছোবলাক্রান্ত হচ্ছে। এর প্রেক্ষাপট সচেতন মানুষমাত্রেরই জানা। অন্ধকারের কীটরা বরাবরই আলোকে ভয় পায়। তারা আলো নিভিয়ে দিতে চায়।

আমাদের অভিজ্ঞতায় মর্মস্পর্শী নজির হয়ে আছে উগ্রবাদী-প্রতিক্রিয়াশীলরা কীভাবে মুক্তমনা এবং সময়ের সাহসী যোদ্ধা অভিজিৎ রায়, ফয়সল আরেফিন দীপনসহ আরও অনেককেই পৈশাচিক ছোবল বসিয়ে জীবন কেড়ে নিয়েছে। ঘটনা কিংবা প্রেক্ষাপট ভিন্ন হতে পারে কিন্তু অপশক্তির মূল লক্ষ্য একটিই এবং তা হলোÑ প্রগতিশীলদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া। আমাদের সংবিধান দেশের সব নাগরিকের অবাধে নিজস্ব ধর্মপালনের অধিকার যেমন দিয়েছে, তেমনি প্রত্যেকের নিজের মতো করে জীবনযাপনের অধিকারের স্বীকৃতিও দিয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, অন্ধকারের কীটরা এ সবই একদিকে পদদলিত করে চলেছে, অন্যদিকে সংবিধানের ধারাগুলো প্রতিপালনের দায়দায়িত্ব যাদের, তারা তাদের দায়িত্ব পালনে এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষায় ৫২ বছরের রক্তস্নাত বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থতার নজির সৃষ্টি করেছেন। রাধাপদ রায়ের ঘটনাটি এ থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়।

শিল্প ও সংস্কৃতি চর্চার নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংবিধানপ্রদত্ত নাগরিক অধিকার সুরক্ষার নিশ্চয়তা চাই। সরকার কিংবা প্রশাসনের দায়িত্বশীলদের এক্ষেত্রে ব্যর্থতার ব্যাখ্যাও চাই সুস্পষ্টভাবে। অপরাধীদের চারণভূমি হয়ে উঠবে সমাজ আর দায়িত্বশীলদের কিছুই করার থাকবে না, তা তো হতে পারে না। বহু মত ও পথের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে যে টেকসই সমাজ, সেই সমাজ গঠনের অন্তরায় অপশক্তির সমূলে উৎপাটন করার দায়ের বিষয়টিও যেন দায়িত্বশীলরা ভুলে না যান। তবে এও সত্য, নাগরিকদের অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে শুধু প্রশাসনিক তৎপরতাই যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে প্রয়োজন রাজনৈতিক ও সামাজিক সব শক্তির যূথবদ্ধ সক্রিয়তা। এই সক্রিয়তা শুধু জাতীয় সংহতি কিংবা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার প্রয়োজনেই নয়, নাগরিক অধিকারের অন্যতম মুখ্য বিষয় হিসেবেও সর্বাগ্রে আমলে রেখে দায়িত্বশীলদের ন্যায়সঙ্গত ভূমিকা পালন করতে হবে। একজন নাগরিক তার অধিকারের সুরক্ষাবলয়ের বাইরে কোনোভাবেই থাকতে পারেন না এবং তিনি তার সাংস্কৃতিক কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে আক্রান্ত হবেন তাও কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সংখ্যালঘু কিংবা সংখ্যাগুরু প্রশ্ন এক্ষেত্রে অবান্তর, বরং প্রশ্ন হলো রাষ্ট্রের সব নাগরিকের সমান অধিকারের।

শিল্পীদের শিল্পচর্চা কিংবা সংস্কৃতিকর্মীদের কর্মকাণ্ড বা মত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অবশ্যই রাষ্ট্রকে অঙ্গীকার অনুযায়ী ভূমিকা পালন করতে হবে। রাধাপদ রায়ের অধিকার ক্ষুণ্নের এবং তার ওপর নির্যাতনের ন্যায়বিচার চাই। পুলিশ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষেরই এসব ব্যাপারে অজুহাত দাঁড় করানোর অবকাশ নেই। বলবান কিংবা দুর্বৃত্তদের শক্তির জোরে কিংবা নখরাঘাতে সমাজে ক্ষত সৃষ্টি হতেই থাকবে আর দায়িত্বশীলরা খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করিয়ে পার পেয়ে যাবেন, তা তো কোনোভাবেই হতে পারে না। রাধাপদ রায়ের তরঙ্গমুখর নদী হওয়ার বাসনা যদি সমাজের কীটদের চোখে অপরাধ হয়ে থাকে, তা হলে সেই কীটদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে সুবিচারের মাধ্যমে জানিয়ে দিতে হবে মনুষ্য বসবাসের উপযোগী সমাজ গঠনে তারা অন্তরায় এবং এজন্য তারা পরিতাজ্য। তাদের কোনো ছাড় নয়। অশীতিপর রাধাপদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার পথ মসৃণ করতে চিকিৎসাসহ সব ব্যবস্থা রাষ্ট্রেরই করা উচিত। কীটদের বিচরণক্ষেত্র বন্ধ করতেই হবে।

  • সাংবাদিক, কবি
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা