প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০২২ ১৮:৫২ পিএম
আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২২ ১৯:৩৬ পিএম
সারা বিশ্বেই অর্থনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। কোভিড-উত্তর বিশ্ব অর্থনীতিতে একদিকে চাহিদা বেড়েছে (সব দেশেই প্রচুর প্রণোদনার অর্থ ঢালা হয়েছিল বলে এবং অনেক দিন পরে ব্যবসা-বাণিজ্য খুলে যাওয়ার কারণে) এবং অন্যদিকে সরবরাহ চেইন ভেঙ্গে পড়েছিল (তাই জাহাজ ভাড়া পাঁচ-ছয় গুণ বাড়ে)। সরবরাহ ঘাটতির কারণে আমদানিমূল্য অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ফেড) বাজার থেকে অর্থ শুষে নেওয়ার কৌশল হিসেবে উপর্যুপরি তার মৌলিক বা নীতি সুদের হার বাড়াতে থাকে। এরই মধ্যে ফেড তিন শতাংশের মতো নীতি সুদ বাড়িয়েছে। সুদের হার বাড়ার কারণে ডলারের দামও বাড়ছে। মূলত মার্কিন মুল্লুকে মূল্যস্ফীতি বাগে আনার জন্যই ফেড এমন আগ্রাসী মুদ্রানীতি পরিচালনা করছে। এর ফলে উন্নত দেশগুলোর মুদ্রার সম্মিলিত গড় দামের চেয়ে শতকরা প্রায় পনের ভাগ বেড়ে গেছে ডলারের দাম। তাই বাধ্য হয়ে ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যসহ সব ধনী দেশই তাদের পলিসি রেট বাড়াচ্ছে। কেননা তাদের মূল্যস্ফীতি নয়-দশ শতাংশে পৌঁছে গেছে।
উন্নত বিশ্বে লাগাতার সুদহার বাড়ানোর প্রভাব আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশেও পড়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতসহ প্রায় সব দেশেই পলিসি রেট বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি এসব দেশের মুদ্রার মানের ব্যাপক অবমূল্যায়ন করতে হয়েছে। ফলে আমাদের আমদানি খরচ ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে। সেই তুলনায় আমাদের রপ্তানি ও প্রবাসী আয় বৃদ্ধি ততটা বাড়েনি। তাই বাণিজ্যিক ও চলতি হিসেবে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দেয়। আর সেই কারণে সার্বিক লেনদেনে বিরাট ফারাক তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে আবার আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমতে শুরু করে। ডলারের দাম স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক এক বছরে প্রায় দশ বিলিয়ন ডলার বাজারে বিক্রি করেছে। এর ফলে বাজার থেকে সমপরিমাণের বাংলাদেশি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা হয়েছে। তাই কোনো কোনো ব্যাংকে তারল্য ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
অন্যদিকে বিশ্ব তেল ও গ্যাসের বাজারে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ যে কবে থামবে তা কেউ বলতে পারছেন না। এমনিতেই রাশিয়ার গ্যাস ও তেল পেতে ইউরোপসহ অনেক দেশেই সমস্যা হচ্ছে। কেননা রাশিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর নানা ধরনের স্যাঙ্কশন জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। তেল ও গ্যাসের বিশ্বসরবরাহ কমে গেছে। এর মধ্যে আবার ওপেক ও আরও কয়েকটি দেশ সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রতিদিন দুই শতাংশ তথা বিশ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন কমিয়ে দেবে। এখনই প্রতি ব্যারেল তেলের দাম নব্বই ডলারের মতো। এই সিদ্ধান্তের পর তেলের সরবরাহ কমে যাবে বলে তার দামও বাড়বে বলেই মনে হয়। আর গ্যাসের বিশ্ববাজার তো ইউরোপের চাহিদা মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি মূল্য এবং ডলারের বাড়ন্ত মূল্য আমাদের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির ওপর কতটা চাপ সৃষ্টি করবে, তা সহজেই অনুমান করা যায়। তদুপরি বিশ্ব খাদ্য সংস্থা এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি হুঁশিয়ারি দিচ্ছে যে আগামী বছর বিশ্বজুড়েই ব্যাপক খাদ্যঘাটতি দেখা দেবে। চলতি বছর সারা বিশ্বেই যে জলবায়ু পরিবর্তনের উথালপাথাল দেখা গেছে, তাতেই খাদ্য উৎপাদন নিয়ে এই আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তা ছাড়া বিশ্বের শস্যভাণ্ডার বলে পরিচিত ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ায় যুদ্ধ চলতে থাকায় তাদের কৃষি উৎপাদন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধের কারণে খাদ্য পরিবহনেও সমস্যা হচ্ছে।
আমাদের মতো দেশে এই যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গম ও ভোজ্য তেলসহ অনেক খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে গেছে। সরবরাহ পেতেও অসুবিধা হচ্ছে। এ সবই আমাদের আমদানি মূল্যস্ফীতি বাড়ানোর পেছনে কাজ করছে। আর এ বছর আমাদের দেশসহ এই অঞ্চলে বর্ষাকালে বৃষ্টি হয়নি। তবে বর্ষাকালের শেষপ্রান্তে এসে বেশ বৃষ্টি হয়েছে। এর ইতিবাচক প্রভাব আমন ফসলের ওপর পড়বে বলে মনে হয়। জমিতে রস থাকবে বলে বোরো ধান উৎপাদনেও কম সেচ লাগবে। তা সত্ত্বেও বিশ্ব খাদ্য পরিস্থিতি মোটেও সুবিধার মনে হচ্ছে না। সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যাপক হারে কমে যাবে বলে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ তাদের অর্থনৈতিক আউটলুক বা প্রক্ষেপণে একাধিকবার বলেই চলেছে। আইএমএফ আশঙ্কা করছে, আগামী বছর বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২.৯ শতাংশ হবে।
আমাদের সংকট মোচনের বড় রক্ষাকবচের নাম কৃষি। কৃষি শুধু আমাদের খাদ্যই জোগান দেয় এমন নয়, আমাদের কর্মসংস্থানের চল্লিশ শতাংশ এবং শিল্প খাতের কাঁচামাল ও চাহিদাও জোগায়। সে কারণেই প্রাকৃতিক ও মানুষের তৈরি মহাসংকটেও বাংলাদেশ তার কৃষি ও ছোটখাটো উদ্যোক্তাদের ওপর ভর করে ঠিকই ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে। হালের কোভিড-১৯ সংকট উত্তরণেও বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সরকার হাতে হাত রেখে জিডিপির ছয় শতাংশের মতো প্রণোদনা কর্মসূচি পরিচালনায় এগিয়ে এসেছে। এরই ধারাবাহিকতায় রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে তৈরি বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একদিকে ম্যাক্রো অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য নানামাত্রিক উদ্যোগ নিচ্ছেন, অন্যদিকে এক ইঞ্চি জমিও যেন পতিত না থাকে সেই ধরনের মাইক্রো নীতির ওপরও জোর দিচ্ছেন। ইতোমধ্যে ডলার সংকট মোকাবিলার জন্য বিনিময় হার খানিকটা নমনীয় করা হয়েছে। মনে হয় রপ্তানিকারক, প্রবাসীরা এবং আমদানিকারকদের জন্য একটি ব্যান্ডযুক্ত একক বিনিময় হার চালু করা জরুরি হয়ে পড়েছে। তা না হলে এই তিন অংশীজনের মাঝে ডলারের মূল্য নিয়ে টানাপোড়েন বাড়ছে। অযথা স্পেকুলেশনও বাড়ছে। এর সুযোগ নিচ্ছে হুন্ডিওয়ালারা।
তাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও বিএফআইউর যৌথ উদ্যোগে নিয়ন্ত্রণে আনতেই হবে। আর এলসি মনিটরিং আরও জোরদার করে ট্রেড ফাইন্যান্সিংয়ের মাধ্যমে অর্থপাচারে ছিদ্রগুলো অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে আমরা স্বকীয় দেশজ অনেক অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নীতিকৌশল উদ্ভাবন করে চলেছি। পরীক্ষিত এসব নীতিকাঠামোর ওপর ভরসা করে হিসাব করে পা ফেললে নিশ্চয় চলমান মন্দা বা আগামী দিনে মহামন্দা মোকাবিলা করেই বাংলাদেশের উন্নয়নের সুনাম ধরে রাখতে পারব। সে জন্য সকল অংশীজনের সঙ্গে নিবিড় নীতি আলাপের সংস্কৃতি খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে গড়ে তুলতে হবে।
লেখক : বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর
তৌহিদ