সমাজ
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১১:৫২ এএম
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
আমরা নিত্য বলি, বলি আমরা সবাই, বলে বলে ক্লান্ত ও হতাশ হই, গ্লানিতে পায়; কর্তাব্যক্তিরা
অন্তঃসারশূন্য সব কথা বলতে থাকেন, আমরা শুনি, আমাদের ক্ষোভ বাড়ে। উথলে ওঠে বিদ্রোহ।
দুর্ভোগ বাড়তেই থাকে; খুন, গুম, হত্যা ও ধর্ষণ, বাড়ছে তো বাড়ছেই। এর উপসংহারটা কোথায়,
কোন সিদ্ধান্তে গিয়ে আমরা পৌঁছাব? বস্তুত ওই সিদ্ধান্তটাই হলো প্রধান, নইলে আমাদের
কথা কর্তাদের কথার চেয়েও মূল্যহীন হয়েই থাকবে।
সিদ্ধান্তটা কিন্তু খুবই সরল। সেটা এই, ব্যবস্থাটা বদলাতে হবে, নইলে আমাদের মুক্তি
নেই। বুঝতে হবে যে ব্যবস্থাটা পুঁজিবাদী। অপরাধ ব্যক্তিই করছে, তাকেই দেখা যাচ্ছে সামনে,
কিন্তু মূল অপরাধী হচ্ছে ব্যবস্থাটা। সে-ই আসল অপরাধকারী। সে লুকিয়ে থাকে। এই অপরাধীকে
চিহ্নিত করা দরকার এবং তাকে বিদায় করা চাই। সংশোধনে কুলাবে না, সংস্কার তো সংরক্ষণেরই
পদক্ষেপ। উদারনীতিকরা সংস্কার, সংশোধন ইত্যাদি চিকিৎসার কথা ভাবেন, ব্যবস্থাপত্র দেন,
কিন্তু তাতে অপরাধীর স্বভাবচরিত্রে ও অপরাধলিপ্সায় যে কোনো পরিবর্তন আসছে তা মোটেই
না। এখন তো দেখা যাচ্ছে ব্যবস্থাটা আরও বেশি মরিয়া ও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে, মরণকামড় বসাচ্ছে,
পৃথিবীর সর্বত্র নিকৃষ্টমানের মানুষ সর্বাধিক ক্ষমতাবান হয়ে উঠছে, তারা সবকিছু তছনছ
করে দেওয়ার ব্রত নিয়েছে। পৃথিবী নামের এ গ্রহটিতে মানুষ আর টিকে থাকতে পারবে কি না
সেই প্রশ্নও দেখা দিয়েছে।
ইতোমধ্যে বিশ্বের অন্যত্র যেমন, তেমন বাংলাদেশে আমরা দেখছি যে পুঁজিবাদীরা নিজেদের
‘আলোকিত স্বার্থ’ যে রক্ষা করবে তার ব্যবস্থাটাও অক্ষুণ্ন রাখতে পারছে না। বুর্জোয়া
গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় যে সংসদীয় নির্বাচনব্যবস্থা তা-ও ভেঙে পড়েছে। অর্থাৎ ভেঙে
ফেলা হচ্ছে। এক পায়ের ওপর ভরসা করে দাঁড়ানোর জন্য সে ব্যর্থ কসরত করছে। তা নির্বাচনব্যবস্থা
না থাকলে কী ঘটতে পারে? হয়তো নৈরাজ্য আসবে। হয়তো অভ্যুত্থান ঘটবে। বামপন্থিরা এমন শক্তিশালী
অবস্থানে নেই যে তারা অভ্যুত্থান করবে, অভ্যুত্থান করলে করবে রক্ষণশীলরা। তেমন ঘটনা
নিশ্চয়ই মঙ্গলজনক হবে না।
পুঁজিবাদ ব্যক্তিস্বার্থকে প্রধান করে তোলে, স্বার্থবোধের গোপন জায়গাটায় নীরবে
ঘা দিয়ে ব্যক্তির ভেতরের মুনাফালিপ্সাটা জাগিয়ে তোলে। সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী ‘সাহিত্যে
চাবুক’ নামে একটি প্রবন্ধে বলেছেন, বাংলা ভাষায় ‘মি’ প্রত্যয়যুক্ত শব্দগুলো খুবই নোংরা;
ভণ্ডামি, ইতরামি, বাঁদরামি, গুণ্ডামি, নোংরামি, ভাঁড়ামি সবকিছুতেই ওই ‘মি’ হাজির; তবে
মানুষের জন্য সবচেয়ে সর্বনেশে হচ্ছে ‘আমি’; কারণ ওই পদার্থটির আধিক্য ঘটলে বিদ্যাবুদ্ধি
কাণ্ডজ্ঞান সব লোপ পায়। এখন সর্বত্রই কিন্তু ওই ‘আমি’র তাণ্ডব। মধ্যযুগের কবি যে গেয়েছেন
গান, ‘আপন আপন করে তুই হারালি তোর যা ছিল আপন’, সেটা এখন অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায়
জাজ্বল্যমান রূপে সত্য। আমার ‘আমি’ এখন আমরা হতে চায় না; আর হয় যদি তবে ‘তোমাদের’ সঙ্গে
যুদ্ধ বাধায়। বোধ ও বিবেক-সম্পন্ন মানুষ বলবেন আজ প্রয়োজন সর্বজনীন ‘আমরা’ হওয়া। বলবেন,
তার জন্য সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি আবশ্যক। আসলে সাংস্কৃতিক প্রস্তুতিও যথেষ্ট নয়, দরকার
হবে রাজনৈতিক কাজ, সে-কাজের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের পুঁজিপন্থি ভূমিকার অবসান ঘটল। সমাজ
পরিবর্তন ছাড়া সেটা কিছুতেই সম্ভব নয়।
পরিবর্তনের জন্য অত্যাবশ্যক সাংস্কৃতিক কাজটি বাংলাদেশে আমরা করছি কি? না, করছি
না। যেমন ধরা যাক, পাঠাগার। পাঠাগারে গিয়ে তো মানুষ একত্র হতে পারে। বইকে কেন্দ্র করে
মেলামেশা সম্ভব। কিন্তু মানুষ তো এখন আর বই পড়ায় আগ্রহী নয়, পড়লেও পাঠাগারে যায় না;
ইন্টারনেট, ওয়েবসাইটে টেপাটেপি করে ঘরে বসে যান্ত্রিক বই সংগ্রহ করে নিয়ে কোনায় বসে
বসে পড়ে। পাঠাগার কেবল বই সংগ্রহের জায়গা হলে সেখানে লোক পাওয়া কঠিন হবে; হচ্ছেও। পাঠাগারকে
সংস্কৃতিচর্চার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা দরকার। পাঠাগার হবে সামাজিকভাবে মিলবার একটি
জায়গা, যেখানে মানুষ কেবল বই পড়ার জন্য যাবে না, নানা ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের
আকর্ষণেও যাবে। পাঠাগার হওয়া চাই একটি আশ্রয়কেন্দ্র, যেখানে বই নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি
নাটক, গান, আবৃত্তি, বিভিন্ন দিবস উদযাপন, আলোচনা, বক্তৃতা, খেলাধুলা, শরীরচর্চা প্রতিযোগিতা,
অনেক কিছুর আয়োজন করা সম্ভব। সেটা করা গেলে বিকাল হলেই মানুষ ওই আশ্রয়ের দিকে রওনা
হবে। ছাত্র, কর্মচারী, শিক্ষক, অবসরভোগী, শ্রমিক, কৃষক, রাজনৈতিক কর্মী সবাই আসবে।
মিলবে, মিশবে; সামাজিক হবে। আলোচনা করবে ব্যবস্থা পরিবর্তনের মতাদর্শ নিয়ে। সবকিছুর
ভেতরই মতাদর্শিক বিবেচনাটা থাকবে, মিছরির ভেতর যেমন সুতো থাকত, যে সুতো ছাড়া মিছরি
তৈরি করার কথা ভাবা যেত না।
স্বাধীনতার পর মনে হয়েছিল দেশে একটি নাট্যান্দোলন শুরু হবে। শুরু হয়েছিল, কিন্তু
এগোয়নি। শিল্পীরা চলে গেছেন টেলিভিশনে ও সিনেমায়। তেমন গান গাওয়া যায়নি যা মানুষকে
একই সঙ্গে আনন্দ দেবে এবং উদ্দীপ্ত করবে। কবিতা লেখা হচ্ছে ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতা নিয়ে,
তাতে দুঃখের দুর্বিষহতা যত পাওয়া যাচ্ছে, গভীর কোনো দার্শনিকতা তত পাওয়া যাচ্ছে না।
মোট কথা, বিদ্যমান অন্ধকারে মননশীলতা ও সৃজনশীলতার আলো জ্বালা চাই, যে আলো সম্ভব করবে
সাংস্কৃতিক জাগরণের এবং পথ দেখাবে সামাজিক বিপ্লবের, যার মধ্য দিয়ে উৎপাদনব্যবস্থা
বর্তমান পুঁজিবাদী স্তরে আর আটকে থাকবে না, বন্ধন ভেঙে সমাজতান্ত্রিক স্তরে উন্নীত
হবে। জীবনে আসবে প্রাচুর্য, জীবনযাপন হবে আনন্দময়। সে কাজ একা কেউ করতে পারবে না, অল্প
ক’জনে কুলাবে না; তার জন্য পাড়ায়-মহল্লায়, যেমন শহরে তেমন গ্রামে-গঞ্জে, সকল প্রকার
বসতিতে সংস্কৃতিকেন্দ্র গড়ে তোলা চাই। ওইখানে পরিবর্তনকামী মানুষের সাংস্কৃতিক লালনপালন
চলবে, যে মানুষ সোৎসাহে রাজনীতিতে যোগ দেবে। রাজনীতি বুর্জোয়াদের ক্ষমতা-পরিবর্তনের
ক্রীড়া-কৌতুকে সীমিত থাকবে না, হয়ে দাঁড়াবে বিপ্লবীদের সমাজ পরিবর্তনের পদক্ষেপ।
পৃথিবীব্যাপী আজ পুঁজিবাদবিরোধী চেতনা প্রখর হয়ে উঠেছে; সেই চেতনা সামাজিক বিপ্লবের
পথে এবং সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে অগ্রসর করার ওপরই কিন্তু
নির্ভর করছে মানবজাতির ভবিষ্যৎ। মধ্যযুগের কবির একটা পরামর্শ ছিল : ‘এবার তোর ভরা আপন
তুই বিলিয়ে দেরে যারে তারে।’ ওই পরামর্শে কিন্তু কুলাবে না। কেননা বিপদটা হবে এই যে,
আমার আপন যদি আপনে ভরপুর হয়ে যায়, যদি ভারী হয়ে ওঠে স্বার্থে ও সম্পদলিপ্সায় তবে সে
‘আপন’ নির্ঘাৎ ডুববে এবং নিজে ডোবার আগে অন্যদের ভরাডুবি ঘটাতে চাইবে এবং তাতে সবারই
হবে ডোবার দশা। সেটাই এখন ঘটছে বিশ্বময়। আমার ‘আপন’ ভাসবে যদি নিজে ভারী না হয়ে অন্যের
সঙ্গে একত্রে ভাসতে চায় তবেই। মুশকিল যা ঘটাবার ঘটাবে সম্পদের ব্যক্তিমালিকানা। ঘটাচ্ছেও।
মানুষের পক্ষে তাই মানুষ থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে, সামাজিকতা হারিয়ে সে অধম হয়ে পড়ছে বন্য
প্রাণীরও।
ক্ষমতাধর ও বচনবাগীশরা যা ইচ্ছা বলুন, বলতে থাকুন, আসল কথাটা হলো সমাজ পরিবর্তন। সেটা যেন না ভুলি। এটাও যেন না ভুলি যে পালাবার কোনো উপায় নেই, পালালেও বাঁচা যাবে না এবং বাঁচা মানে কেবল টিকে থাকা নয়, মানুষের মতো বাঁচা। কিন্তু আমরা বাঁচব, অবশ্যই জয়ী হব, যদি আমরা লড়াইয়ে থাকি। ভরসা এই যে, আমরা একা নই। বিশ্বজুড়ে মানুষ এখন লড়াইয়ে আছে। প্রতিটি সমাজেই ব্যক্তিমানুষ যতই সন্ত্রস্ত হোক, ভয় পাক, সমষ্টিবদ্ধ মানুষ লড়ছে এবং লড়তে গিয়েই বুঝে নিচ্ছে যে বাঁচতে হলে লড়তে হবে। বাঁচার সঙ্গে মরার যে লড়াই তাতে পরাজয়ের কোনো স্থান নেই। ইতিহাস এগোচ্ছে এবং এগোবেই। ইতিহাসে বাঁক আছে, কিন্তু থেমে যাওয়া নেই। ইতিহাস এগিয়ে নেওয়ার সংগ্রামে আমরা বাংলাদেশের মানুষও আছি। অতীতে ছিলাম, আছি বর্তমানে এবং থাকব ভবিষ্যতেও। তবে ইতিহাস এমনি এমনি এগোয় না; তার জন্য সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি চাই, অনুশীলন চাই জ্ঞানের ও সৃজনশীলতার। সবার ওপরে চাই সংঘবদ্ধতা।