পরিপার্শ্ব
ডা. লিপি বিশ্বাস
প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১২:৪৩ পিএম
আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১২:৪৪ পিএম
জামালপুরে গান্ধী আশ্রমে অন্যদের সঙ্গে লেখক। প্রবা ফটো
১৯৩৪ সাল। উপমহাদেশে স্পষ্ট হয়ে উঠে মহাত্মা গান্ধীর অহিংস
আন্দোলনের প্রভাব। সে সময় গান্ধীজির মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রবাদপ্রতিম নেতা
নাছিরউদ্দিন জামালপুরে গড়ে তোলেন ‘গান্ধী আশ্রম’। এ আশ্রমে স্বদেশি খাদি কাপড়
বুনন, খেলাধুলা, শরীরচর্চা, হস্তশিল্প, কারুশিল্পসহ নানা কার্যক্রম পরিচালিত হতো। মোট
কথা যুবসমাজকে অনুপ্রাণিত করাই এ আশ্রমের মূল উদ্দেশ্য ছিল। ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর দ্রুত
বদলে যেতে থাকে উপমহাদেশের রাজনৈতিক পটভূমি। গান্ধী আশ্রমও ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
কিন্তু কীভাবে যেন টিকে থাকল কেবল আশ্রমের অফিসঘরটি।
একসময় আরও বদল আসে উপমহাদেশের মানচিত্রে। স্বাধীন সার্বভৌম
রাষ্ট্র বাংলাদেশে নাছিরউদ্দিন সরকারের তৃতীয় প্রজন্মের উত্তরসূরি হিল্লোল সরকারসহ
স্থানীয় জনগণের প্রচেষ্টায় আবারও পুনর্গঠিত হয় আশ্রমটি। গড়ে তোলা হয় মুক্তিযদ্ধ জাদুঘর।
মূলত গান্ধী আশ্রম নাম হলেও এখানে আমাদের উপমহাদেশের গৌরবোজ্জ্বল পরিচয়ই তুলে ধরার
চেষ্টা করা হয়েছে। ব্রিটিশ শাসন পার হয়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর হাত থেকে মুক্ত
হওয়া স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পথপরিক্রমার সমৃদ্ধ ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে
অত্যন্ত যত্নসহকারে। এ আশ্রমে গেলে সীমিত পরিসরে কিন্তু সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ সৃষ্টির
পটভূমি জানা হয়ে যাবে যে-কারওই। বর্তমানে ট্রাস্টি বোর্ডের পরিচালনায় একটি
গেস্টহাউসও আছে ওখানে।
যে-কেউ চাইলে পরিবার-পরিজন নিয়ে রাতযাপনও করতে পারেন আশ্রমে। আমরা
জামালপুরে গিয়েছিলাম পারিবারিক এক আনন্দ ভ্রমণে। গান্ধী আশ্রম সেদিন আমাদের মুগ্ধ
করেছে স্বভাবতই। আশ্রমের পাশাপাশি আরও দেখেছিলাম ঐতিহাসিক দয়াময়ী মন্দির, হজরত
শাহজামাল (রহ.)-এর মাজার (যার নামানুসারে জামালপুরের নামকরণ), নদীর পাড়, ইস্কন
মন্দির আর ফেরার পথে টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী নবাব প্যালেস। এক দিনের জন্য পরিপূর্ণ একটা
ট্যুর। গান্ধী আশ্রম বলতে গেলে নিজস্ব আর্থিক পরিচালনায়ই চলছে। দর্শনার্থীদের জন্য
নির্ধারিত নামমাত্র প্রবেশমূল্য, তাদের স্বেচ্ছা অনুদান এবং স্থানীয় জনগণ ও
প্রশাসনের উদ্যোগেই চলছে আশ্রমের কার্যক্রম। সুতরাং অনেক বেশি অর্থের জোগান যে আছে
তেমনটাও নয়। কথা বলছিলাম এর বর্তমান অভিভাবকদের একজন এবং নাছিরউদ্দিন সরকারের
পৌত্র হিল্লোল সরকারের সঙ্গে।
তিনিও বললেন তারা চান না তথাকথিত আড়ম্বরপূর্ণ প্রচার। তাতে হয়তো আশ্রমের ভাবগাম্ভীর্য রক্ষা করা কিছুটা কঠিন হবে। লোকমুখে শুনে শুনে যারা আসবেন তারা তাদের সাদরে গ্রহণ করতে চান। ভেবে দেখলাম কথাটা অনেকাংশেই যৌক্তিক। তারা আশ্রমটাকে একেবারেই নিজেদের অস্তিত্ব মনে করেন। নিজেদের জায়গায়ই বংশানুক্রমিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে এ আশ্রম। অনেক সময় আশ্রমের অনেক কাজ নিজের হাতেই সেরে নিচ্ছেন অযথা ব্যয়ভার কমাতে। সম্পূর্ণ ব্যক্তি উদ্যোগে এরকম সমৃদ্ধ একটি সংগ্রহশালা গড়ে তোলা চাট্টিখানি কথা নয়। তবে ওই যে যুগে যুগে কেউ কেউ থাকেনই এমন, যারা যুগের চেয়ে অনেক এগিয়ে, তাদের একাকী প্রচেষ্টাও বদলে দেয় সমাজের গতিপথ! মহাত্মা গান্ধী হয়তো সেজন্যই বলেছেন, ইটস ইজি টু স্ট্যান্ড ইন দ্য ক্রাউড বাট ইট টেকস কারেজ টু স্ট্যান্ড অ্যালোন।