বাজার ব্যবস্থাপনা
হাসান মামুন
প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ০৯:৫৫ এএম
হাসান মামুন
দেশের
একটা বড় জনগোষ্ঠী এখন অপেক্ষা করে থাকে কোরবানি ঈদে উপহার হিসেবে পাওয়া গোমাংস খাওয়ার
জন্য। ৭৫০-৮০০ টাকা কেজি হয়ে যাওয়া এ বস্তু কিনে খাওয়া তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।
রেস্তোরাঁয়ও গোমাংসের আইটেম এখন বেশ দামি। শ্রমজীবীদের কেউ কেউ হয়তো মাঝেমধ্যে শখ
করে রেস্তোরাঁয় গোমাংসের তরকারি খান। তখন তাদের নিশ্চয়ই খারাপ লাগে ঘরে থাকা প্রিয়জনের
জন্য, যাদের গোমাংস কিনে খাওয়ানোর সামর্থ্য তার নেই। এর চাহিদা হয়তো তারা মেটাচ্ছেন
ব্রয়লার মুরগি ও ডিম দিয়ে। সাম্প্রতিককালে এগুলোর দামও লাফিয়ে বেড়েছে। ব্রয়লারের
দাম কিছুটা কমে এলেও ডিমের দাম বাড়ার প্রবণতা এখনও বিদ্যমান।
এ
অবস্থায় খোদ বাণিজ্য সচিব যদি বলেন, ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা থেকে গোমাংস আনা হলে
৩৫০-৪০০ টাকায় পাওয়া যাবে, তখন সেটা আলোচনার বিষয় হয় বইকি। যারা দেশে গরুর খামার
গড়ে তুলেছেন, তাদের তরফ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে, ওইসব দেশ থেকে এত কমে গোমাংস আনা
যাবে না। তাদের কথা হয়তো ভুল নয়। কারণ সে ক্ষেত্রে পরিবহন খরচ লাগবে বেশি। আর
যতদূর জানা যায়, গোমাংসে উচ্চহারে কর-শুল্ক বসিয়ে রেখেছে সরকার। সম্ভবত মোট ৩৩
শতাংশ কর দিয়ে তবেই তা আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভালো বিকল্প হলো ভারত। নিকট প্রতিবেশী
ভারত মধ্যপ্রাচ্যসহ অনেক দেশেই বিপুল পরিমাণ মাংস রপ্তানি করে। এ বাজারে তার
সুনামও রয়েছে। তবে ভারত থেকে আনলে আনতে হবে হিমায়িত মহিষের মাংস। গোমাংস তারা
রপ্তানি করে না। বিজেপি সরকার টানা দুই দফায় রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকায় এ নীতি কঠোর
থেকে কঠোরতর। এ অবস্থায় চাইলে আমরা ভারত থেকে মহিষের মাংস আনতে পারি। দাম সেখানে
উল্লেখযোগ্যভাবে কম। পরিবহন ব্যয়ও কম পড়বে এ ক্ষেত্রে।
গরু ও
মহিষের মাংস যে একদম আমদানি হচ্ছে না, তা কিন্তু নয়। বিশেষত ভারত থেকে মহিষের মাংস
আমদানি মাঝে ক’বছর দ্রুত বেড়েছিল। দেশে সংগঠিত হয়ে ওঠা খামারিদের আপত্তিতেই মূলত
এর আমদানি কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। এ নিয়ে আদালতে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। নিয়মমাফিক
অনুমতি না নিয়ে একটি প্রতিষ্ঠান মহিষের মাংস এনে বিপদেও পড়ে কিছুদিন আগে।
কর্তৃপক্ষকে তথ্য প্রদানে তারা কিছু অস্বচ্ছতাও করেছিল। এ ঘটনা দৃষ্টান্ত হয়ে রইল
তাদের জন্য, যারা গোমাংস আমদানির ব্যবসাটা করে যেতে চায়। সতর্কতার সঙ্গেই তাদের
কাজটি করতে হবে।
আমরা
নাকি গোমাংসে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠেছি। আর সেটা ভারত থেকে সীমান্তপথে গরু আসা
(প্রায়) বন্ধ হওয়ার সুবাদে। খামার ক্রমে বেড়ে ওঠা এবং সেখান থেকে সারা বছরের
মাংসের চাহিদা পূরণের দিক থেকে দেখলে ব্যাপারটা সত্য বইকি। এতে বহু মানুষের
কর্মসংস্থান আর আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও হয়েছে। তবে এখানে রয়েছে পরিস্থিতি
খতিয়ে দেখার ব্যাপার। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন দিয়ে চাহিদা পূরণ হলেও আমাদের মাথাপিছু
মাংস পরিভোগ তো খুব কম। একে আট-দশ গুণ বাড়াতে পারলে হয়তো কাম্য পর্যায়ে পৌঁছাতে
পারব। মাংস পরিভোগ এখনও সামান্য বলেই আমাদের খামারিরা এই চাহিদা মেটাতে পারছেন।
এখনও যে চোরাপথে কিছু গরু ভারত ও মিয়ানমার থেকে আসে না, তা কিন্তু নয়। কোরবানি
ঈদের সময়ও কিছু গরু সীমান্তপথে আসার খবর মেলে। তবে দেশি খামারগুলোই ওই সময়কার
কমপক্ষে ৯০ শতাংশ চাহিদা মেটাচ্ছে। তাদের কিছু গরু অবিক্রীতও থেকে যায়।
যদি ধরেও
নিই, বাইরে থেকে গরু বা মাংস আনার কোনো প্রয়োজন আর নেই, তাহলেও প্রশ্ন থাকে দাম
নিয়ে। কেননা দেশে গরুর উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গোমাংসের দামও বেড়েছে। আরও স্পষ্ট
করে বললে, গত সাত-আট বছরে যত দিন গেছে, গোমাংসের দাম বেড়েছে তত বেশি হারে। দেশে আর
কোনো পণ্যের দাম এত দ্রুত বেড়েছে বলে মনে হয় না। ২০১৪ সালে ভারত থেকে আর গরু আসতে
দেওয়া হবে না বলে জানানোর সময়টায় এখানে বড়জোর ২৫০ টাকা ছিল গোমাংসের কেজি। সেটা
বাড়তে বাড়তে ৮০০ টাকায় এসে ঠেকেছে। মধ্য আয়ের মানুষকেও এখন হিসাব করে গোমাংস কিনতে
হয়। মাংসের অনেক দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। বিক্রিও কমেছে বা প্রত্যাশিতভাবে বাড়েনি।
জনগণের
একটা অংশ মাসেও একবার গোমাংস কিনতে না পারলে এ পরিস্থিতিকেও দুর্ভাগ্যজনক বলতে হয়।
তাদের এটা বলা অমানবিক হবে যে, গোমাংস কেবল উচ্চ আয়ের লোকজন খাবে; তোমরা বরং
তুলনায় এখনও সস্তা ব্রয়লার খাও! বিশেষ করে পাশের দেশ থেকে গোমাংস আমদানির সুযোগ
যখন অবারিত, তখন এমন বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ সীমিত বইকি। এখানে ‘গোমাংস’ বলতে অবশ্য
মহিষের মাংস বুঝতে হবে। দেশে কিন্তু মহিষের মাংসের চাহিদা বেড়েছে। মাঝে যখন এর
আমদানি বাড়ছিল, তখন অনলাইনেও বিক্রি হচ্ছিল মহিষের মাংস। প্রধানত দামের কারণেই এর
প্রতি আকৃষ্ট হয় একশ্রেণির ক্রেতা। মহিষের মাংসের গুণাগুণ সম্পর্কে জেনেও অনেকে
এটা কিনতে শুরু করে। এর বড় চাহিদা রয়েছে সাধারণ রেস্তোরাঁ, তেহারি ও কাবাবের
দোকানে। হাড় ও চর্বি ছাড়া মহিষের মাংস কম দামে পেলে একটা গোষ্ঠী এর নিয়মিত ভোক্তা
হবে। উচ্চহারে কর পরিশোধের পরও এটা দেশে উৎপাদিত গোমাংসের চেয়ে উল্লেখযোগ্য কম
দামে দেওয়া যাবে বলেই মনে হয়। বাণিজ্য সচিবের বক্তব্যে আসলে সে বাস্তবতাই
প্রতিফলিত।
সমস্যা
এখানে দুটি। এক. কম দামে মহিষের মাংস পেলে এবং ক্রমে তা জনপ্রিয় হয়ে উঠলে আমাদের
খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাদের এখনকার চেয়ে কমে গরু বেচতে হবে মাংস ব্যবসায়ীদের
কাছে। ইতোমধ্যে গরু পালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তাদের অনেকে নাকি বেজায় ক্ষতিগ্রস্ত।
অদক্ষতার কারণেও অনেকে খামার পরিচালনায় ব্যর্থ হতে পারেন। বিপুলসংখ্যক খামার গড়ে
ওঠার পর বেশকিছু নাকি আবার বন্ধ হয়ে গেছে। কোরবানির হাট থেকেও কম খামারিই
সন্তোষজনক মুনাফা তুলতে পারছেন। এরই মধ্যে মাংস আমদানি হলে পরিস্থিতিটা আরও জটিল
হবে বিশেষত ছোট ও মাঝারিদের জন্য। বড় খামারিরা হয়তো ব্যবস্থাপনা দক্ষতায় উতরে
যাবেন।
দুই.
আমাদের তো অনেক কিছুই আমদানি করতে হয় এবং হবে। দেশের প্রধান রপ্তানি খাতও উপকরণের
ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর। আমরা আবার মোকাবিলা করছি বড় রিজার্ভ সংকট। এ অবস্থায়
গোমাংস আমদানি করতে গেলে রিজার্ভের ওপর চাপ আরও বাড়বে বইকি। আমাদের কিন্তু গম,
ভোজ্য তেল, চিনিসহ অনেক খাদ্যপণ্য বিপুলভাবে আমদানি করতে হয় এবং তুলনায় সেগুলো
বেশি জরুরি।
এ ক্ষেত্রে
ভিন্ন যুক্তি অবশ্য আছে। খামারে গরু পালনের জন্যও আমাদের কিন্তু পশুখাদ্য আমদানি
করতে হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধসহ নানা কারণে এর দাম গত এক বছরে নাকি ৪৫ শতাংশ বেড়েছে।
মজুরি, বিদ্যুৎ বিল ইত্যাদির কারণেও খামারে ব্যয় বাড়ার কথা। এজন্য সমালোচনার মুখে
পড়লেও তারা কম দামে গরু জোগাতে পারছেন না। আর এর চাপ গিয়ে পড়ছে ক্রমবর্ধমান
গোমাংসের দামে। তা বাড়তে বাড়তে খাসির মাংসের দামের কাছাকাছি চলে গেছে।
সত্যি
বলতে এত জনবহুল একটি দেশে যেখানে তৃণভূমি প্রায় ফুরিয়ে এসেছে, সেখানে আমদানিকৃত
ব্যয়বহুল খাবার খাইয়ে মাংসের জন্য গরু পালন কতটা লাগসইÑ এই প্রশ্ন দেরিতে হলেও
উঠবে। এ ক্ষেত্রে ভারত, এমনকি পাকিস্তানের বাস্তবতাও ভিন্ন। তারা মাঠে চরিয়ে অনেক
কম খরচে গোসম্পদ বাড়িয়ে তুলতে পারে। ভারতে মহিষও উৎপাদিত হয় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি।
অন্যদিকে আমাদের মহিষ উৎপাদন কমেছে; সেটাও চারণভূমি কমছে বলেই। দেশি মহিষের মাংসের
দামও এখন গোমাংসের সমান। মহিষকে গরু বলে চালিয়ে দেওয়ার দিনও তাই গত হয়েছে।
এ
অবস্থায় সম্ভাব্য সব দিক থেকে এ খাতটি খতিয়ে দেখতে হবে। গোমাংস আমদানির দাবি উঠছে
বলেই তা শুধু খামারিদের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে জবাব দিলে চলবে না। তাদের বিরাট অংশ
কিন্তু একটা সংরক্ষিত বাজারে ব্যবসা করেও কুলিয়ে উঠতে পারছেন না। কিছু নীতিগত
সহায়তার দাবি অবশ্য রয়েছে তাদের। তাও সরকার কতখানি জোগাতে পারবে, বলা মুশকিল।
রিজার্ভ পরিস্থিতি বিবেচনা করে অন্তত রেস্তোরাঁর জন্য হলেও হিমায়িত মহিষের মাংস আনা যেতে পারে। সেখানে কম মানুষ খাওয়াদাওয়া করে না। দাম কম বলে সবাই যে মহিষের মাংস কিনতে হামলে পড়বে, তা কিন্তু নয়। প্রয়োজনে কর-শুল্ক আরও কিছুটা বাড়িয়ে দুই খাতে প্রতিযোগিতাও সৃষ্টি করা যায়। বিপুলসংখ্যক ভোক্তার দিকটিও দেখতে হবে। সহজে আমদানির সুযোগ থাকলে তা একেবারে গ্রহণ করতে না চাওয়াটাও সঠিক মনে হয় না। খামারে গরু উৎপাদনে ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ’ হয়ে ভোক্তাকে সন্তুষ্ট রাখা খুব কঠিন বলেই মনে হচ্ছে। গোমাংসের দামের বিরাট বৃদ্ধিতে বাজার ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির দিকে দৃষ্টি দেওয়াও কম জরুরি নয়।