পরিপার্শ্ব
মীর আব্দুল আলীম
প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ০৯:৪৮ এএম
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের
যাত্রামুড়া এলাকায় এক শতবর্ষী মাকে রাতের আঁধারে রাস্তায় ফেলে যায় তার সন্তান। ছেলে
তাকে সেখানে ফেলে গেছে শুধু এতটুকুই বলতে পারেন। স্মৃতিতে নিজের ঠিকানাটা পর্যন্ত নেই
সঙ্গত কারণেই। এমন হাজারো মায়ের বেদনার গল্প আছে এ দেশে। প্রশ্ন জাগে, বৃদ্ধ মা-বাবারা
ভালো আছেন তো? সন্তানের কষ্টে কারও চোখের জল ঝরছে না তো? এমন প্রশ্ন জাগার কারণ অনেক।
পত্রিকার শিরোনাম যদি হয় ‘ডাস্টবিন থেকে উদ্ধার করা অসুস্থ বৃদ্ধ পিতাকে বৃদ্ধাশ্রমে
প্রেরণ’, ‘বাসস্ট্যান্ডে ফেলে রাখা বৃদ্ধ মায়ের ছেলের জন্য অপেক্ষায় কাটল এক মাস’;
তাহলে তো এমন প্রশ্ন জাগবেই। সংবাদগুলো আমাদের বিবেক, মূল্যবোধ, পারিবারিক বন্ধন এবং
আত্মার সম্পর্ক বিষয়ক এতদিনকার ধ্যানধারণার ওপর আঘাত হানে, বহুবিধ প্রশ্ন দাঁড় করায়।
মা-বাবার প্রতি
সন্তানদের দায়িত্ববোধ কমছে। তাই অনেক মা-বাবার আশ্রয় হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে। দুই-তিন দশক
আগেও মানুষের মধ্যে বৃদ্ধাশ্রমের ধারণা ছিল না। এখন দেশের অনেক জায়গায়ই বৃদ্ধাশ্রম
গড়ে উঠেছে। বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় হচ্ছে অনেক মা-বাবার। সেখানে যেতে তাদের বাধ্য করা হয়।
অনেকে জন্মদাতা মা-বাবাকে ফেলে আসে রাস্তাঘাটে, নর্দমার কিনারায়। আমরা মানবিকতা হারাচ্ছি
বলেই আমাদের মা-বাবারা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাদের আশ্রয় হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে। সন্তানের
কাছে যাদের বেশি কিছু চাওয়ার নেই; শেষ বয়সে আদরের সন্তানের পাশে থেকে সুখদুঃখ ভাগ করবার
ইচ্ছাটাই যাদের স্বাভাবিক ও সঙ্গত প্রত্যাশা সেখানে এ কোন বৈরী ছায়া! কিন্তু অনেকেরই
সন্তানের কাছে আশ্রয় না হয়ে আশ্রয় হয় আপনজনহীন বৃদ্ধাশ্রমেÑএ যে কি মর্মস্পর্শী তা
শুধু ভুক্তভোগীরাই জানেন।
একদিন যে সন্তানের
জন্য মা-বাবা ছিলেন স্নেহময়, যে সন্তান একটু আঘাত পেলেই মা-বাবা হয়ে উঠতেন চিন্তিত,
যে সন্তানকে নিজে হাত দিয়ে খাইয়ে দিয়েছেন, কোলে-পিঠে মানুষ করেছেন এবং কখনই নিজের অসুবিধার
কথা সন্তানদের বুঝতে দেননি। সেই মা-বাবার এই নিয়তি হতে পারে না। আজকাল সমাজে এমন কিছু
সন্তান দেখা যায়, যারা কি না মা-বাবার আদরযত্নের কথা ভুলে মা-বাবাকে ঠেলে দেয় অজানা
গন্তব্যে। বৃদ্ধ ও অসহায় বলে তাদের ঠিকানা হয় বৃদ্ধাশ্রমে। ঘরের মধ্যে সবার থাকার জায়গা
হলেও এখানে বৃদ্ধ মা-বাবার জায়গা হয় না! আসলে একজন মা-বাবা তার সন্তানদের জন্য যা করেন,
তা তাদের পক্ষে সারা জীবনেও শোধ করা সম্ভব নয়। বুড়ো বয়সে এসে তারা চান একটু শান্তি,
ভালোবাসা, মমত্ব। এ বয়সে একটু আদরযত্ন পেলেই তারা খুশি হন। মা-বাবা চান সন্তানরা যেন
তার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনে।
মনে রাখা উচিত
আজ যিনি সন্তান, তিনিই আগামী দিনের বাবা কিংবা মা। বৃদ্ধ বয়সে এসে মা-বাবারা যেহেতু
শিশুদের মতো কোমলমতি হয়ে যান, তাই তাদের জন্য সুন্দর জীবনযাত্রার পরিবেশ তৈরি করাই
সন্তানের কর্তব্য। আর যেন কখনও কোনো মা-বাবার ঠিকানা বৃদ্ধাশ্রম না হয়, সেদিকে সতর্ক
দৃষ্টি রাখতে হবে। তাদের জন্য তৈরি করতে হবে নিরাপদ ও সুন্দর পরিপার্শ্ব। এমন সন্তানদের
সামাজিকভাবে বর্জন করা উচিত বলে মনে করি।