পর্যবেক্ষণ
মহিউদ্দিন খান মোহন
প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১৪:০৬ পিএম
‘ছবি যেন শুধু ছবি নয়, আজ কেন তাই মনে হয়/এ যেন ওগো দুটি প্রাণের কথা বিনিময়...’। সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে মোস্তফা মেহমুদ পরিচালিত ‘মানুষের মন’ চলচ্চিত্রের একটি গানের প্রথম কলি। জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী খুরশীদ আলমের কণ্ঠে পর্দায় লিপ মিলিয়েছিলেন নায়করাজ রাজ্জাক। চলচ্চিত্রটির সঙ্গে সঙ্গে এ গানটিও যথেষ্ট শ্রোতাপ্রিয় হয়েছিল সে সময়। মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশের সঙ্গে ছবির গুরুত্ব অনেক। একটি ছবি ইতিহাসের অনেক কথা বলে দেয়। কোনো ঘটনা মানুষ মুখে অস্বীকার করতে পারলেও সেই ঘটনার একটি ছবি সঠিক সাক্ষ্য দেয়। ইতিাসের সাক্ষী হিসেবে তাই ছবির গুরুত্ব অপরিসীম।
ছবি
তোলা ও সংরক্ষণ মানুষের একটি আগ্রহের বিষয়। সবাই ছবি তুলতে চায়। তবে কিছু রক্ষণশীল
মানুষ ছবি তুলতে চায় না ধর্মীয় রীতিতে তা নিষিদ্ধ মনে করে। তবে বর্তমানে ছবির গুরুত্ব
অস্বীকার করা যাবে না। ছবি ছাড়া অনেক কাজই সম্ভব নয়। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, পাসপোর্ট
করা, জমিজমার দলিল করা, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া, চাকরির দরখাস্ত করা,
পরিচয়পত্র বানানো ইত্যাদি কাজে ছবি অত্যাবশ্যক। ফলে ধর্মীয় বিধিনিষেধের কথা ভাবলেও
এখন সবাইকে ছবি তুলতে হয় প্রয়োজনেই। কেউ কেউ আবার শখে ছবি তোলেন। আগে আমরা দলবেঁধে
স্টুডিওতে গিয়ে কাপড়ের পর্দায় আঁকা প্রাকৃতিক দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে নানা ভঙ্গিতে ছবি
তুলতাম। সে সময় ছবি তোলা হতো ইয়া বড় ইয়াসিকা বক্স ক্যামেরায় সাদাকালো। আশির দশকের গোড়ার
দিকে দেশে প্রচলন হয় রঙিন ছবির। ক্যামেরার আকৃতিও আসে ছোট হয়ে। গ্রামগঞ্জের স্টুডিওগুলোয়
ব্যবসা রমরমা হয়। বিয়েবাড়ি, স্কুল-কলেজের অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে একজন ফটোগ্রাফারের কদর
ছিল বেশ।
এখন
দিন পাল্টেছে। ক্যামেরা চলে এসেছে হাতে হাতে। প্রযুক্তির যুগান্তকারী প্রসারের ছোঁয়া
লেগেছে ছবির ক্ষেত্রেও। এখন যে-কেউ যেকোনো ঘটনার ছবি তুলে ফেলতে পারেন হাতের সেলফোন
সেটটি দিয়ে। শুধু তাই নয়, এখন প্রযুক্তির গুণে নিজের ছবি নিজেই তোলা যায় সেলফোন সেট
দিয়ে; যাকে বলা হয় ‘সেলফি’। তা ছাড়া অত্যাধুনিক ওইসব ফোনসেটে রয়েছে ভিডিও-ছবি ধারণ
এবং ফেসবুক-ইউটিউবে আপলোড করার সুবিধা। ফলে এখন কোনো একটি ঘটনার ছবি মুহূর্তে ভাইরাল
হয়ে যায় সামাজিক মাধ্যমে। অনেক সময় দেখা যায়, একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার খবর মূলধারার
গণমাধ্যমগুলোয় প্রচার-প্রকাশের আগেই সামাজিক মাধ্যম ফেসবুক-ইউটিউবে প্রচার হয়ে ছড়িয়ে
পড়েছে বিশ্বব্যাপী।
ছবি
তো হামেশাই তোলা হচ্ছে। প্রতিদিন শ শ প্রকাশিত হলেও সব ছবি মানুষের নজর কাড়ে না, আলোচনার
জন্ম দেয় না। এজন্য মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এমন ছবি প্রচার-প্রকাশে গণমাধ্যমগুলো
সব সময় প্রাধান্য দিয়ে থাকে। অতি সম্প্রতি কয়েকটি ছবি তুমুল আলোড়ন তুলেছে দেশ-বিদেশের
সংবাদমাধ্যমে। একইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত
জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনের শেষ দিনে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে স্বহস্তে সেলফি
তুলেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।
প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনার সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সেলফি তোলার বিষয়টি এখন দেশের রাজনীতিতে
গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। সংগত কারণেই বিষয়টি বোধগম্য। বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন,
গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বিষয়ে বছরখানেক ধরে মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান সরকারের জন্য
বিব্রতকর বলেই বিবেচিত হচ্ছিল। বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং সব রাজনৈতিক
দলকে সমান সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে মার্কিন প্রশাসনের কঠোর অবস্থানে বিরোধী দল, বিশেষত বিএনপি
বেশ উৎফুল্ল ছিল। তারা বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপন করে আসছিল যে, ধারণা হওয়াটা অবান্তর
নয়, যেন মার্কিন প্রশাসন বিএনপিকে সরকারে বসানোর ঠিকাদারি নিয়েছে। ঠিক সেই সময়ে দিল্লিতে
শেখ হাসিনার সঙ্গে বাইডেনের সেলফি তোলা তাই নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে,
এ সেলফি শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি বাইডেন সরকারের মনোভাবের ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিতবাহী
কি না? আরও কয়েকজন সরকার ও রাষ্ট্র প্রধানের সঙ্গেও সেলফি তুলেছেন বাইডেন। সুতরাং এ
সেলফি নিয়ে কারও যেমন অতি উচ্ছ্বাসের কারণ নেই, আবার একে খাঁটো করে দেখারও সুযোগ নেই।
আরও একটি ছবি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধমে আলোচনা তুঙ্গে।
আগের দিন
শেখ হাসিনার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সেলফি। পরদিন
শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলতে হাঁটু গেড়ে বসলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক। বাইডেনের
সেলফির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে ঋষি সুনাকের বাংলাদেশের
প্রধানমন্ত্রীকে সম্মান প্রদর্শনের এ ছবিও। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, চেয়ারে
অসীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার সঙ্গে আলাপ করছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি
সুনাক। বিভিন্নজন ফেসবুকে এ দুটি ছবি নিয়ে নানা
মন্তব্য করছেন। আওয়ামী লীগের সমর্থকরা বলছেন, বাইডেনের এ সেলফি বিএনপির আশার গুড়ে
একমুঠো বালু ছড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি সমর্থকরা বলছেন, সেলফি কোনো রাষ্ট্র বা
সরকারের প্রকৃত মনোভাবের প্রকাশ ঘটায় না। তারা এও বলছেন, বাইডেন শেখ হাসিনার সঙ্গে
সেলফি তুললেও সুষ্ঠু নির্বাচন প্রশ্নে মার্কিন সরকারের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন
হবে না। তবে শেখ হাসিনা ও বাইডেনের সেলফি নিয়ে দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি
যে ধরনের বাক্য ছোড়াছুড়ি শুরু করেছে তা অনেককে বিস্মিত করেছে। জো বাইডেনের সেলফিতে
উৎফুল্ল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘নয়াদিল্লির একটি
সেলফি দেখে বিএনপি নেতাদের চোখ-মুখ শুকিয়ে গেছে, রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। এখন
কাকে দেখাবে? কে নিষেধাজ্ঞা দেবে? কে ভিসানীতি দেবে? এসব আমরা ভয় পাই না।’ অন্যদিকে
বিএনপি মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ এত দেউলিয়া, এত নিঃস্ব হয়ে
গেছে যে বাইডেনের সঙ্গে একটি সেলফি তুলে এখন ঢোল পেটাচ্ছেÑ হ্যাঁ, আমরা জিতে গেছি।
তবে এ সেলফি সরকারকে রক্ষা করতে পারবে না।’ তিনি ওবায়দুল কাদেরকে বাইডেনের ছবিটি
বাঁধিয়ে গলায় ঝুলিয়ে রাখার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘ওটা আপনাদের যথেষ্ট সাহায্য করবে।
জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করুন, বাইডেন এখন আমার সঙ্গে আছে।’(প্রতিদিনের বাংলাদেশ, ১১
সেপ্টেম্বর, ২০২৩)। তবে ছবির গুরুত্ব যে কম নয় একথা আগেই বলেছি।
শেখ হাসিনার সঙ্গে জো বাইডেনের তোলা সেলফি নিয়ে যখন আওয়ামী লীগ-বিএনপি বাগ্যুদ্ধে লিপ্ত, তখন নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছেÑ এর রাজনৈতিক গুরুত্ব কতটুকু? ছবিটি কি বাংলাদেশ প্রশ্নে মার্কিন সরকারের গৃহীত নীতি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়? সুনাকের ব্যাপারেও তা-ই। ছবিগুলো কি শুধুই ছবি?