স্মরণ
আফতাব চৌধুরী
প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১৪:০৩ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
শাহ আবদুল করিম।
জানতে ইচ্ছা হচ্ছে তাঁর জীবন, সৃষ্টি, তান্ত্রিক, আধ্যাত্মিক, সুফি ভাবনাকে। সহজ
কথার গাঁথুনিতে সিলেটের আঞ্চলিক ভাষার জাল বুনে, একাধারে হাওর-নদী জীবন ঘনিষ্ঠ,
দেহতত্ত্ব, বাউলতত্ত্ব, বিচ্ছেদ, ধামাইল, গণসংগীত, রাজনীতি, আল্লাহ, নবী ও ভাটির
মানুষের দুঃখদুর্দশার গন্ধসুধা গায়ে মেখে একের পর এক গান রচনা করেছেন। সুর দিয়েছেন
নিজে, দরাজ কণ্ঠে গেয়েছেন এসব গান দেশে ও বিদেশে। কোথায় নেই তাঁর বিচরণ? ১৯১৬ সালে
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া অবহেলা আর
ক্ষুধার যন্ত্রণায় বেড়ে ওঠা এই শিশুটিই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে আছেন। তিনি সুরমাধুর্যের
সৌরভ ছড়িয়ে বিশ্বের মানুষকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তাঁরই আঙিনায়।
হাওর-বাঁওড়,
খাল-বিল, কালনীর ঢেউ, ভাটির গানের হোগলা-হিজল, নলখাগড়া, কচু, শাপলা, সিঙ্গারা,
কোড়া-সারসের কিচিরমিচির শব্দের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে দিনে দিনে বেড়ে উঠেছেন।
জীবিকার অন্বেষণে রাখালের চাকরি করেছেন এই বালক। তিনি মুরিদ হলেন সুনামগঞ্জের মৌলা
বক্স মুন্সীর কাছে। তখন জানলেন পীর-মুরশিদ ভজতে হলে আপনাকে জানতে হয়। পেতে চাইলেন
মুরশিদের সন্ধান। গুরু বলেন, ‘আগে নিজের মন ঠিক কর, পরে এ কাজে ব্রতী হও। তবেই
পাবে তাঁর দেখা, সে দূরে নয়। আশিক হয়ে খুঁজলে মাশুকপুরে তার সন্ধান মিলবে।’ তিনি
আরও বলেন, ‘ঘুরতে ঘুরতে মন যেথায় গিয়ে রয়,/তথায় তোমার প্রাপ্য বস্তু জানিও নিশ্চয়।’
বাউল সাধকরা অধ্যাত্ম
পিপাসা নিবারণ করে গান গেয়েও রচনা করেন। বাউল গানের মূল চালিকাশক্তি সাঙ্গীতিক
চেতনা, ধর্মীয় আবেগ ও আত্মোন্নতির বাসনা। বাউল আত্মভোলা বিবাগী, বৈরাগ্যপন্থি
মানুষ। তারা একতারা হাতে মাটে-ঘাটে পথে-প্রান্তরে খুঁজে বেড়ান মনের মানুষকে। উদাসী
বাউল সর্বস্ব ত্যাগ করে মনের মানুষ সন্ধান করে ঘুরে বেড়ায়। না পাওয়ার চিরন্তন
বেদনা বাউলের দেহ-মন-আত্মা ভারাক্রান্ত করে তোলে, তাই বাউলগানের মূলসুর কান্নার,
বাউল, সুফি ও বৈষ্ণবের এ কান্না কখনও থামার নয়।
১০ ফেব্রুয়ারি,
২০১৮ সালে ছুটে গেলাম সুনামগঞ্জের মরমি কবি হাছন রাজার মিউজিয়ামে। প্রবেশপথেই
দেখলাম প্রথমেই হাছন রাজার গানের উৎসবের সংগীতে বিভোর বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের
ছবি। ছবির সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম। নিজের অজান্তে কখন যে দুই চোখ বেয়ে
বৃষ্টি ঝরছে টের পাইনি। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানালাম মিউজিয়ামের প্রতিষ্ঠাতা
সামারিন দেওয়ানকে। পরদিন গেলাম শাহ আবদুল করিমের গ্রামের বাড়ি। বিশ্বাস হচ্ছিল না
আমি তাঁরই বাড়িতে। শ্রদ্ধা জানালাম সেই মাটিকে, যেখানে শায়িত আছেন শাহ আবদুল করিম।
তাঁরই একমাত্র সন্তান শাহ নূর জালাল ও তাঁর সহধর্মিণীর হৃদয় স্পর্শ করা ভালোবাসায়
সিক্ত হলাম। শহরের যান্ত্রিকতায় আমরা যে রোবটে পরিণত হয়েছি তা এই ভাটির মানুষের
সান্নিধ্যে না এলে বোঝা কঠিন। মরমিধারায় যেসব বাউল কবি বাঙালির চিন্তা-চেতনা ও
দর্শনে লোকসাহিত্যের সমন্বয় ঘটিয়েছেন, বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিম তাঁদের অন্যতম।
তিনি ২০০০ সালে রাগীব-রাবেয়া সাহিত্য পদক, ২০০১ সালে একুশে পদক, ২০০৪ সালে মেরিল
প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা, ২০০৫ সালে নিউইয়র্ক হাছন রাজা লোক উৎসব সম্মাননা,
সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড আজীবন সম্মাননা ছাড়াও অনেক সম্মাননা পদক
পেয়েছেন। ১২ সেপ্টেম্বর, ২০০৯-এ হৃদয়সম্রাটের জীবনদীপ নির্বাপিত হলো। এই ক্ষণজন্মা
পুরুষটি যদি আরও কিছুদিন বেঁচে থাকতেন হয়তো অনেক ভক্ত ও অনুরাগী তাঁর কাছ থেকে আরও
কিছু পেতেন। তিনি যুগে যুগে অমর হয়ে থাকবেন ভক্তের হৃদয়ে তাঁরই সৃষ্টির মাধ্যমে।