জন্মাষ্টমী
রাজীব নন্দী
প্রকাশ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১২:১৬ পিএম
আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১৫:৩২ পিএম
জীবনে দুই ধরনের
বন্ধু দরকার। এক ধরনের নাম কৃষ্ণ, যে তোমার জন্য যুদ্ধে সরাসরি অস্ত্র ধরবে না,
কিন্তু যুদ্ধে তোমার জেতার সমস্ত ব্যবস্থা করে রাখবে। দুই কর্ণ, যে তোমার জন্য
জীবন বাজি রেখে লড়বে, তুমি অধার্মিক বা যুদ্ধে হেরে যাবে সেটা জেনেও! আজকের পাঠ
কৃষ্ণকে নিয়ে। আজ জন্মাষ্টমী, অর্থাৎ কৃষ্ণের জন্মতিথি।
কৃষ্ণ মথুরার
রাজপরিবার যাদব বংশের বসুদেব ও দেবকীর অষ্টম সন্তান। ‘কৃষ্ণ’ একটি জেনেরিক নাম।
যেমনটি ঈশ্বর, ভগবান, মালিক সবই তাঁর নাম। কুরুক্ষেত্রের মহারণের পর তিনি হয়ে ওঠেন
রাজাদের রাজা। তাই আজকের দিনটি ভারত-বাংলাদেশসহ বিশ্বের সনাতন ধর্মাবলম্বী সমাজের
কাছে ভগবানের জন্মদিন বলেই পালিত। শ্রীকৃষ্ণ হলেন সনাতন ধর্মের পরম পুরুষোত্তম
ভগবান। পুরাণ অনুযায়ী, তিনি বিষ্ণুর অষ্টম অবতার। ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী
তিথিতে তার জন্মোৎসব পালন করা হয়।
যদি বলা হয়
কৃষ্ণের সবচেয়ে বড় কাজ কী? আমি বলব, গীতা রচনা। ‘তুমি নিষ্কাম হও এবং কাজ করে যাও।
ফলের আশা কোরো না।’ কৃষ্ণ ও অর্জুনের এ মিথলজিক্যাল সংলাপটি যোগাযোগবিদ্যার জায়গা
থেকে ভীষণ শক্তিশালী একটি উক্তি। কৃষ্ণের সবচেয়ে বড় শক্তি তিনি প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন
এবং মহাভারতের ইতিহাসে মোড় ঘোরানো যুদ্ধ কুরুক্ষেত্র ও তার পরিণতিতে ‘চতুর প্রভাব
বিস্তার’ করতে পারা। প্রশ্ন উঠতে পারে, তিনি যদি সর্বজ্ঞ এবং ঈশ্বরই হয়ে থাকেন,
তাহলে তিনি কি কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ থামাতে পারতেন না? পারতেন না পাণ্ডবদের জতুগৃহকাণ্ড
না ঘটাতে? পারতেন না দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের ভাগ্যলিপি না লেখাতে? তিনি পারতেন।
কিন্তু করলেন না। তিনি মহাকালকে নিরবধি বইতে দিলেন।
কৃষ্ণের মতো শক্তির
পাশে সনাতন মিথলজির বড় বড় রাজারা বড় অসহায়। কৃষ্ণের মহিমা নানা ব্যঞ্জনায় নানা ভাবে
মহাভারতে প্রকাশিত। সমাজ বিকাশের স্তরে পুঁজিপতি বা বুর্জোয়া শ্রেণি যেভাবে ক্রমে
ক্রমে সামন্তবাদের বিরুদ্ধশক্তি হিসেবে সংগঠিত হয়, সেভাবে কংসের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে
প্রগতির কথা বলে নতুন ব্যবস্থার কথা বলেছেন কৃষ্ণ। যেভাবে ফরাসি বিপ্লবের পর
সামন্ত রাজত্বের বিরুদ্ধে বুর্জোয়া শ্রেণির রাজনৈতিক লড়াই বিস্তৃত হয়েছিল, তেমনি
জরাসন্ধ, শিশুপাল, চেদীরাজকে নিশ্চিহ্ন করে ভিন্ন জগৎ গড়তে এগিয়ে গেলেন তিনি।
গজেন্দ্রকুমার মিত্র তাঁর ‘পাঞ্চজন্য’ গ্রন্থে বলেছেন, কৃষ্ণচরিত্রের ঐতিহাসিক
পারম্পর্য, পৌরাণিক অতিশয়োক্তি বা মুগ্ধ স্তুতিগান খুঁজতে গেলে অনেক কিছুই সামনে
আসবে। ‘কৃষ্ণচরিত’ রচনায় শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকের পরিচয় দিয়েছেন মহাত্মা বঙ্কিমচন্দ্র
চট্টোপাধ্যায়। তিনি লিখেছেন, ‘সম্পূর্ণ কৃষ্ণচরিত প্রকাশ করিয়াও আমি সুখী হইলাম
না।’
কৃষ্ণ বড় রহস্য, যার শেষ নেই। প্রেম-যুদ্ধ-বন্ধুত্ব-রাজ্যশাসন-বাৎসল্য-দায়িত্ব-ছলনা-লীলাÑ কৃষ্ণের পরতে পরতে একেক অধ্যায়। ভক্তরা একটি অধ্যায় উন্মোচন করেন তারপর সামনে আসে আবার আরেক অধ্যায়। এজন্যই কৃষ্ণকে বোঝা ভার, তাই বলা হয় ভগবানকে পাওয়া এত সহজ নয়। তাহলে কৃষ্ণকে পাওয়ার উপায় কী? আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে চারপাশের সব রহস্য উন্মোচনই হলো কৃষ্ণ-অন্বেষণ; যার শাস্ত্রীয় নাম প্রার্থনা; লৌকিক নাম গবেষণা। গবেষণায় যেমন একটি লক্ষ্যের দিকে ছুটে যেতে হয়, তেমন কৃষ্ণকে লাভ করতে প্রয়োজন একাগ্রচিত্ত আরাধনা। কোনো কিছু লাভের জন্য সেই লক্ষ্যমুখী ধাবমান যাত্রাই হলো আরাধনা। কৃষ্ণ অধ্যায়ের রহস্যের যেমন কোনো কিনারা নেই, তেমন শেষ নেই জ্ঞানান্বেষণেরও। জ্ঞান আর আলোমুখী যাত্রা অব্যাহত রাখতে কৃষ্ণের দিকে ধাবিত হতে হয়, যার নাম কৃষ্ণপ্রেম। জন্মাষ্টমী তিথিতে শ্রীকৃষ্ণের জন্মকে স্মরণ করা মানে অজানা জ্ঞানের অন্বেষণে নিজেকে ধীরস্থির রাখার শপথ। শুভ জন্মাষ্টমী।