পরিপ্রেক্ষিত
আর কে চৌধুরী
প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০২৩ ১০:১৮ এএম
জনশক্তি রপ্তানি আমাদের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখে। বর্তমানে দক্ষতার বিকল্প
নেই। দক্ষ জনশক্তির রপ্তানি বাড়াতে পারলে রেমিট্যান্সও বাড়বে, তাতে আমাদের অর্থনীতির
অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাতটি আরও শক্তিশালী হবে। দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির লক্ষ্যে সরকার
কাজও করছে। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের বাস্তবতায় বাংলাদেশের শ্রমিকরা তুলনামূলকভাবে অদক্ষ।
অনেক পেশায় আমাদের কর্মীরা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় দক্ষতা অর্জন করতে পারেননি। দক্ষ শ্রমশক্তি
রপ্তানির ক্ষেত্রে সঠিক প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। সেদিকে লক্ষ রেখেই বিভিন্ন জেলায় ৩০টি
টিটিসি নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেয় জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)।
২০১০ সালে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১২ সালে। কিন্তু
দুই দফা সংশোধন প্রস্তাবের মাধ্যমে ২০১৯ সালে শেষ হয় প্রকল্পটি। প্রকল্প শেষ হওয়ার
চার বছরের মাথায় এসে সরকারের প্রকল্প মনিটরিংয়ের প্রতিষ্ঠান আইএমইডি বলছে, প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলো
আন্তর্জাতিক চাহিদা মেটাতে পারছে না। প্রশিক্ষকের অভাব, আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ
না হওয়ায় দক্ষ কর্মী তৈরি করতে পারছে না তারা।
সরকার ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা করেছে। এগুলোর কাজ এগিয়ে চলছে। বিদ্যমান চাহিদার
নিরিখে কারিগরি শিক্ষা ও প্রাথমিক পর্যায়ে কারিগরি স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
যুগোপযোগী শিক্ষা কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
স্থানীয় সম্পদ ও মানবসম্পদ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে। এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীরা
কাছাকাছি কোনো অর্থনৈতিক অঞ্চলে কাজ করতে পারবে। বিদেশে জনশক্তির চাহিদার নিরিখে কাজ
করতে পারবে। আঞ্চলিক, দেশি ও আন্তর্জাতিক চাহিদার প্রেক্ষাপটে কারিগরি শিক্ষার ধরনের
মধ্যে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। ভিন্ন ভিন্ন চাহিদা পূরণ করার ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে।
বাইরের বাজার ধরতে না পারলে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকে যাবে। কাজেই দক্ষ জনশক্তি গড়ে
তুলতে টিটিসিগুলোর প্রশিক্ষণ আধুনিক করা হোক। প্রশিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হোক। চাকরি থেকে
ব্যবসাÑসব ক্ষেত্রে রোবোটিকসের মতো প্রযুক্তি জায়গা করে নিচ্ছে। তৈরি পোশাকশিল্পে এই
উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে দ্রুতগতিতে। তৈরি পোশাকশিল্প বৃহদ্ভাবে স্বয়ংক্রিয়করণের
দিকে ধাবিত হলে এর ব্যাপক প্রভাব দেশের অর্থনীতি, উন্নয়ন, সামাজিক প্রেক্ষাপট, শিক্ষাসহ
সব ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান হয়ে উঠবে। তৈরি পোশাকশিল্প বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের একটি বড়
উৎস। তবে অটোমেশনের দিকে এর স্থানান্তর হলে এ শিল্পে নিযুক্ত অনেক শ্রমিক চাকরি হারাতে
পারেন। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, চতুর্থ
শিল্পবিপ্লবের প্রভাবে চাকরি হারাবে ২৫ লাখ তৈরি পোশাককর্মী। এ ক্ষেত্রে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের
উপযোগী দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বাংলাদেশের যথাযথ প্রস্তুতি নিতে হবে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অনুযায়ী, আগামী দুই দশকের মধ্যে মানবজাতির ৪৭ শতাংশ কাজ স্বয়ংক্রিয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন যন্ত্রের মাধ্যমে হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ফলে শ্রমনির্ভর এবং অপেক্ষাকৃত কম দক্ষতানির্ভর চাকরি বিলুপ্ত হলেও উচ্চদক্ষতানির্ভর যে নতুন কর্মবাজার সৃষ্টি হবে, এ ব্যাপারে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে প্রস্তুত করে তোলার এখনই সময়। দক্ষ জনশক্তি গড়া সম্ভব হলে জনমিতিক লভ্যাংশকে কাজে লাগিয়ে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুফল ভোগ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অন্য অনেক দেশ থেকে বেশি উপযুক্ত। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হতে পারে জাপান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে আজকের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জাপান শুধু মানবসম্পদ কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক ও সার্বিক জীবনমানের উত্তরণ ঘটিয়েছে। সুবিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে পারলে বাংলাদেশের পক্ষেও উন্নত অর্থনীতির দেশে পরিণত হওয়া দুরূহ নয়।