× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ফুলবাড়ী আন্দোলন

প্রাণ-প্রকৃতির সুরক্ষায় নতুন উন্নয়ন দর্শন

আনু মুহাম্মদ

প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০২৩ ১৪:০৭ পিএম

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২৩ ১৪:২২ পিএম

অলঙ্করন : জয়ন্ত জন

অলঙ্করন : জয়ন্ত জন

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কয়লা কোম্পানি অস্ট্রেলিয়ার বিএইচপির সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে কয়লাসম্পদ অনুসন্ধানের লাইসেন্স-সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করে ১৯৯৪ সালের ২০ আগস্ট। একপর্যায়ে ফুলবাড়ীতে সমৃদ্ধ কয়লা খনির অস্তিত্ব সম্পর্কে তারা নিশ্চিত হয়। ১৯৯৭ সালে রহস্যজনকভাবে রাতারাতি ‘এশিয়া এনার্জি’ নামে একটি কোম্পানির জন্ম হয়। সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ নতুন এই কোম্পানির হাতে বিএইচপি তার লাইসেন্স হস্তান্তর করে বাংলাদেশ ত্যাগ করে। বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ নিয়ে অন্যান্য চুক্তির মতো এটিও ছিল গোপন। জনগণের খনিজ সম্পদ, জীবনজীবিকা, আবাদি জমি, পানিসম্পদ যে প্রকল্পের আওতাভুক্ত সেই প্রকল্প সম্পর্কে জনগণকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা হয়। প্রশ্ন হলো, কেন এরকম সমৃদ্ধ খনির অস্তিত্ব জানার পর বিএইচপি বড় ব্যবসার সুযোগ থেকে নিজেদের বঞ্চিত করল? দ্বিতীয়ত, কারা ঠিক ওই সময়ে ফুলবাড়ী কয়লা খনি লক্ষ করে একটি নতুন কোম্পানি খুলল? আর তৃতীয়ত, কেন বিএইচপি তার হাতেই নিজের লাইসেন্স হস্তান্তর করল? সরকারই বা কেন এটা অনুমোদন করল?

প্রথম প্রশ্নটির স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায় অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশি ভূতত্ত্ববিদ নজরুল ইসলামের কাছ থেকে, যিনি বিএইচপির কনসালট্যান্ট জিওলজিস্ট হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। বাংলাদেশে এ কোম্পানির আসার ব্যাপারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ২০০৮ সালের জুনে সিডনিতে তার সঙ্গে আমার দেখা হলে তিনি এসব বিষয় আমার কাছে পরিষ্কার করেন। পরে তিনি এ নিয়ে লিখেছেনও। তার বক্তব্যের সারকথা হলো, উন্মুক্ত খনি বিএইচপির জন্য নিশ্চয়ই অনেক লাভজনক হতো। কিন্তু তার জন্য যে গভীরতায় কয়লা স্তর থাকা দরকার ফুলবাড়ীর কয়লা তার চাইতে অনেক গভীরে, ১৫০ থেকে ২৬০ মিটার। বিএইচপি খুব ভালো করেই জানত, এরকম গভীরতায় উন্মুক্ত খনি করতে গেলে ভূতাত্ত্বিক ও কারিগরি সমস্যা মোকাবিলা ছাড়াও বহুমাত্রিক দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। অসংখ্য নদীনালা, খালবিল, মৌসুমি ভারী বৃষ্টি, বন্যাপ্রবণ এ অঞ্চলে অস্ট্রেলীয় মান তো দূরের কথা; যেকোনো দেশের বিধি রক্ষা করে উন্মুক্ত খনি পরিচালনা সম্ভব হবে না। তা ছাড়া বিএইচপি চায়নি পাপুয়া নিউগিনির ওক-টেডি কপার খনির মতো আরেকটি ভয়াবহ বিপর্যয়ের দায় নিতে, যেখানে খনির বিষাক্ত পানি নিকটবর্তী নদীতে ভযাবহ দূষণের সৃষ্টি করেছিল এবং নিচের বিশাল অঞ্চল ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। বিএইচপিকে অল্প দিন পরই পাপুয়া নিউগিনির সেই প্রকল্প বাতিল করে ফিরে আসতে হয়েছিল এবং বিপুল পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছিল। বাংলাদেশের পানির আধার ও অন্য সবকিছু মিলে পরিস্থিতি আরও অনেক জটিল। বিএইচপি তাই বুঝেশুনে আগেভাগেই বাংলাদেশ ত্যাগ করেছিল।

বিএইচপির মতো অভিজ্ঞ সংস্থা যা সাহস করেনি তা করবার কথা বলে নতুন একটি কোম্পানি লাইসেন্স পেয়ে গেল, পরিবেশগত সমীক্ষা করবার আগেই তারা ছাড়পত্রও পেল! পুরোটাই একটি ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে বিপুল মুনাফা লোটার আয়োজন! পুরো প্রকল্পই তাই প্রথম থেকেই অনিয়ম আর দুর্নীতিতে পরিপূর্ণ। পরে কোম্পানির দায়ের করা সমীক্ষা আর পুনর্বাসন পরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন স্বাধীন আন্তর্জাতিক খনি বিশেষজ্ঞ রজার মুডি ও পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞ জেনিফার কেলাফাত। অসঙ্গতি, অস্বচ্ছতা আর প্রতারণার দৃষ্টান্ত তারা হাজির করেছেন পাতায় পাতায় (২০০৮)। এর আগে এশিয়া এনার্জি জমাকৃত ‘খনি উন্নয়ন পরিকল্পনা’ পরীক্ষা করে মতামত দেওয়ার জন্য সরকার বুয়েটের অধ্যাপক ড. নূরুল ইসলামকে প্রধান করে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে। কমিটি তাদের রিপোর্টে এ প্রকল্প অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও আইনগত বিবেচনায় অগ্রহণযোগ্য বলে সিদ্ধান্ত দেয় (বিশেষজ্ঞ কমিটির রিপোর্ট, সেপ্টেম্বর ২০০৬)। পরে পাটোয়ারী কমিটি (২০০৭-৮) ও মোশাররফ কমিটি (২০১১-১২)ও এ প্রকল্পের বিরুদ্ধেই মত দিয়েছে। তা সত্ত্বেও নানানরকম গোপন, অসচ্ছ ও দুর্নীতিমূলক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।

এ প্রকল্পের বিরুদ্ধে সে সময় জনগণের প্রতিরোধ সৃষ্টি হয় প্রধানত তিনটি কারণে। তারা বিশদ তথ্য বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছিলেন, প্রথমত, উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি, যেটি স্পষ্টতই ফসলের ভান্ডার এই অঞ্চলে তিনফসলি আবাদি জমি নষ্ট করবে। ছয় উপজেলাসহ উত্তরবঙ্গের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নামিয়ে মরুকরণ সৃষ্টি করবে। পানি দূষণ করে সারা দেশের পানিসম্পদ বিপর্যস্ত করবে এবং তাতে খনি এলাকা ও খনি এলাকার বাইরে বহু লাখ মানুষ উচ্ছেদ হবে। আরও বহু লাখ মানুষ জীবিকা হারাবে। দ্বিতীয়ত, পুরো কয়লা খনির মালিকানা পেতে যাচ্ছিল এশিয়া এনার্জি। বাংলাদেশের ভাগে ছিল শুধু ৬ ভাগ রয়ালটি, যার মধ্যে আবার কয়লা বিদেশে রপ্তানির জন্য রেললাইনসহ অবকাঠামো নির্মাণের খরচও অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং তৃতীয়ত, দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রয়োজন না মিটিয়ে কয়লাসম্পদ বিদেশে রপ্তানি। যে রপ্তানির আয়ও বাংলাদেশ নয়, মালিকানা অনুযায়ী পেত এশিয়া এনার্জি। রপ্তানি থেকে তাদের আয় এমনকি দেশের ভেতরে ব্যাংকেও আসবে না সেভাবেই চুক্তি করা হয়েছিল।

আবাদি জমি, মাটির ওপরের ও নিচের পানিসম্পদ, বসতভিটা সবকিছু ধ্বংস করে লাখ লাখ মানুষকে উদ্বাস্তু করে, উত্তরবঙ্গকে অনুর্বর বিরানভূমিতে পরিণত করে দেশের কয়লাসম্পদ দ্রুত বিদেশে পাচারের এ প্রকল্পই ‘উন্নয়ন’ নামে চালু করার চেষ্টা হয়েছিল। পুরো প্রকল্পটি ছিল তাই জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা ও জননিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। এর বিরুদ্ধে জনপ্রতিরোধের ব্যাপ্তির কারণে এটি দ্রুত সে সময় ওই অঞ্চলের বিভিন্ন শ্রেণি, পেশা ও স্তরের বিপুলসংখ্যক মানুষের সমর্থন লাভে সক্ষম হয়। কিন্তু নিজেদের ভিত্তি তৈরি করতে গিয়ে এশিয়া এনার্জি অঞ্চলে মিথ্যাচার, দুর্নীতি বিস্তার, দালাল তৈরির অপচেষ্টা শুরু করে। তাদের অপচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করে জনগণ আরও শক্তিশালী প্রতিরোধে শামিল হয়। এরই বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২৬ আগস্ট, ২০০৬। গুলি ও নির্যাতন করে, আর অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে জনগণকে থামানো যায়নি। গণঅভ্যুত্থান দ্রুত ছয় উপজেলা অতিক্রম করেছিল। সারা দেশে প্রতিরোধ বিক্ষোভ বিস্তার লাভ করছিল, দেশব্যাপী হরতালও পালিত হয়েছিল। অবশেষে ৩০ আগস্ট তৎকালীন সরকার আন্দোলনকারীদের সব দাবি মেনে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়। বুকের রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে মানুষ এরকম একটি প্রকল্প ঠেকিয়ে বাংলাদেশকে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করেছে।

তার পরও গত ১৭ বছরে বিভিন্ন সরকারের আমলে (চারদলীয় জোট, সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং কয়েক পর্বে আওয়ামী লীগ সরকার) বারবার এ প্রকল্প চালু করার চেষ্টা হয়েছে কিন্তু অবিরাম প্রতিরোধে তারা বারবারই পরাজিত হয়েছে। কোম্পানি ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট রাতে জনরোষ থেকে বাঁচতে অঞ্চল থেকে পালিয়েছিল। কিন্তু দূর থেকে তারা এখনও তৎপরতা চালাচ্ছে। মিথ্যা মামলা দিয়ে আন্দোলনের নেতৃবৃন্দকে হয়রানি করা, এলাকায় সন্ত্রাস তৈরি, চীনা কোম্পানিকে সঙ্গে নিয়ে জোর বাড়ানোর চেষ্টা সবই চলছে। কোনো বৈধ অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের ফুলবাড়ী কয়লা খনি দেখিয়ে এশিয়া এনার্জি (জিসিএম) লন্ডনে শেয়ার ব্যবসা করছে প্রায় ১৮ বছর ধরে। কোনো সরকারই এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি।

সম্প্রতি কিছু গোষ্ঠীর স্বার্থে প্রণীত সরকারের আমদানি ও বিদেশি ঋণ-কোম্পানি নির্ভর কয়লা-পারমাণবিক-এলএনজি কেন্দ্রিক বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ ও ক্রমবর্ধমান দুর্নীতির কারণে দেশে যখন জ্বালানি, বিদ্যুৎ খাতসহ আর্থিক খাত ভয়াবহ সংকটে পতিত হয়েছে তখন আবারও ফুলবাড়ীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে কয়লা খনি নিয়ে চক্রান্ত চলছে, সংকটের অজুহাতে লবিস্টদের নড়াচড়া বেড়েছে। কিন্তু সব তথ্য গবেষণা থেকে এটা স্পষ্ট, দেশের গ্যাসসম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের বিশাল সম্ভাবনা কাজে লাগালে কয়লা বা পারমাণবিকের মতো বিপজ্জনক ব্যয়বহুল পথে বাংলাদেশকে হাঁটতে হয় না। জাতীয় সক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে নবায়নযোগ্য ও অনবায়নযোগ্য জ্বালানির সমন্বয়ে যে পথনকশা জাতীয় কমিটি থেকে ২০১৭ সালে প্রস্তাব করা হয়েছে, তা সারা দেশে সুলভ, নিরবচ্ছিন্ন, পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ জোগান দিতে সক্ষম। কিন্তু সরকার কম খরচে, পরিবেশবান্ধব নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের এই মহাপরিকল্পনা গ্রহণ না করে বেশি ব্যয়বহুল, প্রাণবিনাশী, জাতীয় স্বার্থবিরোধী পথেই চলেছে।

মনে রাখতে হবে, ফুলবাড়ী আন্দোলন ওই অঞ্চলের মানুষের জমি, বসত রক্ষার আন্দোলন নয়, এটি দেশের সম্পদ রক্ষার, জনগণের সম্পদের ওপর জনগণের কর্তৃত্ব রক্ষার আন্দোলন। এই আন্দোলন একই সঙ্গে বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানি ও তার দেশি সহযোগীদের মুনাফার স্বার্থে দেশের সম্পদ দখল ও মানুষকে উদ্বাস্তু বানানোর সঙ্গে সঙ্গে পানিসম্পদ, আবাদি জমি, প্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংসের বিরুদ্ধে জনপ্রতিরোধের ঐতিহাসিক চিহ্ন। এ আন্দোলন মানুষ ও প্রকৃতিকে কেন্দ্রে রেখে নতুন উন্নয়ন দর্শন হাজির করারও আন্দোলন। এই জনপ্রতিরোধ তাই ভবিষ্যতের পথ দেখায়।


  • অর্থনীতিবিদ। অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও সম্পাদক, সর্বজনকথা
শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা