সম্পাদক
প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০২৩ ০৯:২৫ এএম
আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২৩ ১০:৫৭ এএম
ওপার বাংলার নিভৃতচারী
কবি দেবাশিস চন্দ ‘উদ্বাস্তু’ কবিতায় লিখেছেন, ‘উদ্বাস্তু তুমি, ভিটেমাটি ছেড়ে বেরিয়ে
পড়তে হলো/ ভদ্রতার মুখোশ আঁটা পরিবারের লোকেরা লুট করে নিল সর্বস্ব।’ কবির এই কাব্যপঙ্ক্তির
সঙ্গে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের জীবন-উপাখ্যানের অমিল খুঁজে পাওয়া ভার। ক্ষমতার
অন্ধ বিক্রমের সঙ্গে একেবারে লীন হয়ে আছে অন্য মানুষকে তার হকের ভিটেমাটি থেকে সবলে
উচ্ছেদ করে দেওয়ার উদগ্রতা, স্থায়ী ঠিকানাওয়ালা মানুষকে পলক না ফেলতে ঠিকানা চিহ্নহীন
করে দেওয়ার পৈশাচিক উল্লাসের শিকার মানুষের বিপন্নতা বিশ্ববিবেককে স্পর্শ করে না, এ
তো মানবতার প্রতি অবজ্ঞা বৈ কিছু নয়। বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের মানবতার দায়ে প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনার আশ্রয়দানের ত্বরিৎ সিদ্ধান্তের প্রশংসা বিশ্বব্যাপী ব্যাপৃত হলেও সীমান্ত
পাড়ি দেওয়া গৃহহারা মানুষের বোঝা বাংলাদেশ আর কতদিন বইবে? ২৫ আগস্ট প্রতিদিনের বাংলাদেশে
প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ নিয়ে যথার্থ প্রশ্নই উত্থাপন করা হয়েছে। আশ্বাস ও শর্তে ঝুলছে
রোহিঙ্গাদের ঘরে ফেরার মানবিক বিষয়টি, প্রতিদিনের বাংলাদেশে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে
উঠে এসেছে চলমান রোহিঙ্গা সংকটের ছয় বছরের চিত্র।
এই প্রেক্ষাপটে
আমাদের মনে পড়ে ফিলিস্তিনের কবি মাহমুদ দারবিশের সেই অবিস্মরণীয় পঙ্ক্তিÑ ‘আমরা সেই
দেশের দিকে হেঁটে যাই/যা আমাদের মাংসের নয়/ যার বাদাম গাছগুলোতে খুঁজে পাবে না/ আমাদের
অস্থি হাড়গোড়/… অদৃশ্যকে দেখে যাওয়া শুধু।’ আমরা সংগত কারণেই প্রশ্ন রাখি, রোহিঙ্গা
প্রত্যাবাসনের মতো মানবাধিকারের অগ্রভাগে থাকা অধিকার কি শুধু বিশ্ববিবেকের আশ্বাস
আর প্রতিশ্রুতির জালেই আটকে থাকবে? বাংলাদেশ তার সামর্থ্যের দিক থেকে সতর্ক থেকে রোহিঙ্গাদের
দ্রুত দেশে ফেরানোর কার্যকর কূটনীতির সাফল্য স্পষ্ট করলেও প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়ায়
যে বোঝা বইতে হচ্ছেÑ তা থেকে মুক্তির প্রয়োজনে আমরা অপ্রচলিত কূটনীতির আশ্রয় নেওয়াও
প্রয়োজন মনে করি। কারণ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সরকারের সর্বোচ্চ গুরুত্ব সত্ত্বেও দ্বিপক্ষীয়,
ত্রিপক্ষীয় কোনো তৎপরতার ফলই প্রত্যাশা অনুযায়ী দৃশ্যমান হচ্ছে না। রূঢ় হলেও একথা সত্য,
বিশ্বসম্প্রদায় এ ব্যাপারে যত কথাই বলুক না কেন, এর কোনো আন্তরিক প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে
না। রোহিঙ্গা ঢলের ছয় বছর অতিক্রান্তে বাস্তবিকই যে চিত্র ফুটে উঠেছে, এর পরিপ্রেক্ষিতে
বলা যায়Ñ মানবতার দায় রক্ষার দায়িত্ব শুধু বাংলাদেশেরই নয়।
কূটনৈতিক পর্যায়ে
তৎপরতা চালানোর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও আন্তর্জাতিক ফোরামে বারবার এ বিষয়টি
উত্থাপন করছেন। তবু কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে না! আমরা জানি, বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের
মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তন এবং তাদের পক্ষে ন্যায়বিচার, জবাবদিহির নিশ্চয়তাসহ চলমান সংকট
সমাধানের ওপর জোর দিয়ে জাতিসংঘে সর্বসম্মতিক্রমে গত মাসে একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে।
সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের ৫৩তম অধিবেশনে প্রস্তাবটি পাস
হয়। বিদেশি প্রতিনিধিদল দফায় দফায় আসছে, রোহিঙ্গা শিবিরগুলো প্রতিনিধিদলের সদস্যরা
পরিদর্শন ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন, কিন্তু স্বভূমি থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের নিজ
ভিটায় ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থার পথ সুগমে তাদের ভূমিকা কতটা দেখা যাচ্ছে? আন্তর্জাতিক
সহায়তার কিংবা সাহায্যের যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে এরও পূর্ণ বাস্তবায়ন আশাব্যঞ্জক নয়।
চলতি বছরে আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়ার কথা ৮৭৬ মিলিয়ন ডলার। এই প্রতিশ্রুতির বিপরীতে
প্রথম আট মাসে সহায়তা সংগ্রহের পরিসংখ্যান মাত্র ২৮.৯ ভাগ। চীনের মধ্যস্থতায় পরীক্ষামূলক
প্রকল্পের আওতায় ১১৭৬ রোহিঙ্গাকে রাখাইনে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি চূড়ান্ত হলেও তা ফের
ডিসেম্বর পর্যন্ত পিছিয়ে যায়। উত্তর মংডুতে রোহিঙ্গাদের নেওয়ার প্রতিশ্রুতি আছে মিয়ানমারের।
রাখাইনে ফেরার এই তালিকায় আছে ৭১৭৬ রোহিঙ্গা। প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩শ রোহিঙ্গাকে নেওয়ার
কথা। যে পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশমুখী হয়েছিল, তখন যদি বাংলাদেশ মানবতার তাগিদে
সীমান্ত খুলে না দিত, তাহলে নাফ নদে আরও অজস্র প্রাণের রক্ত মিশে যেত। আমরা মনে করি,
শুধু ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের দীর্ঘস্থায়ী সমাধান বের করা খুব মুশকিল,
দরকার বহুপক্ষীয় উদ্যোগ। আর এজন্যই প্রয়োজন প্রচলিত কূটনীতির বাইরেও অপ্রচলিত কূটনীতি।
নিরাপত্তা হুমকিতে
রয়েছে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলো। আগ্নেয়াস্ত্র, মাদক ব্যবসাসহ বহুবিধ দুষ্কর্মের
খতিয়ান দীর্ঘ হচ্ছে রোহিঙ্গা শিবিরে। তাদের মধ্যে অন্তঃকোন্দলসহ বিভিন্নমুখী সামাজিক
অপরাধপ্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে এবং তা স্থানীয় জনগণের ওপর তো বটেই সামগ্রিকভাবে দেশের নিরাপত্তার
জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশ-প্রতিবেশের ক্ষতি হচ্ছে সীমাহীন। এ কথাও আমলে রাখা
প্রয়োজন, বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সংখ্যার আনুপাতিক হারে ডিসেম্বরে শুরু হওয়া
প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় যে সংখ্যা রয়েছে, তা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় সিন্ধুর
মধ্যে বিন্দু মাত্র। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এ বিষয়টি অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে রোহিঙ্গা
জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে মুক্তপ্রাণ লাভে মনোযোগী হওয়ার দায় তাদের রয়েছে বলেও
আমরা মনে করি।