ব্রিকস সম্মেলন
ড. ফরিদুল আলম
প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৩ ১২:৪১ পিএম
আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৩ ১২:৪৩ পিএম
ড. ফরিদুল আলম
করোনা মহামারির পর ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি অংশগ্রহণে দক্ষিণ
আফ্রিকার জোহানেসবার্গে ২২-২৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ব্রিকস জোটের ১৫তম সম্মেলন। ২০০৯
সালে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের সমন্বয়ে ‘ব্রিক’ পরে দক্ষিণ আফ্রিকার অংশগ্রহণে
‘ব্রিকস’ নাম ধারণ করে। নানা দিক দিয়েই এবারের ব্রিকসের জোহানেসবার্গ সম্মেলন অনেক
গুরুত্বপূর্ণ। এর প্রথম কারণ, কয়েক মাস ধরে এ ফোরামে কয়েকটি দেশকে নতুন সদস্যপদ দেওয়ার
বিষয়ে আলোচনা চলে, যা এবারের শীর্ষ সম্মেলনে চূড়ান্ত হওয়ার কথা থাকলেও সম্মেলনের কয়েক
দিন আগে ব্রাজিল ও ভারতের আপত্তিতে আপাতত এ প্রক্রিয়া সাময়িক স্থগিত রাখা হয় এই মর্মে
যে, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আগে আরও কিছুটা সময় নেওয়া দরকার। তবে এবারের
সম্মেলনে মূল প্রাপ্তির বিষয়টি হচ্ছে, এর সম্প্রসারণের বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে
সদস্য দেশগুলো।
এবারের ব্রিকস সম্মেলনে সব সদস্য রাষ্ট্রের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান অংশ নিলেও সঙ্গত
কারণেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সরাসরি যুক্ত থাকেননি। রাশিয়া-ইউক্রেন
যুদ্ধের ফলে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কারণে তার প্রতিনিধিত্ব
করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে এ ক্ষেত্রে এও বলে রাখা ভালো, প্রেসিডেন্ট পুতিনের
অংশ না নেওয়া সম্মেলনে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি। পশ্চিমা আধিপত্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায়
ব্রিকসের ভেতর রাশিয়ার আবেদন খাটো করে দেখার কোনো অবকাশই মেলেনি। বলা যায়, যুদ্ধ শুরুর
পর থেকে ব্রিকসের অভ্যন্তরে রাশিয়ার জন্য কোনোরকম বাণিজ্যিক সংকট সৃষ্টি না হয়ে বরং
তা আরও সম্প্রসারিত হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে আমরা দেখেছি, বিশেষ করে ভারত ও চীন পশ্চিমা
নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করে আগের চেয়েও অধিক পরিমাণে তেল আমদানি করেছে রাশিয়া থেকে। এখানে
আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ব্রিকস দেশগুলোর মধ্যে কেউই কিন্তু
রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় সায় দেয়নি, যা জোটের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে অপরিবর্তিত
রেখে এগিয়ে চলার একটি ভালো প্রয়াস। সেই দিক দিয়ে যে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে ফোরামটি যাত্রা
করেছিল, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয়
মতপার্থক্য থাকলেও ব্রিকস তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পূরণে এগিয়ে চলেছে এবং নিয়মিতভাবে এ
ফোরামটির উন্নয়নে সদস্য দেশগুলো কাজ করে যাচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে ব্রিকসের সবচেয়ে বড়
অর্জন হচ্ছে বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রাব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনার
অভিপ্রায় নিয়ে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (নতুন উন্নয়ন ব্যাংক) প্রতিষ্ঠা। ২০১৪ সালে ৫০
বিলিয়ন ডলার মূলধন নিয়ে যাত্রা করা ব্যাংকটিতে পাঁচ সদস্য দেশের অনুদানের পরিমাণ ২০
শতাংশ বা ১০ বিলিয়ন ডলার।
এবারের ব্রিকস সম্মেলনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মধ্যে আরেকটি হচ্ছে, নতুন সদস্য
অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে নীতিগতভাবে একমত পোষণ করা। আমরা যদি বিষয়টির
একটু গভীরে প্রবেশ করি তাহলে দেখব, পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীলতাজনিত এক ধরনের
চাপ থেকে বের হয়ে আসতে চায় গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো। এ ক্ষেত্রে পাঁচটি দেশ মিলে যে
ঝুঁকি নিয়ে তাদের যাত্রা করেছিল ২০০৯ সালে, সময়ের ধারাবাহিকতায় বিশ্বব্যবস্থার উত্থান-পতনের
মধ্য দিয়েও তাদের সম্মিলিত এগিয়ে চলা অন্য দেশগুলোর জন্য একটা আস্থার জায়গা তৈরি করে
দিয়েছে। আর সে কারণেই বর্তমানে অন্তত আরও ৪০টি দেশ সদস্য হতে চায় এ ফোরামের। তবে এখানে
ব্রিকস নেতাদের পক্ষ থেকে এক ধরনের মানদণ্ড তৈরি করার প্রক্রিয়া হাতে নেওয়া হয়েছে,
যার আলোকে প্রতি বছর ধারাবাহিকভাবে এর সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিষয়টি অনেকটা
ন্যাটো অথবা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্প্রসারণ প্রক্রিয়ার মতো। পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থার
সঙ্গে নতুন অন্তর্ভুক্ত হওয়া রাষ্ট্রগুলো কতটুকু খাপ খাইয়ে চলতে পারবে, তার সম্ভাব্যতা
যাচাই এ প্রক্রিয়ার অন্যতম লক্ষ্য।
যদিও আক্ষরিক অর্থে আমরা ব্রিকসকে পশ্চিমা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সমান্তরাল একটি
বিপরীতমুখী ফোরাম হিসেবে বিবেচনা করি, যা উন্নয়নশীল অন্য দেশগুলোকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে
সম্পৃক্ত করে বিশ্বব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে চায়, তবে বিষয়টিকে আনুষ্ঠানিকভাবে
স্বীকার করতে নারাজ এর শীর্ষ নেতারা। আর তাই কৌশলে এবারের সম্মেলনে তারা যা বলার চেষ্টা
করছেন তা হলো, ব্রিকস জি৭ বা জি২০ বিরোধী কোনো শিবির না হয়ে নিজেদের উন্নয়নের স্বার্থে
নিজেদের সংগঠিত করতে চায়। এর মধ্য দিয়ে পরোক্ষভাবে এই বার্তাটি পৌঁছে দেওয়া হলো যে,
উন্নয়নের নামে এতদিন ধরে গ্লোবাল সাউথকে যে ধরনের সমর্থন করে যাওয়া হয়েছে, তা কার্যত
রাষ্ট্রগুলোর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার খর্ব করেছে ব্যাপকভাবে। আর সেজন্যই সম্মেলনের
প্রথম দিনে সদস্য দেশগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে নিজেদের সংগঠিত করার বিষয়টিকে
জোরালোভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সম্মেলন শুরুর দিন সাইডলাইন বৈঠকে মিলিত হয়ে দক্ষিণ
আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তাই তাদের যৌথ
বিবৃতিতে উল্লেখ করেন, বহুত্ববাদের প্রসার, বিশ্বজুড়ে সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক যে পরিবর্তন
সাধিত হচ্ছে তাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ব্রিকস।
সম্মেলনের আগে থেকেই চীন ও রাশিয়া এ জোটের সম্প্রসারণ বিষয়ে তাদের পক্ষ থেকে ইতিবাচক
মনোভাব দেখালেও ভারত ও রাজিলের আপত্তিতে বিষয়টি শিগগিরই সুরাহা হচ্ছে না। তবে এ বিষয়ে
তাদের মধ্যে মতপার্থক্যের অবকাশ নেই, এর সম্প্রসারণ একটি অনিবার্য বিষয়। ভারত অবশ্য
স্বীকার করেছে, এ জোটে অন্তর্ভুক্তির মধ্য দিয়ে ভারতের অর্থনীতিতে ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন
হয়েছে এবং তারা ক্রমেই নিজেকে পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম
হচ্ছে। সেই সঙ্গে বর্তমানে দেশটির অর্থনীতির আকার ৫ ট্রিলিয়ন ডলারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে,
যা তাদের বড় সাফল্য। এখানে ভারত ও চীনের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও অর্থনৈতিক
স্বার্থে তাদের অবস্থান অভিন্ন। যদিও চীনের বিপক্ষে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি অনেক বেশি,
সে ক্ষেত্রে ব্রিকসের অভ্যন্তরে একটি প্রতিযোগিতামূলক বাণিজ্যিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে
পারলে তা ভারতের অর্থনীতিতে আরও ভূমিকা রাখতে পারে। বিষয়টি যে ভারতের বিবেচনায় নেই
তা নয়, তবে বর্তমান যুদ্ধের বাস্তবতায় ভারত এখনই পশ্চিমা স্বার্থের বাইরে গিয়ে এর ব্যাপক
সম্প্রসারণে যেতে চাইছে না। উল্লেখ করতে হয়, ব্রিকস জোটে থাকলেও ভারতের সঙ্গে মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্রের একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। তা ছাড়া চীন এই ব্রিকসকে ব্যবহার
করে তার নিজের শক্তিমত্তা জোরদার করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে
নিজেকে দাঁড় করাতে চাইছে কি না, তা-ও ভারতকে বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। চীন ও রাশিয়া সৌদি
আরব, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, আরব আমিরাতসহ যে আটটি দেশকে এ মুহূর্তে ব্রিকসের সদস্য
করতে আগ্রহী, বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে এ দেশগুলোর সবকটি বর্তমানে চীনের সঙ্গে গভীরভাবে
বাণিজ্যিক সম্পর্কে জড়িত। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে
মুখ ফিরিয়ে নিয়ে সৌদি আরবের চীনের দিকে ঘেঁষে পড়াকে চীনের অভ্যন্তরীণ নীতির সাফল্য
হিসেবে ধরা হয়, যা ব্রিকসকে ব্যবহার করে আরও ত্বরান্বিত করা হতে পারে, এটা ভারতের দুশ্চিন্তার
কারণ।
বাংলাদেশ এ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ব্রিকসের সদস্য হতে যাচ্ছে, এমন প্রত্যাশার বিপরীতে
কিছুদিন আগে জানা গেল, এখনই নতুন সদস্য নেওয়া হচ্ছে না। বিষয়টি আমাদের জন্য এক আচমকা
ধাক্কা মনে হলেও আশার খবর হলো, আমরা ইতোমধ্যে ব্রিকস ব্যাংক বা নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের
সদস্য হয়েছি। এর মধ্য দিয়ে আমাদের এই নতুন ব্যাংক থেকে উন্নয়ন সহযোগিতা এবং বিকল্প
ঋণের একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। বিদ্যমান বাস্তবতায় যেখানে প্রচলিত উৎসগুলো থেকে ঋণ
সরবরাহ কমে যাচ্ছে, সে ক্ষেত্রে ব্রিকস ব্যাংক থেকে বিকল্প অর্থ সরবরাহ কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন
কর্মকাণ্ড সচল রাখতে বিশেষ ভূমিকা পালন করবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্রিকস সম্মেলনে
যোগ দিতে দক্ষিণ আফ্রিকা সফর করেছেন। এ সম্মেলনের শেষ দিনে ২৪ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী
নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক অব ব্রিকস এবং ব্রিকস-আফ্রিকা আউটরিচ অ্যান্ড দ্য ব্রিকস প্লাস
ডায়ালগের নতুন সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য দেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
যথার্থই বলেছেন, নতুন বিশ্বব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর আরও একত্রে
কাজ করতেই হবে এবং সত্যকার উন্নয়ন সাধন করতে গেলে পশ্চিমা সাহায্যনির্ভরতা
থেকে মুক্ত থেকে পারস্পরিক নির্ভরশীলতার বিকল্প নেই। ব্রিকস এমন একটি ফোরাম, যেখানে
প্রতিটি রাষ্ট্রই তার সামর্থ্যের ভিত্তিতে উন্নয়নে শামিল থেকে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সাধন
করতে সক্ষম।
সময়ের দিক থেকে এবারের সম্মেলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে এক ধরনের বিভাজিত বিশ্বব্যবস্থা। পশ্চিমা বিশ্ব যেখানে একতরফাভাবে এ যুদ্ধের জন্য রাশিয়াকে দোষারোপ করছে, ব্রিকসের এ ক্ষেত্রে অবস্থানের ভিন্নতা ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থা বিনির্মাণে পশ্চিমা একচেটিয়া আধিপত্যবাদকে নিঃসন্দেহে খর্ব করবে। তবে ব্রিকসকে যদি সত্যিকার অর্থে এরকম একটি প্রতিযোগিতার জায়গায় দাঁড়াতে হয় তাহলে এর সদস্যসংখ্যা সম্প্রসারণের বিকল্প নেই। এবার না হলেও, আশা করা যায় নিকট ভবিষ্যতে এর সম্প্রসারণ ঘটবে এবং নিজেদের স্বার্থেই ব্রিকসের শীর্ষ নেতারা এ বিষয়ে অভিন্ন সিদ্ধান্তে আসবেন।