প্রিগোজিনের মৃত্যু
ডেভিড ইগনাটিয়াস
প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৩ ১২:৩৪ পিএম
আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৩ ১২:৪৩ পিএম
ডেভিড ইগনাটিয়াস
ইয়েভগিনি প্রিগোজিন মারা গেছেন। মারা গেলেও তার ভূত রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে দীর্ঘদিন তাড়া করে ফিরবে। পুতিন দীর্ঘদিন ধরে প্রিগোজিনকে একজন বিশ্বাসঘাতক হিসেবে আখ্যায়িত করে আসছেন। প্রিগোজিনকে যুদ্ধের ময়দান থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্যও ব্যাপক চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। এত কিছুর পরও ইউক্রেন যুদ্ধ বিষয়ে প্রিগোজিনের বক্তব্যকে তিনি পুরোপুরি নির্মূল করতে পারেননি। ২৩ আগস্ট বিমান দুর্ঘটনায় প্রিগোজিনের মৃত্যু ঘটে এবং একটি দুর্ঘটনা পুতিনের ‘পথের কাঁটা’ হয়ে ওঠা এক প্রতিবন্ধকতাকেই সরিয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন মহলের দাবি, এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যা। রাশিয়া যেন ফের স্তালিনের সময়কার সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতির যুগে ফিরে গেছে। কার্নেগি এনডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের রাশিয়া বিষয়ক বিশ্লেষক তাতিয়ানা স্টোয়ানোয়া জানিয়েছেন, ‘ঘটনা যা-ই ঘটুক না কেন, রাশিয়ার অভিজাত সম্প্রদায় একে প্রতিবাদমূলক ঘটনা হিসেবেই মেনে নেবে। ক্রেমলিন এ ঘটনাকে পুতিনের প্রতিশোধ নেওয়ার ঘটনা বলেই প্রচার করে বেড়াবে।’ অন্যদিক সিআইএ’র পরিচালক উইলিয়াম জে বার্নস গত মাসে এক সাক্ষাৎকারে পুতিনকে আদর্শ প্রতিশোধপরায়ণ ব্যক্তি হিসেবে দাবি করেছেন। এজন্য এই বিমান দুর্ঘটনার পেছনে পুতিনের যোগসাজশ রয়েছে এমন ধারণা রাশিয়ানদের মধ্যে কাজ করবে।
স্বল্পসময়ের মধ্যে
পুতিনের প্রতিবন্ধকতা দূর হয়ে গেছে। সশস্ত্র বিপ্লবের মূল হোতাকে রাজনীতির মঞ্চ
থেকে সরিয়ে ফেলা গেছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা বাহিনী ইতোমধ্যে ইউক্রেনের কিয়েভে লড়াই চালিয়ে
যাচ্ছে। বিগত দুই মাসের তুলনায় এখন পুতিনের ক্ষমতা আরও পাকাপোক্ত বলে মনে হচ্ছে।
দুই মাস আগে প্রিগোজিন ওয়াগনার মিলিশিয়া বাহিনীকে মস্কোর দিকে কুচকাওয়াজ করতে করতে
এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অবশ্য ওয়াগনারের মৃত্যুতে রাজনৈতিক মেধা হিসেবে
সুপরিচিত পুতিনের নাম কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েক দিন ধরেই তাকে রাজনৈতিক
মঞ্চের ঝড় সামলাতে হচ্ছে। ক্রেমলিনের অভিজাত সমাজের কাছে তিনি রাজনৈতিক
স্থিতধীসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবেই পরিচিত এবং সেই বিশ্বাস তাকে রক্ষা করতে হতোই। তা ছাড়া
যেকোনো রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এমন একটি ধারণাও রাশিয়ার
অভিজাত সমাজের রয়েছে।
প্রিগোজিনের বিদ্রোহ
পুতিনের সম্পর্কে মানুষের ধারণাগত জায়গাটি নষ্ট করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের বিষয়ে
পুতিনের সমালোচনা করে প্রিগোজিন যে বক্তব্য দিয়েছেন তার সঙ্গে একমত প্রেসিডেন্টের
কাছের একাধিক কর্মকর্তা। শুধু তাই নয়, পুতিনের নীতির সমালোচনা রাশিয়ার নিরাপত্তা
প্রতিষ্ঠানের অনেক সদস্যকেও প্রভাবিত করতে পেরেছে। ভবিষ্যতেও এ প্রভাব টিকে থাকবে
বলে অনেকের অনুমান।
বিমান দুর্ঘটনার পর
ওয়াগনার মিলিশিয়া বাহিনীর কয়েকজন সদস্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মস্কোয় আরেকটি
বিদ্রোহ অভিযাত্রার হুমকি দিয়েছেন। তবে তাদের সদস্যসংখ্যা ভয় জাগানোর জন্য যথেষ্ট
নয়। কিন্তু পুতিনের প্রতিবন্ধকতা অনেকটা কমে যাওয়ায় রাশিয়ার অভ্যন্তরে রাজনৈতিক
অস্থিরতা আগের তুলনায় অনেক বাড়বে। রাশিয়ার দিকে যারা মনোযোগী দৃষ্টি রাখেন, তারা রাশিয়ার
অভিজাত সমাজের মধ্যে বিরাজমান সন্দেহপ্রবণতা নিয়ে বহু মতামত ব্যক্ত করেছেন। ২০২২
সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনের ওপর হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েই তাদের যত প্রশ্ন। তবে
পুতিন শুধু ইউক্রেন হামলার জন্যই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন তাও নয়। যখন তিনি বুঝতে
পারলেন এ যুদ্ধ দ্রুতই শেষ হবে না, তখন সামরিক বাহিনীর গতিবিধি শ্লথ করে দিলেন। বিশেষত
খেরসনে পরাজয়ের পর আদৌ সেনাবাহিনীকে সরিয়ে আনবেন কি না, এ সিদ্ধান্ত নিতে না পারাও
ক্ষোভের সঞ্চার করেছিল। প্রিগোজিন যখন বিদ্রোহের ঘোষণা দেন, তখন সিদ্ধান্ত নিতে
পুতিনের এক দিন লেগেছিল। ওই সময় রাশিয়ার জনগণের মনের প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত রূপটি
বার্নস খুব ভালোভাবেই উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘মানুষের মনে এখন একটিই প্রশ্নÑ
সম্রাটের গায়ে উর্দি চাপাতে এত সময় লাগছে কেন?’
অবশ্য পুতিনের ক্ষমতা
পাকাপোক্ত হওয়া মানে ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস পাওয়া। সর্বশেষ খারখিভ ও খেরসনে পরাজয়ের পর
অনেকেই ধারণা করেছিলেন পুতিন পূর্ণ পরাজয় এড়ানোর জন্য পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার
করতে পারেন। আপাতত তেমন ঝুঁকি আর নেই। পুতিনের রাজনৈতিক ও সামরিক অস্তিত্বের জন্য
চীনের অস্তিত্ব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। যুক্তরাষ্ট্রকে চীনা নেতারা
সম্প্রতি ইউক্রেনে রাশিয়ান শক্তির অবস্থান নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করতে দেখা গেছে। তারা
যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বের হয়ে আসার একটি পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন। ইউক্রেনে রাশিয়ার
সামরিক শক্তির অস্তিত্বের ক্ষেত্রে চীনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অন্তত বাইডেন
প্রশাসনের এমনটিই ধারণা। চীন সরাসরি রাশিয়াকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ করছে না। তবে
তারা কম্পিউটার চিপের মতো আধুনিক প্রযুক্তি সরবরাহ করছে, যা যুদ্ধে লক্ষ্যভেদ আরও
নিখুঁত করে তুলবে।
ওয়াশিংটনের আশঙ্কাও
বাড়ছে। ইউক্রেনের সেনারা যে কৃষ্ণসাগর পর্যন্ত তাদের দখল নিতে পারবে না, এমন একটি
বিশ্বাস তাদের রয়েছে। তার পরও রাশিয়ান সামরিক কর্মকর্তাদের বিশ্বাস, ইউক্রেনের
সামরিক বাহিনী রাশিয়াকে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির
জেলেনস্কি ড্রোন হামলা এবং সীমানায় হামলার মাধ্যমে যুদ্ধ রাশিয়ার দিকে ঠেলে দিতে
পারেন। প্রিগোজিনের বার্তাটি স্পষ্ট। এ যুদ্ধে যা ব্যয় হচ্ছে বা ক্ষতিসাধন হচ্ছে
তা রাষ্ট্রের নাগরিকদের শ্রম ও ত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ দিয়ে করা হচ্ছে। পুতিনের
নেতৃত্বকে তিনি সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন। ইউক্রেন যুদ্ধ মিথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে
এমন দুঃসাহসিক মন্তব্যও তিনি করেছেন। প্রিগোজিন বলেছিলেন, রাশিয়ার একটি অংশ এ
যুদ্ধ চেয়েছিল এবং অসংখ্য সেনা তাদের প্রাণ বিসর্জন দিতে বাধ্য হবে। অবশেষে এই
মুষ্টিমেয়র কোনো লক্ষ্যই আদায় হবে না। কিন্তু প্রিগোজিনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠরাই
নিয়ন্ত্রণে আসবে। প্রিগোজিনের অনেক মন্তব্যই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ম্লান হয়ে যাবে।
পশ্চিমা শক্তিগুলো আরও কঠোরভাবে পরবর্তী বছর তাদের কার্যক্রম চালু করবে। যুদ্ধ আরও
ভয়াবহ দিকে মোড় নেবে। ভবিষ্যৎ বলতে পারে, এর ফল কি হবে। প্রিগোজিনকে শহীদ বলা যায়
না, তবে তিনি এ যুদ্ধ বিষয়ে সতর্কতা হয়েই থাকবেন।