× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শিক্ষা

এইচএসসিতে ঝরে পড়া যে বার্তা দিল

ড. মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান

প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০২৩ ১০:২৮ এএম

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৩ ১২:৪৫ পিএম

ড. মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান

ড. মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান

সম্প্রতি প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার দিনান্তর বাড়ছে। এ বছর রাজশাহী বোর্ডে উচ্চ মাধ্যমিকে ফরম পূরণ করা শিক্ষার্থী ছিলেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ৯৬০ জন। আর তার আগে এই শিক্ষাবর্ষে নিবন্ধন করেছিলেন ১ লাখ ৬৪ হাজার ৩৯২ জন। এ হিসেবে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার ২৬.৪১ শতাংশ। আবার এ বছর ১৭ সেপ্টেম্বর উচ্চ মাধ্যমিকের প্রথম দিনের পরীক্ষায় অংশ নেননি ৯৩১ জন শিক্ষার্থী। এদিন অনুপস্থিতির হার ০.৭২ শতাংশ। ২০২২ ও ২০২১ সালে এই ঝরে পড়ার হার ছিল যথাক্রমে ১৯.৫০ ও ১৬.০৬ শতাংশ। বিগত দুই বছরের তুলনায় শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার এবার আরও বেশি অর্থাৎ এটি ক্রমবর্ধমান। এত বেশি শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে কেন? প্রতিরোধের উপায় কী? রাজশাহীর সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানিয়েছেন, শিক্ষা ব্যয় বৃদ্ধিই মূলত ঝরে পড়ার কারণ। কিন্তু একজন অভিভাবক হিসেবে এবং শিক্ষার সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়, এটি একমাত্র কারণ নয়। তবে এ সত্য, শিক্ষা উপকরণ ও অন্যান্য ব্যয় সীমাহীন বৃদ্ধি পেয়েছে। সমাজের দরিদ্রতম ব্যক্তিটিও চায় তার সন্তান লেখাপড়া করুক। কিন্তু লেখাপড়ার ব্যয়ভার বহন করতে না পারার কারণেও অনেকের স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে না। দারিদ্র্য দূর করা না গেলে শিক্ষা ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করা কঠিন হবে। শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করা ও ধরে রাখার জন্য সরকার ইতোমধ্যে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে; বিনামূল্যে বইও দেওয়া হচ্ছে। তার পরও শিশুদের ধরে রাখা যাচ্ছে না।

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা অনেক আগে থেকেই ব্যয়বহুল। আমাদের কালে অর্থাৎ সত্তরের দশকের শেষ দিকেও বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়তে হতো। স্কুলের শিক্ষকরা বাড়িতে বা স্কুলে প্রাইভেট পড়াতেন। তবে বর্তমানের মতো এটি বাণিজ্যিক ছিল না। যে শিক্ষার্থীর সামর্থ্য নেই তাকে কোনো কোনো শিক্ষক টাকাপয়সা ছাড়াই বিষয়বস্তু বুঝতে সহায়তা করতেন। তখন মানুষের আর্থিক অবস্থা আরও নাজুক ছিল। এখন আমাদের অর্থের লোভ যেভাবে পেয়ে বসেছে, তখন এমনটি ছিল না। পড়াশোনায় ভালো কিন্তু আর্থিকভাবে সচ্ছল নয়, এমন শিক্ষার্থীদের শিক্ষকরা বরং ডেকে তার কাছে যেতে বলতেন। এমনকি অনেক শিক্ষককে দেখেছি তার বাড়িতে একই সঙ্গে তিন-চার জন শিক্ষার্থীকে রাখতে। এখন এটি কল্পনা করা যায় না। এখন অনেক শিক্ষক ব্যাচে পড়ান। আবার কোনো স্কুল বা কলেজের শিক্ষক নন তারাও কোচিং সেন্টার খুলে সেখানে ব্যাচের পর ব্যাচ শিক্ষার্থী পড়ান। এটি এখন খুব ভালো ব্যবসা! এখানে সব অভিভাবক তাল মেলাতে পারেন না। কারণ তার সামর্থ্য নেই। ফলে শুরুতেই তিনি তার সন্তানকে বিজ্ঞান বিভাগে না পড়িয়ে অন্য কোনো বিভাগে ভর্তি করেন। আর যারা কষ্ট করে হলেও চালিয়ে নেবেন মনে করে তাদের সন্তানদের বিজ্ঞানেই ভর্তি করেন, তারা কোনো না কোনোভাবে পড়াশোনাটায় সহায়তা দেন। এ ক্ষেত্রে অনেক পরিবার স্থায়ী কোনো সম্পদেও হাত দেয়; যেমন জমি বা অন্য কোনো সম্পদ বিক্রি করে দেয়। এ ক্ষেত্রে নিবন্ধনের পর পরীক্ষায় না বসার সম্ভাবনা অনেক কম। বরং নিবন্ধনের পর পরীক্ষা না দেওয়ার আরও বেশকিছু কারণ রয়েছে, যা আমরা খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করি।

করোনাকালে শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি হতাশায় ছিল। ২০২০-এর মার্চ থেকে ২০২১ সালের পুরোটা সময়ই তাদের ঘরে বসে থাকতে হয়েছে। কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ক্লাস হয়েছে, কিন্তু তাদের খেলাধুলা বা বিনোদন বলতে কিছু ছিল না। তারা এই দীর্ঘ সময় ঘরের বাইরে বেরোতে পারেনি। ফলে মারাত্মক হতাশা তাদের গ্রাস করে। তখন অনেক শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এতই আসক্ত হয়ে পড়ে যে, পড়াশোনায় তারা মন বসাতে পারেনি। করোনাকালে প্রথমবার নির্বাচনী পরীক্ষার ফলাফল বা নবম-দশম শ্রেণির ফলাফলের ভিত্তিতে মাধ্যমিকের ফলাফল ঘোষণা করা হয়। এই শিক্ষার্থীরা যখন উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হলো তাদের জানার ক্ষেত্রে বড় ধরনের শূন্যতা রয়ে গেল। ফলে উচ্চ মাধ্যমিকে এসে অনেকেই তাল মেলাতে পারেনি। তা ছাড়া পরীক্ষাগুলো নির্ধারিত সময় থেকে সরে যাওয়ার কারণে শিক্ষাবর্ষ পিছিয়ে পড়েছে। এটা শিক্ষার্থীদের জন্য বড় ক্ষতি। সরকার ধীরে ধীরে এ বিষয়টি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। সরকারের এ প্রচেষ্টার ফলে উচ্চ মাধ্যমিকে শিক্ষার্থীরা এবার কম সময় পেয়েছে। অন্যদিকে গত বছরে যে সিলেবাসে পরীক্ষা হয়েছে, এবারও একই সমান সিলেবাসে পরীক্ষা হচ্ছে। তবে এবার নম্বর বেশি। কিন্তু গতবারের তুলনায় এবার বেশি প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে। গত বছর পছন্দের সুযোগ বেশি ছিল, এবার কম। কারণ সামগ্রিক বিষয়টিকেই সরকার মূল জায়গায় নিয়ে আসতে চায়।

আর একটি সমস্যা সমগ্র জাতিকে নিঃশেষ করছে তা হলো মাদক। করোনাকালে দীর্ঘকাল ঘরে বসে থাকার পর যে হতাশাগ্রস্ততা, তা থেকেই মাদকাসক্তি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এখন মাদকের ছড়াছড়ি। মাদকাসক্তির বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রেই অভিভাবকদের আয়ত্তের বাইরে। ফলে সন্তানরা পড়াশোনায় মনোযোগী নয়। একদিকে মা-বাবার আয় আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে, অন্যদিকে দ্রব্যের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। পরিবারে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এর ফলে হতাশা বাড়ছে। এরই ফলাফল মাদক সেবন এবং মাদকের পরিণতি কিশোর গ্যাং। নিয়মিত পড়াশোনা না করে অনেকেই এভাবে ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে। ফলে ঝরে পড়ার সংখ্যা বাড়ছে।

শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট ও কোচিং নির্ভরতাও ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ, রাজশাহীর প্রতিবেদকের মূল বক্তব্য হলো তাই। নিম্ন আয়ের পরিবার এ খরচ বহন করতে পারছে না। শুরুতে উল্লেখ করা হয়েছে, শিক্ষকের মধ্যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আগের মতো সংবেদনশীলতা নেই। অন্যদিকে আবার বাংলাদেশের বেশিরভাগ কলেজে শ্রেণিকক্ষে ঠিকমতো পাঠদান হয় না। অনেক শিক্ষকই ঠিকমতো ক্লাসে আসেন না। ফলে শিক্ষার্থী কোচিংয়ের পেছনে ছোটে। মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে দেশের কিছুসংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া ব্যবহারিক পাঠদান প্রায় উঠে গেছে। অথচ একসময় বিজ্ঞান গ্রুপের শিক্ষার্থীদের আরশোলা, টিকটিকি ও ব্যাঙ কর্তন করা আবশ্যিক ছিল এবং স্কুল-কলেজের বিজ্ঞানাগারে বিজ্ঞানসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলাদা ক্লাস নেওয়া হতো। এতে তারা আনন্দ পেত। এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি নেই। ফলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষালয়ে যাওয়ার আগ্রহবোধ করে না। ব্যবহারিক পাঠগ্রহণ ছাড়াই শিক্ষার্থীরা পূর্ণ নম্বর পায়। অভিভাবকরাও নম্বরে খুশি। নম্বর পাওয়ার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা অভিভাবকদের মধ্যে। এজন্য সন্তানরা যখন তাদের অভিভাবকদের প্রত্যাশার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না, তখন তাদের পড়াশোনায় শৈথিল্য আসে এবং একপর্যায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ত্যাগ করে। অর্থাৎ ঝরে পড়ে।

শিক্ষা উপকরণের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, কোচিং-প্রাইভেটে বিপুল খরচ, পাঠদানের ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যথাযথ উদ্যোগের অভাব, অনেক অভিভাবকের সীমাহীন উচ্চাশা এবং সন্তানদের প্রয়োজনীয় কাউন্সেলিং ও সময় না দেওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃষ্ট হতাশা থেকে ঝরে পড়া ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবার ইতিবাচক ভূমিকা পালন জরুরি। কোনো দেশে উচ্চশিক্ষা সস্তায় পাওয়া যায় না। কিন্তু উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত যাতে শিক্ষার্থীরা স্বল্পমূল্যে শিক্ষার সুযোগ পায়, এই বিষয়টি ভেবে দেখা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেতন ফি বড় বোঝা নয়, এ মুহূর্তে বড় বোঝা শিক্ষা উপকরণ ও কোচিং-প্রাইভেটের ব্যয়। বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা প্রয়োজন। কারণ আমরা এক প্রতিযোগিতার বিশ্বে অবতীর্ণ, এখানে ঝরে পড়ারাও অবদান রাখতে পারত। প্রাথমিক-মাধ্যমিকসহ বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধ করতে হলে শিক্ষা খাতের অব্যবস্থাপনা, অদূরদর্শিতা, দুর্নীতিÑ এসবও দূর করতে হবে। মানুষের জীবনমান উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হলো শিক্ষা। কাজেই দেশে প্রত্যেক শিক্ষার্থী যাতে শিক্ষা সম্পন্ন করে সম্পদে পরিণত হতে পারে সেজন্য নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ।

  • শিক্ষাবিদ ও রাজনীতি-বিশ্লেষক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা