ভাওয়াল শালবন
পাভেল পার্থ
প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০২৩ ১০:২৪ এএম
আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৩ ১০:৫৮ এএম
পাভেল পার্থ
চারদিকে কারখানায় বন্দি দগ্ধ লালচে মাটির গড়ে
দাঁড়িয়ে ছিনতাই হওয়া এক দুর্গম শালবনের কথা কী আমরা মনে করতে পারি? ঐতিহাসিক ভাওয়াল
শালবন, যে বনের ক্ষয়িষ্ণু হাড়হাড্ডিও আজ বেঁচে নেই। প্যারাহরিণ, বুনোশূকর আর বনময়ূরের
জন্য ভাওয়াল বন একসময় বিখ্যাত ছিল। ব্রিটিশ উপনিবেশকালে ফ্রাংক বি সিমসন যখন শাসক হিসেবে
এই পূর্ববঙ্গে আসেন তখন বিভিন্ন বনাঞ্চলে বন্য প্রাণী শিকারের নেশায় ঘুরেছেন। সেসব
শিকারের অভিজ্ঞতা নিয়ে তার একটি বই আছে। ১৮৮৬ সালে ‘লেটার্স অন স্পোর্টস ইন ইস্টার্ন
বেঙ্গল’ নামের বইটি লন্ডন থেকে প্রকাশ করে টেলর অ্যান্ড ফ্রান্সিস। ভাওয়াল শালবনকে
একসময় বলা হতো ময়ূরবন। যদিও ১৯৮৫ সালে ভাওয়াল বনে শেষ ময়ূর-দর্শনের কথা শোনা যায়।
কালিয়াকৈরের মৌচাক ইউনিয়নে হরিণহাটি নামে একটি
গ্রাম আছে। হরিণের জন্যই এমন নাম হয়েছিল এ গ্রামের। কিন্তু এখন এই গ্রাম ইটপাথরের বিল্ডিং
কারখানায় বোঝাই এক দমবন্ধ বস্তি। হরিণ ও ময়ূরের পাশাপাশি একসময় শালবন বাঘশূন্যও হয়ে
পড়ে। ১৯৪০ সালে ভাওয়াল শালবনে বাঘের সর্বশেষ বিচরণের কাহিনি জানা যায়। বাঘের স্মৃতি
নিয়ে এখনও ভাওয়াল শালবনে টিকে আছে বাঘের বাজার, বাঘেরচালা, বাঘেরবাইদ, বাঘাডোবা এলাকাগুলো।
কী নিদারুণ! মাত্র ১৩০ বছরে বিশ্বের এক প্রাচীন পত্রঝরা বনভূমিকে চোখের সামনে খুন করা
হলো। ভাওয়াল শালবন দখল আর দূষণ করে গড়ে ওঠা বসতি ও শিল্পাঞ্চল অর্থনীতিতে ব্যক্তিমুনাফাকে
দশাসই করেছে ঠিকই, কিন্তু প্রাণ-প্রকৃতির ঐশ্বর্য হয়েছে নিখোঁজ। ভাওয়াল শালবনের ওপর
জবরদখলের নিষ্ঠুর বাহাদুরি এখনও থামছে না।
ভাওয়াল শালবনকে দখল বাহাদুরির জেলখানায় বন্দি
রেখে প্রতিবছর আমরা বিশ্ব পরিবেশ দিবস আয়োজন করি। বিশ্ব বন দিবস বা প্রাণবৈচিত্র্য
দিবসে বন বাঁচানোর অঙ্গীকার করি। ১৯ আগস্ট প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘কালিয়াকৈর রেঞ্জ
: বনভূমি দখল করে অসাধুদের জমিদারি’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ভাওয়াল
বনের কালিয়াকৈর রেঞ্জে সরকারি হিসাবে ২৯ হাজার একর শালবন থাকলেও প্রতিদিন এর পরিধি
কমছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চন্দ্র বিটের মাটিকাটা এলাকায় বনের গাছ বিষ দিয়ে
মেরে সেখানে দোকান ও বসতবাড়ি নির্মাণ করা হচ্ছে। এমনকি পল্লী বিদ্যুৎ এবং তিতাস গ্যাসও
বনভূমির বেদখল হওয়া জায়গাতে বৈধ সংযোগ দিয়েছে। বনের বুক চিরে যাওয়া ঢাকা-টাঙ্গাইল আঞ্চলিক
সড়কের চারধারে নানাভাবে বন দখল করে বাণিজ্য বিস্তার করেছে বহুজন। বন বিভাগ থেকে অবৈধ
স্থাপনা উচ্ছেদের প্রস্তাব উপজেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো হলেও তা বাস্তবায়িত হচ্ছে
না। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চন্দ্রা বিটের এপেক্স হোল্ডিং ও ফারইস্ট কারখানা থেকে
রেলগেট পর্যন্ত আঞ্চলিক সড়কের দুপাশে বন বিভাগের গাছ নিধন করে ৫ হাজারের বেশি দোকান
ও ঘরবাড়ি তৈরি করা হয়েছে। একেকজন দখলদারের নিয়ন্ত্রণে আছে শতাধিক দোকান। প্রাকৃতিক
বনাঞ্চল দখল ও দূষণ করে এমনতর একতরফা মুনাফার উন্নয়ন হতে পারে না। সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশ
ভাওয়াল শালবনের সুরক্ষা দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ। রাষ্ট্রের বন আইন ও নীতি ভাওয়াল শালবনের
সপক্ষে। তাহলে কেন এই বন অরক্ষিত আর রক্তাক্ত হচ্ছে বারবার। আমরা আশা করব বন বিভাগ
দ্রুত ভাওয়াল শালবন সুরক্ষায় সক্রিয় ও তৎপর হবে। প্রশাসন কালিয়াকৈর রেঞ্জের বনাঞ্চল
দখলমুক্ত করবে।
১৯৭৩ সালে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যোন ঘোষণার পর ২০১০
সালে প্রায় ৬৪ কোটি টাকার প্রাক্কলিত ব্যয়ে একনেক গাজীপুরের ভাওয়াল শালবনে দেশের দ্বিতীয়
‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক’ প্রকল্পটি অনুমোদন করে। বাংলাদেশ বন বিভাগের ভাষ্য
অনুযায়ী এটি এশিয়ার বৃহত্তম সাফারি পার্ক। বৃহত্তম এই সাফারি পার্ক গড়ে তোলা হলেও শালবনের
বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তাই দেখা গেছে শালবন বাস্তুতন্ত্রে বেমানান
নানা প্রাণীদের বাইরে থেকে এনে এখানে নির্দয়ভাবে হত্যা করা হয়েছে। অথচ পুরো ভাওয়াল
শালবনকে দখল ও দূষণের বাহাদুরি থেকে রাজনৈতিকভাবে সুরক্ষা দিতে পারলে এখানে প্রাকৃতিকভাবেই
দেশের অনন্য বন্য প্রাণী বিচরণস্থল গড়ে উঠতে পারত।
মধুপুর ও ভাওয়াল গড়ের ভূমির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলোÑ
স্থানীয়ভাবে এখানে উঁচু ভূমিকে চালা ও নিচু ভূমিকে বাইদ বলে। বাইদ জমিগুলোই বনের আশপাশের
জনগণের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম সূত্র। এককালে শালবনের ভেতর এসব বাইদ জমিনে বিন্নি,
কাইকা, চিনিগুঁড়া, কালিজিরা, কুমলি, নোহা, রাজাশাইল, মালতী, ক্ষীনই, আবছায়া, নতিফশাইল
চাষ করত স্থানীয় বর্মণ, কোচ, মান্দাই জনগোষ্ঠী। উঁচু চালা জমিনের ধান ছিল কাতিশাইল,
বিরণ, ভাদুরিয়া, কালাহাইটা, বৈরাগিহাইটা, বৈলান, খুদবৈলান, বড়বৈলান, কটকতারা, চাকুলা,
মাধবজটা, ইঞ্চুরি, দাইরল। কিন্তু এসব ধান বহু আগেই হারিয়েছে এই ভাওয়াল গড়। শালবন জবরদখল
করে গড়ের ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও শ্রেণি পরিবর্তন করা হচ্ছে। চালা ও বাইদ জমিনের বাস্তুতন্ত্র
ও প্রতিবেশব্যবস্থা বিপর্যস্ত হচ্ছে।
ভাওয়াল শালবনে ২২০ প্রজাতির উদ্ভিদ, ১৩ প্রজাতির
স্তন্যপায়ী, ৯ প্রজাতির সরীসৃপ, ৫ প্রজাতির উভয়চর ও ৫ প্রজাতির পাখি টিকে আছে। অন্য
এক সমীক্ষা থেকে জানা যায়, ২৪ প্রজাতির লতা, ২৭ তৃণ, ৩টি পাম, ১০৫ প্রজাতির গুল্ম,
১৯ প্রজাতির ছোট উদ্ভিদ ও ৪৩ প্রজাতির বৃক্ষসহ মোট ২২১ প্রজাতির উদ্ভিদ ভাওয়াল শালবনে
রয়েছে (সূত্র : আওয়ার নেচার, ২০০৫)। নুহ আলম ও এম এ গফুর ২০০৮ সালে ভাওয়াল গড়ের চন্দ্রা
শালবন থেকে মোট ১২ প্রজাতির লাইকেন শনাক্ত করেন (সূত্র : বাংলাদেশ জার্নাল অব বোটারি,
৩৭/১ সংখ্যা)। শাল, গাদিলা, কুম্ভি, আজুলি, আনই, বংকুই, কুলবরই, বনবরই, মনকাঁটা, বনবাঁশ,
জয়না, বট, বিলাইপেঙ্গা, সোনালু, আমলকী, হরীতকী, বহেড়া, গন্ধভাদাইল্যা, কুমারীডোগা,
নেংগুরালতা, ঝিনইলতা, আলেকলতা, গিলা এখনও বাঁচিয়ে রেখেছে বনের মুমূর্ষু প্রাণ। ভাওয়াল
শালবন ছিল স্থানীয় বর্মণ, ক্ষত্রিয়, ওঁরাও, মান্দাই ও দরিদ্র বাঙালি জনগণের খাদ্য,
ওষুধ ও জ্বালানির এক ঐতিহাসিক উৎসস্থল। মূলত শীতকাল বনের আলু তোলার সময়। কোচদের ঐতিহ্যবাহী
বুড়াঠাকুর উৎসবে কেন্দুগাছের পাতাসহ ডাল লাগে, যা কেবল শালবনেই জন্মে। পূজায় আজুগিগাছের
পাতায় ভোগ-নৈবেদ্য সাজাতে হয়। কিন্তু ভাওয়াল শালবনের এমন ঐতিহ্য এবং বৈচিত্র্য এখন
আর নেই।
নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের সাড়াজাগানো নাটক বনপাংশুলে আমরা ভাওয়াল শালবনের ক্ষয়িষ্ণু জীবনের মান্দাই সংস্কৃতির আহাজারি দেখি। বনের মতোই বনের জীবন উন্নয়ন বাহাদুরিতে কেমন বিবর্ণ, পাংশু আর জীর্ণ হয়ে ওঠে। আমাদের অরণ্য, আমাদের দায়িত্ব। বাংলাদেশের জন্ম, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং অর্থনীতিতে ভাওয়াল শালবনের পরিবেশগত অবদানকে কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। আমাদের উন্নয়ন বাহাদুরিতে এই প্রাচীন পত্রঝরা বন নিশ্চিহ্ন হতে পারে না।