× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বন্যা ও জলাবদ্ধতা

পানি ব্যবস্থাপনা সুচারু করার বিকল্প নেই

ড. মো. জিল্লুর রহমান

প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৩ ০৯:৪৬ এএম

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২৩ ১৪:২২ পিএম

ড. মো. জিল্লুর রহমান

ড. মো. জিল্লুর রহমান

সম্প্রতি চট্টগ্রামে দুই দিনের ভারী বর্ষণে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। উত্তরাঞ্চলেও বৃষ্টিপাতের কারণে বন্যা দেখা দেয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতা বাড়ছে, এ কথা সত্য। কিন্তু একইসঙ্গে এ কথাও ভুলে গেলে চলবে না, মানবসৃষ্ট দুর্যোগও এ ক্ষেত্রে একটি বড় প্রভাবক। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে পাহাড় বেশি। পাহাড়ি অঞ্চলে বিগত কয়েক দিন আগে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। সচরাচর পাহাড়ি বৃষ্টি খেয়ালের বশে হয়। একটানাও হতে পারে আবার আচমকাও হতে পারে। পাহাড়ি অঞ্চলে বৃষ্টির পানি প্রবাহিত হয় পুব থেকে পশ্চিমে। কর্ণফুলী, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, নাফ– এ চার নদনদীতে সেই পানি গিয়ে পড়ে। পাহাড় থেকে এ পানি আড়াআড়িভাবে পড়ে। কিন্তু পাহাড়ি এ পানির ঢল ওই চার নদনদীতে পড়তে পারছে না। দেশে প্রতি বছরই কমবেশি বন্যা দেখা দেয়। বাংলাদেশ ভাটির দেশ। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নদনদীর উৎস দেশের ভূসীমানার বাইরে। অভিন্ন নদনদীগুলোর গতিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখার ব্যাপারে প্রতিবেশী দেশ, বিশেষ করে ভারত ও নেপালের সঙ্গে এমন গঠনমূলক উদ্যোগ নেওয়া উচিত যাতে তা ফলপ্রসূ হয়। গত ৫০ বছরে দেশে প্রচুর বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ তৈরি হলেও রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে সরকার সাফল্যের পরিচয় দিতে পারছে না, এটা এক বড় সমস্যা। সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব এবং অনিয়ম-দুর্নীতি রোধ করতে না পারাই এর মূল কারণ। বন্যার সঙ্গে সহাবস্থান করে জীবনধারণের কৌশলও বের করা দরকার। কেননা প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের ভূপ্রাকৃতিক গঠনই এমন যে, কোথাও কোথাও ভূভাগ যথেষ্ট ঢালু। ভূতাত্ত্বিকভাবে দেশটির উত্তর দিকে রয়েছে সুউচ্চ হিমালয় পার্বত্যাঞ্চল, যেখান থেকে বরফগলা পানির প্রবাহে সৃষ্ট বড় বড় নদনদী (গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা ইত্যাদি) বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে প্রবহমান এবং নদনদীগুলো গিয়ে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে পড়ছে। বর্ষাকালে প্রবাহ বেড়ে গেলে নদনদী উপচে পানি লোকালয়ে পৌঁছে যায় এবং দেশটি এভাবে প্রায় প্রতি বছরই বন্যায় আক্রান্ত হয়। বাংলাদেশ নাতিশীতোষ্ণ তাপমাত্রার দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও বিগত কয়েক বছরে তাপমাত্রার অস্বাভাবিক আচরণে সেই পরিচিতি ম্লান হয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে বৃষ্টিপাত হ্রাস পাবে বলে বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা। বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশে বৃষ্টিপাতের মৌসুম এবং ধরন পরিবর্তিত হয়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে আকস্মিক, মধ্যমেয়াদি বন্যার শঙ্কাও।

সম্প্রতি আমরা দেখলাম, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল লাইন প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর পাহাড়ি ঢলের  পানি নেমে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। কারণ আড়াআড়ি যে পথে পানি নেমে যাওয়ার কথা সেই পথ দিয়ে পানি নামতে পারছে না। ঢাকা-চট্টগ্রাম ডাবল লাইন প্রকল্পের ক্ষেত্রে বলা হয়েছিল, ১০০ বছরেও এ রেললাইন পানিতে নিমজ্জিত হবে না। এক বছর হওয়ার আগেই পাহাড়ি ঢলে ডুবে গেল রেললাইন। পরিকল্পনাগত ত্রুটি ও সমীক্ষার বিষয়গুলো বিচার না করার ফলে এ সমস্যা হয়েছে। একটি প্রকল্প পরিকল্পনা করার ক্ষেত্রে ভূপ্রকৃতি এবং ভূপ্রকৃতির বন্ধুরতা আমাদের বিচার করতে হবে। যেকোনো ভৌগোলিক অঞ্চলের কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের নামে ভূপ্রকৃতি নষ্ট করা ঠিক নয়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আমরা অবকাঠামোগত উন্নয়ন করব না। বরং অবকাঠামো ও ভূপ্রকৃতির সামঞ্জস্য নির্ধারণ করে পরিকল্পনা সাজাতে হবে। পরিস্থিতি আমাদের দেখিয়ে দিল কোন দিকে নজর কতটা গভীর করা দরকার।

যেকোনো পরিকল্পনার আগে ওই অঞ্চলের মাটির রূপপ্রকৃতি, গঠন, চারপাশের প্রকৃতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা, প্রকল্পের ওপর অন্যান্য বন্ধুরতার নেতিবাচক প্রভাব ইত্যাদি বিবেচনা করতে হবে। দেশে অধিকাংশ প্রকল্পের ক্ষেত্রেই বৈজ্ঞানিক কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করা হয় না। বরং সব সময় পাঠানো হয় রিপোর্ট। এসব কোনো দিনই প্রকল্প বা অবকাঠামোর ক্ষেত্রে করা উচিত নয়। পাহাড়ের এমন অনেক বন্ধুর স্থান রয়েছে যেখান দিয়ে রেললাইন নেওয়া হয়েছে। সেখান দিয়ে রেললাইন না নিয়ে একটু ঘুরতিপথে নেওয়া যেত। তাতে হয়তো সামান্য ব্যয় বাড়ত, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের ক্ষেত্রে অর্থ অপচয়ের শঙ্কা করতে হতো না।

মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা দিচ্ছে বন্যা পরিস্থিতি। কিছুদিন আগেও চীনের অবস্থা ছিল নাজুক। আমরা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অনেক উন্নতি করেছি। তবে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস যেন আমাদের ক্ষতির কারণ না হয়। আগে থেকেই প্রস্তুতি থাকলে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। এ ছাড়া আমরা অধিকাংশ সময় বন্যা চলাকালে পরিস্থিতি মোকাবিলা তথা উদ্ধার তৎপরতা, ত্রাণ বিতরণ ইত্যাদির প্রতি অধিক গুরুত্ব প্রদান করি। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর জনস্বাস্থ্য রক্ষা, বন্যাকবলিত মানুষের পুনর্বাসনের প্রতি গুরুত্বের বিষয়ে মনোযোগ আরও বাড়াতে হবে। মৌসুমি বন্যা আকার ও মাত্রায় সম্ভবত বিপর্যয়কর রূপ ধারণ করছে, এও আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে।

এসব কিছু আমলে রেখেই পরিকল্পনা আরও গতিশীল করতে হবে। উন্নত বিশ্বে কোনো অবকাঠামো তৈরি করা হলে একটি কার্বন ফুটপ্রিন্ট গড়ে তোলা হয়। একটি ভবন তার মেয়াদকালে কতটা কার্বন নিঃসরণ করবে তা পরিমাপ করা হয়। আমাদেরও এভাবে প্রযুক্তিগতভাবে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। বিশেষত দেশে পরিকল্পনার আধুনিকায়ন জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তন একটি বাস্তবতা। তবে প্রকৃতির ভারসাম্যের বিষয়টি নিয়ে ভাবলেও অবকাঠামোগত উন্নয়ন কমানো সম্ভব নয়। সাম্প্রতিক সময়ে শিল্পকারখানা এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি এশিয়া অঞ্চলে হচ্ছে বেশি। তবে এ অঞ্চলের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্বন নিঃসরণের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। আমরা এখনও অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ইটের ওপর নির্ভর করি। কিন্তু মাটি পুড়িয়ে শক্ত করে ইট না বানিয়ে অন্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আশ্রিত ইট বানানো সম্ভব। তা ছাড়া প্রকৃতিতে প্লাস্টিক বা অন্যান্য বর্জ্য উন্মুক্ত করে দেওয়া যাবে না। এগুলো রিসাইকেল করার জন্যও পদক্ষেপ নিতে হবে। সম্প্রতি রিসাইকেল প্রকল্পের দিকে সরকার মনোযোগ দিচ্ছে। তবে সবকিছুতে পরিকল্পনা প্রয়োজন। বন্যানিয়ন্ত্রণ ও নদীভাঙন ঠেকানোর কর্মপরিকল্পনাও এর বাইরে নয়। সুসমন্বিত একটি পরিকল্পনা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে অসাধুদের তৎপরতা থামাতে হবে। সঠিকভাবে ড্রেজিং করলে আমাদের জলাশয়গুলো ক্ষতির মুখে পড়ে না। জলবায়ু পরিবর্তনের মনুষ্যসৃষ্ট চিহ্নিত কারণগুলো সমাধান করতে হবে। আমরা যদি বিশ্বে রোল মডেল হতে পারি, তাহলে অবশ্যই অন্যান্য দেশও আমাদের কৌশলগত প্রক্রিয়ার সঙ্গে শামিল হবে। আরও এক দফা বড় বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। তাই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে হবে সঞ্চিত অভিজ্ঞতার আলোকে।

তাৎক্ষণিক ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মসূচির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন পরিকল্পনা করতে হবে। পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাট, বাঁধ মেরামত করতে হবে। কেন বন্যা প্রলয়ংকরী হয়ে উঠছে, তার কারণও অনুসন্ধান করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃষ্টিপাতের মাত্রা ছাড়াও নদনদী ও জলাভূমি ভরাট হয়ে যাওয়া এবং বন্যার প্রবাহপথগুলো অবকাঠামো ও স্থাপনায় বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বন্যা বিপর্যয়কর এবং দীর্ঘমেয়াদি হয়ে উঠছে। ফলে প্রতি বছরই দেখা যাচ্ছে নতুন মাত্রার বিপর্যয়। জলাবদ্ধতার সমস্যা মোকাবিলায় মূলত দুটি বিষয় একটি রাষ্ট্রকে মাথায় রাখতে হবে। প্রথমটি হচ্ছে প্রশমনমূলক ব্যবস্থা। বনভূমির পরিমাণ বাড়াতে হবে। অবশ্যই নগরে পরিকল্পিতভাবে গাছ লাগাতে হবে। জলাশয় রক্ষা করতে হবে। এ বিষয়গুলো প্রশমনমূলক ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত। কারণ প্রাকৃতিক অভয়ারণ্য বিনষ্ট হলে দুর্যোগের তীব্রতা বাড়বে। মোট কথা, কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ কমাতে হবে। কলকারখানার বর্জ্য মিশে নদনদীর পানি আলকাতরার রূপ নিয়েছে বিভিন্ন জায়গায় বহু আগেই। নদীমাতৃক বাংলাদেশÑ গালভরা এ বুলি এখন মানুষ ভুলতে বসেছে।

দেশের দক্ষিণাঞ্চল ছাড়াও যে বিভিন্ন জেলায় স্রোতস্বিনী নদী ছিল, ভরা জলের যৌবন ছিল আমাদের নদীগুলোর, সেই যৌবন কেন ফুরিয়ে গেল? দেশের নদনদীগুলোর নাব্য হ্রাস পেয়েছে এবং এর ফলে প্লাবনভূমির ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। এতে কম পানিতেই বেশি বন্যা সৃষ্টি হচ্ছে। এ অবস্থায় নদনদী খননের মাধ্যমে উজান থেকে বেয়ে আসা পলি নিয়মিতভাবে ও দ্রুত অপসারণ করা না হলে ভবিষ্যতে দেশে বন্যার প্রকোপ ও ব্যাপ্তি ক্রমেই বাড়তে থাকবে। এ বিষয়েও দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি। প্রতি বছরই বন্যা হতে পারে। তাই ভবিষ্যতে সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবিলায় বন্যার ব্যবস্থাপনা এখন থেকেই গড়ে তুলতে হবে, ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ‘স্ট্যান্ডিং অর্ডার অন ডিজাস্টার’ ধরে। নদনদী উদ্ধারেও আলাদা মনোযোগ দিতে হবে। বৃষ্টিপাতের ফলে পানি জলাশয়ে পড়তে পারছে না। শহরেও পর্যাপ্ত জলাশয় নেই। দেশের অনেক নদনদীই আজ বিলুপ্তপ্রায়। এসব নদনদী রক্ষা করতে পারলে পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও আমরা সুবিধা পেতাম।

  • চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক, ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা