কুলাউড়ায় জঙ্গি আস্তানা
ড. জিয়া রহমান
প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০২৩ ১৩:৪৯ পিএম
বিচ্ছিন্নভাবে
হলেও সম্প্রতি জঙ্গি তৎপরতা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। ১২ আগস্ট প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ
প্রকাশ, মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার দুর্গম এলাকা টাট্টিউলিতে জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে
একটি বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করে ছয় নারী, তিনি শিশুসহ ১৩ জনকে আটক করেছে কাউন্টার
টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)। এ অপারেশনের নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন
হিলসাইড’। ‘ইমাম মাহমুদের কাফেলা’ নামে নতুন এ জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা দাওয়াতের কাজে
নিয়োজিত ছিল বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ। ঘটনাস্থল থেকে বিপুলসংখ্যক জিহাদি বই, কয়েক কেজি
বিস্ফোরক ও ৩ লক্ষাধিক নগদ টাকাও উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধির বরাত দিয়ে
প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর ওই প্রতিবেদনে এও বলা হয়েছে, আটকরা কেউই স্থানীয় নন। তারা এখানে
জায়গা কিনে আস্তানা গেড়েছিলেন। ১৪ আগস্ট প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর অনলাইনে পরিবেশিত সংবাদে
জানা যায়, ওই দিন টাট্টিউলি বাইনাবাড়ি এলাকায় ফের অভিযান চালিয়ে সন্দেহভাজন আরও ১৭
জনকে আটক করা হয়। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, স্থানীয় জনতা এই জঙ্গিদের ধরিয়ে দিতে আইনশৃঙ্খলা
রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তা করেছে। আমরা অতীতেও সচেতন জনগণের এমন সহায়তাদান দেখেছি।
এতে প্রতীয়মান হয়, বড় অংশের জনগোষ্ঠীর মধ্যেই জঙ্গি কিংবা উগ্রবাদ বিরোধী চেতনা অত্যন্ত
জাগ্রত। এ বিষয়টি বিদ্যমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে নিঃসন্দেহে আশাজাগানিয়া। ১৫ আগস্ট
সংবাদমাধ্যমে আরও প্রকাশ, কুলাউড়ার ওই পাহাড়ি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান
অব্যাহত রেখেছে।
এ ছাড়া ভিন্ন
আরেকটি প্রতিবেদনে একই পত্রিকায় এর ৪ দিন আগে বলা হয়েছে, ২৫০ জঙ্গি জামিনে মুক্ত হয়ে
নানাভাবে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। বর্তমানে জঙ্গিবাদের বিকাশ সারা বিশ্বের জন্যই একটি বড় সংকট।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে অপরাধের বিভিন্ন ঢেউ পরিলক্ষিত হয় এবং এখন ধর্মীয়
অনুভূতি আশ্রয় করে জঙ্গি তৎপরতা চলছে। অতীতে আমরা শ্বেতাঙ্গদের আধিপত্যের ভিত্তিতে
ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব দেখেছি। নাইন-ইলেভেনের পর ইসলাম ধর্মকে
ভিত্তি করে আল-কায়েদার মতো জঙ্গি সংগঠনের জন্ম হয়। তাই এ সমস্যা সুদীর্ঘকাল ধরেই আমাদের
মধ্যে রয়েছে এবং ধর্মকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এ জঙ্গি তৎপরতা সাম্প্রতিক সময়ে প্রকট
আকার ধারণ করার পাশাপাশি বৈশ্বিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এ সংকটের পেছনে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক
প্রতিবন্ধকতার দায় রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যেসব অঞ্চলে জঙ্গিবাদ রয়েছে সেসব অঞ্চলে মূলত
তেল, গ্যাস বা অন্যান্য অর্থনৈতিক বিষয় নিয়েই সংকট তৈরি হয়েছে। আন্দোলন বা কথিত বিপ্লবের
স্বার্থে তাকে ধর্মীয় আবরণ দেওয়া হয়। প্যালেস্টাইনের সংকট রাজনৈতিক হিসেবেই গণ্য করতে
হবে। অন্যদিকে আফগানিস্তান ও ইরাকে অর্থনীতি, রাজনীতি এই দুই স্বার্থই রয়েছে।
বিশ্বের বৃহৎ
শক্তিগুলো নানাভাবে এ জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। পাশাপাশি বৃহৎ শক্তিগুলোর তাদের
মিত্রশক্তিদের রক্ষা করার বিষয়টিও ভাবতে হয়। ‘ওয়ান মেন্স টেররিজম, ওয়ান মেন্স ফ্রিডম’Ñ
এ বক্তব্যটি দৃষ্টিকোণগত। কোনো অঞ্চলে জঙ্গি গোষ্ঠীরা নিজেদের স্বাধীনতা অর্জনের কারিগর
ভাবছে, অন্যদিকে সরকার তাদের মনে করছে জঙ্গি। দেশে জঙ্গিবাদের স্বরূপ উন্মোচন করতে
গেলে দেখা যাবে, অভ্যন্তরীণ তৃণমূল পর্যায়ের রাজনীতি থেকে অনেকে জঙ্গি তৎপরতায় যুক্ত
হয়। বাহাত্তরের সংবিধানের মাধ্যমে দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
পঁচাত্তরের পর সংবিধানের ৩৮ ধারা রদ করে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান আবারও ধর্মভিত্তিক
রাজনীতির পথ উন্মুক্ত করেন। বলা বাহুল্য, মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে যাদের অবস্থান ছিল
তারা আবার রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায় এবং পরে আঞ্চলিক রাজনীতিতে পাকিস্তানের ইন্টেলিজেন্স
ইউনিটের তদারকিও আমরা বিভিন্ন সময় দেখেছি। শুধু পাকিস্তানই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের ধর্মীয়
উগ্রবাদীদের সঙ্গে সম্পৃক্ততাও নানা সময়ে দেখা গেছে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের সঙ্গে বিরোধের
কারণে আঞ্চলিক পর্যায়ে রাজনীতিতে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটে। এরই ধারাবাহিকতায় ২১ আগস্ট
গ্রেনেড হামলা, দেশব্যাপী ধর্মীয় উগ্রবাদী নানা সংগঠনের ত্রাসের রাজত্ব কায়েম এবং সম্প্রতি
পাহাড় ও সমতলে নানাভাবে তরুণদের ব্রেনওয়াশের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ঘটনা চলমান রয়েছে।
নিকট অতীতে জঙ্গি
তৎপরতার যে চিত্র দেখা গিয়েছিল, এখন তার সঙ্গে তুলনা করতে গেলে বাস্তবতা বোঝা যাবে
না। অতীতে যুদ্ধাপরাধের বিচারে প্রমাণাদি এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত কিংবা গবেষণা না করার
ফলে অনেকের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়নি। আবার সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গিদের
বিরুদ্ধে তদন্ত প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে প্রচলিত পদ্ধতি অনুসরণের ফলে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই তারা জামিন পেয়ে আবার জঙ্গি কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে।
মূল সমস্যাটি তাই যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় তথ্য-দলিল সংগ্রহ ও গবেষণার অভাব থেকে
সৃষ্ট। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ঘিরে এক ধরনের অভ্যন্তরীণ সংকট তৈরি হওয়ার ফলে আমরা ব্লগার
হত্যা থেকে শুরু করে হোলি আর্টিজানের মতো মর্মন্তুদ ঘটনার সাক্ষী হয়েছি। সামাজিক সংকটের
জায়গা থেকে জঙ্গিবাদ সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাওয়া ভালো খবর নয়। তবে এই স্থানান্তরের
ফলে জঙ্গিবাদের স্বরূপ আমাদের কাছে অস্পষ্ট আকার ধারণ করেছে, বিষয়টি এমন নয়। বরং জঙ্গিবাদের
উত্থানের ধারাবাহিকতা এবং জঙ্গি তৎপরতায় ভুক্তভোগীদের ইতিহাসও বিবেচনা করতে হবে। ২০০১
সালে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিধনযজ্ঞও দৃষ্টিসীমার বাইরে
যেতে পারে না। অতীতে বিষয়টি অভ্যন্তরীণ সংকট হওয়ায় তার তৎপরতার মাত্রা একরকম ছিল। বিশ্বায়ন,
অর্থনীতির নানা দিক উন্মোচন এবং প্রযুক্তির উৎকর্ষের ফলে জঙ্গি তৎপরতার বৈচিত্র্য বাড়তে
শুরু করে। সর্বশেষ হোলি আর্টিজান হামলার পর জঙ্গিবাদের নতুন উত্থান দেখা যাচ্ছে।
নতুন নতুন জঙ্গি
সংগঠন গজিয়ে উঠছে এবং সত্য বটে, ওরা বিচ্ছিন্ন কিন্তু নিষ্ক্রিয় নয়। বরং বিচ্ছিন্নতার
মাধ্যমে তারা আড়ালে সমন্বয়ের সুযোগ পাচ্ছে। বিচ্ছিন্নতার পেছনে তাদের ‘আইডেন্টিটি
পলিটিক্স’ কাজ করছে। উদাহরণ হিসেবে জামায়াতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারকিয়ার সঙ্গে সম্প্রতি
কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) সম্পৃক্ততার বিষয়টি উল্লেখ করা যায়। দুটির উদ্দেশ্য
ও আদর্শ আলাদা। কিন্তু রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দুটি সংগঠনের অবস্থান থাকায় মৌলিক কিছু
স্বার্থ তাদের মিলে গেছে। ফলে বিচ্ছিন্ন সংগঠন হলেও তারা একে অন্যকে সহযোগিতার
মাধ্যমে সক্রিয় থাকতে পারছে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের সঙ্গে ধর্মীয় রাজনৈতিক এবং উগ্রবাদী
সংগঠনের বিরোধ রয়েছে। বর্তমান সরকার জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ নীতি ঘোষণা
করেছে। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ইন্টারপোলও জঙ্গিবাদের
বিরুদ্ধে সরকারের এ অবস্থানকে স্বীকৃতি দিয়েছে। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপই
সফলতার কারণ বলা যাবে না। আমরা যেন ভুলে না যাই, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার
যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়নি। এও মনে রাখতে হবে, ধর্মীয় উগ্রবাদী সংগঠনের পৃষ্ঠপোষকতার পেছনে
কোনো বড় শক্তি রয়েছে। পৃষ্ঠপোষক বা সহায়তা ছাড়া জঙ্গি সংগঠন তাদের কার্যক্রম পরিচালনা
করতে পারে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিয়মিত তৎপর। পার্বত্য
চট্টগ্রাম, বান্দরবান বাদেও নারায়ণগঞ্জ, যশোর, দিনাজপুর অঞ্চলেও জঙ্গিদের বিচ্ছিন্ন
কার্যক্রম দেখা গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের নীতিমালা অনুসারে অভিযান পরিচালনা
করছে এবং সাফল্যও পাচ্ছে। কুলাউড়ার অভিযান তারই ধারাবাহিক ফল বলে ধরে নিতে হবে।
কুলাউড়ার অভিযানের
একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আটকদের মধ্যে কয়েকজন নারীও রয়েছেন। দেশে জঙ্গিবাদে নারীদের
সম্পৃক্ততা নিয়ে অতীতেও কথা হয়েছে। অর্থনীতি বা প্রাতিষ্ঠানিক খাতে নারীর অধিকার যে
প্রতিষ্ঠিত হয়নি তার একটি প্রতিফলন জঙ্গি সংগঠনে নারীসম্পৃক্ততা। নারীর অধিকার বলতে
শিক্ষা বা প্রাতিষ্ঠানিক খাতে নারীর অংশগ্রহণ বোঝানো হচ্ছে না। বরং অপ্রাতিষ্ঠানিক
খাতেও নারীর অংশগ্রহণ রয়েছে। যেখানে অনেক ক্ষেত্রেই নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়নি। অধিকাংশ
ক্ষেত্রে নারী তার স্বামী বা পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো অনুসরণ করে। তাই তারাও নানাভাবে
জঙ্গিবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। এজন্য সামাজিক পর্যায়ে অপরাধ পরিবারকেন্দ্রিক হতে
দেখা যায়। মাদক, অস্ত্র বা অন্যান্য সামাজিক অপরাধের ক্ষেত্রে পরিবার কেন্দ্র হিসেবে
থাকে। আর পরিবারভিত্তিক অপরাধী চক্রে সচরাচর সবার মতামতের প্রাধান্য থাকে না। অপরাধী
চক্রকে একসময় নানাভাবে রাজনৈতিক আশ্রয় নিতে গিয়ে জঙ্গিবাদের সঙ্গেও সম্পৃক্ত হতে হয়।
এভাবে বিচ্ছিন্ন কিছু চক্রকে জঙ্গি সংগঠনগুলো নানা পর্যায়ে ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা
রক্ষাকারী বাহিনীকে দ্বিধান্বিত করে ফেলার চেষ্টা করে।
কুলাউড়ার ঘটনাটি আমাদের একটি শিক্ষা দেয়। উগ্রবাদী চিন্তাভাবনার পৃষ্ঠপোষকতা কেউ না কেউ করছে। কারণ বিচ্ছিন্ন হলেও তাদের আন্তঃসংযোগ গড়ে ওঠার পেছনে রিসোর্স সরবরাহের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। একটি সংগঠন পরিচালনার জন্য আর্থিক সক্ষমতা অত্যন্ত জরুরি। অপরাধের এ মাত্রাটি গবেষণার মাধ্যমে খুঁজে বের করতে হবে। আমাদের সমাজের কাঠামো জটিল। এই কলাম স্তম্ভেই লিখেছিলাম, সনাতন ও আধুনিক ব্যবস্থা পাশাপাশি সাংঘর্ষিক অবস্থানে রয়েছে। এ সাংঘর্ষিক অবস্থানের কারণে উন্নত বিশ্বের মতো আধুনিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। এত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও জঙ্গিবাদ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাফল্য প্রশংসনীয়। তবে জঙ্গিবাদের স্বরূপ উন্মোচনের জন্য আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং গবেষণার ঘাটতি আমাদের পূরণ করতে হবে। জঙ্গিবাদ একটি বৈশ্বিক সংকট। এর মূলোৎপাটন করতে না পারলে আমাদের ক্ষতির চিত্রই স্ফীত হবে।