হারুন হাবীব
প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৩ ১২:৪৬ পিএম
হারুন হাবীব।
কিছু নাম থাকে, যা অবিনশ্বর। সে নাম উপেক্ষা করার শক্তি কারও হয় না। কবর ও কালের সীমানা ছাড়িয়ে সোচ্চার ও শক্তিধর হয়ে মহাকালের আঙিনায় সে নাম টিকে থাকে। এ নাম মহাপুরুষেরÑ যাঁর কীর্তি অস্বীকার করার জো নেই; যদিও আত্মপ্রবঞ্চক বা আত্মঘাতী হয়ে শাশ্বত সত্যকে অস্বীকার করতেও উদ্যোগী হয় কেউ কেউ! বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এমনি এক নাম, যাকে জোর করে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার প্রয়োজন হয় না, মুছে দেওয়াও সম্ভব হয় না।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন, ভারতের মহাত্মা গান্ধী, চীনের মাও সেতুং, তুরস্কের কামাল আতাতুর্ক, ভিয়েতনামের হো চি মিন, ইন্দোনেশিয়ার সোয়েকর্ণ, আফ্রিকার প্রথম মুক্ত দেশ ঘানার পেট্টিস লুমাম্বা, কওমি নক্রুমা, দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা, সোভিয়েত ইউনিয়নের লেনিন এবং যুগোস্লাভিয়ার মার্শাল যোসেপ ব্রজ টিটো যেমন; তেমনি বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ব্রিটিশ ভারত বিভক্তির পর যে নেতা পাকিস্তানের সামরিক ও ধর্মকেন্দ্রিক শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে ২৩টি বছর ইতিহাস সৃষ্টিকারী সংগ্রামে রত ছিলেন, তিনি শেখ মুজিবুর রহমান। এ নামের সঙ্গে মিশে আছে বাংলাদেশ, আছে প্রতিটি ধর্ম, প্রতিটি বর্ণের মানুষের কল্যাণে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার ফসলবাহী এক স্বাধীন রাষ্ট্র পত্তনের ইতিহাস। হাজার বছরের যে বাঙালি, কখনও বিচ্ছিন্ন, কখনও পরাজিত কিংবা নিরবচ্ছিন্ন লড়াকু অথবা জাতিসত্তা অন্বেষণে বিভ্রান্ত ও বিপর্যস্ত, সেই বাঙালির প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্রের স্থপতির নাম শেখ মুজিবুর রহমান। কাজেই এ নাম শত্রুর কাছে যেমন, মিত্রের কাছেও তেমনি স্বমহিমায় দীপ্যমান; না হয় কারও কারও মূর্খতায় তাঁকে অস্বীকারের কদর্যতাও চলে কখনও!
অনেক সংকটÑ সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আকাশচুম্বী সাফল্য নিয়ে শেখ মুজিব সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, যিনি তাঁর দেশপ্রেম, মেধা ও ত্যাগে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সামরিক স্বৈরাচার, ধর্মীয় মিথ্যাচার এবং রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক শোষণের বিরুদ্ধে পূর্ববাংলাকে দুর্বার অধিকার সচেতন করে তুলেছিলেন। পূর্ব বঙ্গ বা পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে প্রায় একচ্ছত্রভাবে বেগবান ও অপ্রতিরোধ্য করেছিলেন এবং মুসলমান প্রধান একটি ভূখণ্ডে স্বাধীন-সার্বভৌম অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার সাফল্য অর্জন দেখিয়েছিলেন। এ এক অনন্য সাধারণ ব্যতিক্রম। তিনি এক অসামান্য রাজনীতিপুরুষ, যাঁর নেতৃত্বের গুণে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এক ও একাত্ম হয়ে ওঠে বাঙালি, পূর্ব বঙ্গের মাটি চিড়ে বেরিয়ে এসেছিল আত্মজিজ্ঞাসার এক মহাস্ফুরণ, যা ছিল শত শত বছরের লালিত আশা ও আকাঙ্ক্ষার স্বপ্নসাধের পূরণ। তাই যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিনই প্রাসঙ্গিক থাকবেন শেখ মুজিব। কারণ তিনি জেগে উঠলেই উগ্র-ধর্মবাদী, উগ্র-তত্ত্ববাদী সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। সে কারণেই তাঁর হত্যাকাণ্ডের এতকাল পরেও বাঙালির সেক্যুলারÑ গণতান্ত্রিক সমাজশক্তির মুখ্য নেতা হয়ে আছেন তিনি আজও।
সাহিত্য, শিল্প আর দর্শনে বাঙালিকে প্রথম বিশ্বনন্দিত করেছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। নেতাজী সুভাষ বসু ছিলেন ব্রিটিশ উপনিবেশবাদবিরোধী সর্বভারতীয় গণমানুষের মহানায়ক। এরপর আসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং আরও বিস্ময়কর যে, সামরিক শাসকরা তাকে বন্দি করে সেদিনকার পশ্চিম পাকিস্তানের জেলে রাখলেও তাঁরই নেতৃত্বে, তাঁরই নির্দেশে পরিচালিত হয় বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সর্বাত্মক মুক্তিযুদ্ধ, জন্মলাভ করে বাংলাদেশ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এক জাতি হয়েও বাঙালি কখনও এক হয়ে ওঠেনি; স্বশাসিত হওয়ার বড় বেশি সুযোগ ঘটেনি এ জাতির। দ্বিধাদ্বন্দ্ব, ধর্মীয় কুসংস্কার, সংকট, ষড়যন্ত্র, লোভ-দাসত্ব ইত্যাদি বারবার গ্রাস করেছে বাঙালিকে; স্বশাসিত হওয়ার স্বপ্ন ম্লান হয়েছে বারংবারের দুর্ভাগ্যে। শেখ মুজিবই প্রথম সবল-সফল মহান রাজনীতিপুরুষ, যিনি তাঁর অনন্য সাধারণ নেতৃত্বে জাতির অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে বিকশিত করার সাফল্য অর্জন করেন। সব গোড়ামি ও বিভাজনের ঊর্ধ্বে জাতিকে এক দেহ, এক আত্মায় সমর্পিত করে স্বাধীনতার যুদ্ধে নামাতে পারার এ কৃতিত্ব কেবল তাঁরইÑ যাঁর নাম শেখ মুজিবুর রহমান। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির পড়ন্তকালের ঘাত-প্রতিঘাতের অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ মুজিব মনেপ্রাণে হয়ে ওঠেন এক অপ্রতিরোধ্য মুক্তিকামী নেতা। তাঁর চোখের সামনে দিয়ে হেঁটে গেছে দ্বিতীয় মহাসমরের হৃদয়ছোঁয়া তাণ্ডব, উনিশশ চল্লিশের ভয়ংকর মনন্তর এবং ব্রিটিশ ভারতের ধর্মীয় বিভক্তির বিয়োগান্ত অধ্যায়। চিরায়ত বঙ্গীয় সুফিদর্শনের একনিষ্ঠ সাধক টুঙ্গিপাড়ার মুজিব নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ভাবাদর্শে, মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিলেন কাজী নজরুলের শির উঁচু করা মন্ত্র পড়ে। সে কারণে তাঁর রাজনীতি কখনোই গোপন পথ বিচরণ করেনি, প্রয়োজনও পড়েনি। রাজনীতির উগ্রবাদী পথকে পরিহার করেছেন তিনি সযতনে। বুলন্দ কণ্ঠের মতোই তাঁর আদর্শ ছিল মুক্ত, সুস্পষ্ট। এমনকি সশস্ত্র গণযুদ্ধে জাতিকে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে নিতেও বেছে নিয়েছিলেন তিনি গণতান্ত্রিক বিদ্রোহের পথ; ফলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাঙালির সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধকে, তাঁর কট্টর বিরোধীরাও, বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে চিত্রিত করতে পারেনি।
অবিভক্ত পাকিস্তানের ২৩ বছরের বেশিরভাগ সময় তিনি কারাভোগ করেছেন, বাকি সময় ছিলেন গোয়েন্দা বাহিনীর প্রখর নজরদারিতে। গ্রেপ্তার হয়েছেন অসংখ্যবার, অসংখ্য মামলায় জড়িয়ে কণ্ঠ স্তব্ধ করার চেষ্টা হয়েছে তাঁর। কিন্তু শেখ মুজিব ভাঙেননি, মোচড়াননি, পরাভূত হননি। নেতাজী সুভাষ বসুর পর তিনিই হয়ে ওঠেন বাংলার অবিভাজিত নিষ্কলুষ যৌবনশক্তির প্রতীক, নিপীড়িত মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও সাহসের প্রতীক। সে কারণে সাহস, ত্যাগ ও আদর্শ নিষ্ঠায় গণমানুষের কাছে শেখ মুজিব হয়ে ওঠেন রাজনীতির অমর কবি। বাংলাদেশ নামের যে প্রিয় কবিতা, তারই যুগ স্রষ্টা কবি হওয়ার কৃতিত্ব যাঁর, তাঁর নাম শেখ মুজিবুর রহমান। অসামান্য সাংগঠনিক ক্ষমতা, ব্যক্তিত্বের সম্মোহনী শক্তি, ত্যাগ ও রাজনীতির আদর্শবাদী ধারা বহনকারী শেখ মুজিব পরিণত হয়েছেন বাঙালির জাতীয় ইতিহাসের অপ্রতিরোধ্য গণদেবতা, যে কৃতিত্ব বঙ্গের আর কোনো নেতার ভাগ্যে জোটেনি। পশ্চিমা পর্যবেক্ষকরা তাঁকে চিত্রিত করেছেন ‘পোয়েট অব পলিটিক্স’। তবে আমার বিশ্বাস, শেখ মুজিব একই সঙ্গে ছিলেন ‘পোয়েট অব হিউম্যানিটি অ্যান্ড জাস্টিস’। তিনি বারবার দাঁড়িয়েছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে, যুক্ত হয়েছেন সুবিচারের লড়াইয়ে। তিনি জাতিকে আত্মসচেতন করে তুলেছেন, ভাষা দিয়েছেন বাঙালির জাতীয়তাকে, পৌঁছে দিয়েছেন নিপীড়িত মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার জাগরণকে গ্রামগঞ্জ থেকে শহর-নগরÑবন্দরে। একজন রাজনৈতিক নেতার জীবনে এ এক বিরল, বিস্ময়কর সাফল্য বৈকি।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়, রক্তাক্ত শেষ নিঃশ্বাসে প্লাবিত করা হয় তাঁর পরিবারের প্রায় সকলকে; বয়োবৃদ্ধ, শিশু ও নববধূকে! এ হত্যাকাণ্ড বর্বরতম, সন্দেহ নেই কোনো। কিন্তু আমার বলার প্রসঙ্গ অন্য। মানুষ জন্মায়, মৃত্যু তাই অবধারিত। জাতির মুক্তির প্রত্যাশায় দুর্বার আন্দোলনে যখন নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তিনি, তখনও পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের হাতে প্রাণ দিতে পারতেন শেখ মুজিব। মুক্তিযুদ্ধকালে তাঁকে যখন পাকিস্তানের মাটিতে বন্দি রাখা হয়, তখনও তাঁর প্রাণসংহার অসম্ভব কিছু ছিল না। এমনকি সেনাবাহিনীর ঘাতকরা যখন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিল, ২৫ মার্চের কালরাতে, তারও আগে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারতেন তিনিÑ যেকোনো উপলক্ষে। অতএব মৃত্যুই বড় নয়, বড় শেখ মুজিবের হত্যার পেছনের কারণ, তার ফলাফল এবং পরবর্তীতে বেরিয়ে আসা থলের বিড়াল। এই হত্যাকাণ্ডের অদৃশ্য কুশীলব ও তাদের সমর্থকরা আজও, এত যুগ পরও, প্রতিটি পদক্ষেপে বুঝিয়ে দেয়, কেন তারা শেখ মুজিব নামটিকে ভয় পায়। স্মরণ করা জরুরি যে, বাঙালির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম এই রাজনীতিপুরুষকে একদিকে সামলাতে হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তানিদের ফেলে যাওয়া ছিটমহল; অন্যদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি ও অবকাঠামো। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল আমেরিকান পরাশক্তি ও কমিউনিস্ট চীনের প্রতিহিংসা, কারণ তারা পাকিস্তান টিকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হয়েছিল, সব কৌশল রপ্ত করেও।
যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও সেদিনের রাজতন্ত্রী মুসলিম বিশ্বসহ প্রভাবশালী বিদেশিদের প্রতিরোধের মুখে জন্মলাভ করে বাংলাদেশ পড়শি ভারত এবং সেদিনকার সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বাত্মক সমর্থনে। অতএব প্রবল বিরূপ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়েছে বঙ্গবন্ধুর সরকারকে। একদিকে এক কোটি শরণার্থীর ঘরে ফেরা, চাই তাদের পুনর্বাসন। চাই যুদ্ধে বিধ্বস্ত আর্থসামাজিক অবকাঠামোর পুনর্গঠন, চাই ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলার উন্নতি, চাই পাকিস্তানের মাটিতে আটকে পড়া সেনাবাহিনীর বাঙালি সদস্যসহ চার লাখ বাঙালির আশু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ইত্যাদি। আর এসব জরুরি কাজগুলো যখন একের পর এক করে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই সংক্ষিপ্ত করা হলো তাঁর জীবন! তবে পঁচাত্তরের রক্তাক্ত পালাবদলের কারণ, যেকোনো বস্তুনিষ্ঠ পর্যবেক্ষকই স্বীকার করবেন, বাংলাদেশের প্রথম সরকারের সংকট বা সীমাবদ্ধতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় শেখ মুজিবকে হত্যা করে ষড়যন্ত্রকারীরা বাংলাদেশের জন্মকে নতুন করে চ্যালেঞ্জ করেছিল। নতুন দেশের স্থিতিশীলতাকেই কেবল ওরা গুঁড়িয়ে দিতে চায়নি, একই সঙ্গে গুঁড়িয়ে দিতে চেয়েছিল বাঙালির ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ গৌরবগাথাÑ মুক্তিযুদ্ধকে। সন্দেহ নেই, ষড়যন্ত্রকারীরা সফলও হয়েছিল। আমার ধারণা, যতটা তারা চেয়েছিল, হয়তো তার চাইতেও বেশি! এ আরেক জাতীয় ট্র্যাজেডি।
হত্যা কখনও সমাধান নয়, অথচ একশ্রেণির মানুষ বন্য পশুর মতোই রক্তপাতের পথ ধরে সমাধান খোঁজে! এ মূর্খতা কবে ঘুচবে জানি না। তবে আমার বিশ্বাস, ১৯৭৫-এর পাপ বাঙালিকে ঘাতক জাতি করে রেখেছে বহুকাল; সে পাপ অগণিত মৃত্যু দিয়ে কেনা স্বাধীনতাকে ভূলুণ্ঠিত করেছে, ওই হত্যা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছে পরিত্যক্ত সেই পাকিস্তানি রাজনীতি, সেই সংস্কৃতি; আবারও এনেছে ধর্মের পোশাক দিয়ে, অসাংবিধানিক শাসন দিয়ে সমাজ-প্রগতিকে বিনাশ করার সেই সর্বনাশা ঝড়, যাকে পরাস্ত করা হয়েছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাঝ দিয়ে। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ মাত্রই মানবেন, ১৯৭৫-এর সেই হত্যাকাণ্ড তাদের প্রিয় জন্মভূমিকে, জাতীয় মুক্তিযুদ্ধকে, অসাম্প্রদায়িক জাতীয় চেতনাকে, লাখো শহীদের রক্তকে, সর্বোপরি বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও তার সংস্কৃতিকে কতটা বিপন্ন করেছিল। শেখ মুজিবের হত্যাটি ছিল ধর্মবাদী পাকিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত করে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রতিশোধ। এ হত্যা ছিল রাজনৈতিক ইসলামবাদীদের ঐতিহাসিক পরাজয়ের পাল্টা আঘাত। আমরা এতটাই অযোগ্য যে, আমরা পারিনি হাজার বছরের সাধনার ফসল মহান মুক্তিযুদ্ধকে, তার সম্মানকে, লাখো শহীদের রক্তকে, আশাকে, আদর্শ ও বিশ্বাসকে সুরক্ষিত করতে! আমাদের অযোগ্যতার সীমা যখন পাহাড় সমান, জাতি হিসেবে আমরা যখন আত্মঘাতী হতেও লজ্জাবোধ করিনি, তখন একাত্তরের ঘাতক-দালালদের, উগ্র-ইসলামবাদী সন্ত্রাসীদের আবারও মুখোমুখি দেখব, জাতীয় পতাকার অশ্রদ্ধা দেখব, এতে অবাক হওয়ার কী আছে!
কিন্তু ইত্যাকার ব্যর্থতার পরও আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের মৃত্যু নেইÑ এই দুই সত্তা অবিনাশী। বাঙালির আত্মরক্ষার তাগিদেই যেমন মুক্তিযুদ্ধকে আঁকড়ে ধরতে হবে; তেমনি সসম্মানে আবারও সেই আসনেই বসাতে হবে শেখ মুজিবকে, যে আসন একমাত্র তাঁরই প্রাপ্য। বাংলাদেশের মাটিতে মৌলবাদী বা উগ্র ধর্মপন্থিদের তৎপরতা যত বাড়বে, যতই ওরা বাংলাদেশ গ্রাস করতে চাইবে, ততই দ্রুত আশ্রয় নিতে হবে বাঙালিকে মুক্তিযুদ্ধের কাছে, একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর কাছে এবং তিনি আসবেন নেতৃত্ব দিতে, কারণ তিনি অমর সর্বাধিনায়ক। সেই সঙ্গে আসবে জয়বাংলা, যে উচ্চারণ গণমানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করেছিল মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব দলের নন, তিনি জাতির এবং এ কথা বিশ্বাস করতে আমি রাজি নই যে, ওই মহাপ্রাণকে শ্রদ্ধা জানাতে বিশেষ দলভুক্ত হওয়ার প্রয়োজন আছে। বাংলাদেশ নামে যার আস্থা, হৃদয়ে যার বাংলাদেশ, তারই কাছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানভালোবাসা ও অহংকারের। যে বাঙালির হৃদয়ে দাসত্ব নেই, পরাধীনতা ও ধর্মীয় উন্মাদনা নেই, সে বাঙালিকেই গ্রহণ করতে হবে শেখ মুজিবকে। এ নামের কোনো বিকল্প নেই।