× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বাঙালির মুক্তির পথপ্রদর্শক

ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৩ ১২:৩৭ পিএম

ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন।

ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন।

‘৭৫-এর ১৫ আগস্ট ভোরবেলা আনুমানিক ৫টা ২২ মিনিটে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে সেনাবাহিনীর কিছু পাকিস্তানমনস্ক সদস্য। দুটি কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বেঁচে যান বিদেশে থাকার কারণে। সেদিন সর্বমোট হত্যা করা হয়েছিল ২৬ জনকে। সেদিন শুধু বঙ্গবন্ধুসহ অন্যান্যকে হত্যা করা হয়নি, হত্যা করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে। লক্ষ্য ছিল মিনি পাকিস্তান বানাবার। ’৭৫ থেকে ’৯৬ পর্যন্ত ইতিহাস তাই বলে। এ সময়ের দুটো প্রবণতা দৃশ্যমান ছিলÑ বাংলাদেশের পাকিস্তানিকরণ ও রাজাকারায়ণ। প্রত্যক্ষ খুনিদের বিচার হয়েছে; রায় আংশিক কার্যকর হয়েছে। কারণ ৬ জন খুনি এখনও পলাতক। বিচারও তো আংশিক হয়েছে। কারণ ষড়যন্ত্রকারী দেশি-বিদেশি খলনায়করা এখনও সাধারণ মানুষের অজানা। প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন, এর প্রতিবেদন শ্বেতপত্র আকারে প্রকাশ করা এবং পূর্ণাঙ্গ বিচার প্রক্রিয়া চালু করা।

তবে উল্লেখ্য, ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের আগে তিনবার বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ’৭৪-এর ২২ জানুয়ারি বিকালে কাকরাইলে বঙ্গবন্ধুর গাড়ি লক্ষ করে বোমা ছোড়া হয়। বঙ্গবন্ধু বেঁচে গেলেও তিন পথচারি মারা যান। এ ঘটনার সঙ্গে চৈনিক সম্পৃক্ততা ছিল এমন ইঙ্গিত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে করা হয়। দ্বিতীয় আঘাত হয় ’৭৫-এর ২১ মে। গাড়িতে গ্রেনেড হামলা করা হয়। হামলায় বঙ্গবন্ধু প্রাণে বেঁচে গেলেও আহত হন তাঁর দুই সঙ্গী। ’৭৫-এর ১৪ জুন বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রামের বেতবুনিয়া উপগ্রহ ভূ-কেন্দ্র উদ্বোধন করতে যান। যে মঞ্চে দাঁড়িয়ে সুইচ টিপে উদ্বোধনের কথা ছিল তার নিচেই পেতে রাখা হয়েছিল টাইম বোমা। বঙ্গবন্ধু বেতবুনিয়া পৌঁছানোর আগেই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা সেটিকে শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হন। তথ্যটি ‘র’ (RAW)-এর সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশ করেছিল কলকাতার যুগান্তর পত্রিকা।

তুলনীয় একটি ঐতিহাসিক ঘটনার প্রতি দৃষ্টি ফেরানো যেতে পারে। ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহের পর সেপ্টেম্বর মাসে ইংরেজ সৈনিক লে. হডসন বাহাদুর শাহর চার রাজপুত্রকে একসঙ্গে হত্যা করে। কারণ তার ধারণা ছিল এরা ইংরেজ হন্তারক; যা পরে প্রমাণিত হয়নি। এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে ইংরেজ ইতিহাসবিদ ম্যালেসন লিখেছিলেন, “a more brutal, a more unnecessary outrage was never committed. It was a blunder as well as a crime.” চার জনকে হত্যা করার জন্য এমন মন্তব্য; তাহলে ২৬ জনকে হত্যা করার জন্য কেমন মন্তব্য হওয়া উচিত তা অনুমেয়। তবে তাৎক্ষণিক বিলাপ করেছিলেন একজন অন্নদাশংকর রায়; অভিশাপও দিয়েছিলেন হত্যাকারীদের এই বলেÑ

নরহত্যা মহাপাপ তার চেয়ে পাপ আরো বড়

করে যদি যারা তার পুত্রসম বিশ্বাসভাজন 

জাতির জনক যিনি অতর্কিতে তার নিধন।

নিধন সবংশে হলে সেই পাপ আরো গুরুতর

সারাদেশ ভাগী হয় পিতৃঘাতী সে ঘোর পাপের 

যদি দেয় সাধুবাদ, যদি করো অপরাধ ক্ষমা।

কর্মফল দিনে দিনে বর্ষে বর্ষে হয় এর জমা 

একদা বিবর্ণ বজ্ররূপে সে অভিশাপের।

রক্ত ডেকে আনে রক্ত হানাহানি হয়ে যায় রীত।

পাশবিক শক্তি দিয়ে রোধ করা মিথ্যা মরীচিকা।

পাপ দিয়ে শুরু যার নিজেই সে নিজ বিভীষিকা।

ছিন্নমস্তা দেবী যেন পান করে আপন শোণিত।

বাংলাদেশ! বাংলাদেশ! থেকো না নীরব দর্শক, 

ধিক্কারে মুখর হও। হাত ধুয়ে এড়াও নরক।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দ্রষ্টা ও স্রষ্টা। এস. ওয়াজেদ আলী ১৯৪৩-এ প্রকাশিত ‘ভবিষ্যতের বাঙালী’ গ্রন্থে এই বাংলায় একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের কল্পনা করেছিলেন, যেখানে ধর্ম রাষ্ট্র থেকে পৃথক থাকবে। কারণ ধর্ম রাজনীতি ও রাষ্ট্রের সঙ্গে জড়িয়ে গেলে তা হয় ব্যবসার হাতিয়ার; আর তা হলে ধর্মের মৃত্যু অবধারিত। এস. ওয়াজেদ আলীর একান্ত আশা ছিল, ভবিষ্যতে কোনো এক বাঙালি মহানায়ক এমন একটি রাষ্ট্র গড়তে নেতৃত্ব দেবেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এস. ওয়াজেদ আলীর এই কল্পনা রূপায়িত হয়েছিল বটে। স্মর্তব্য, সঙ্গত কারণে বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা হিসেবে বাঙালি বরণ করে ’৭১-এর ৩ মার্চ (৫১ বছর বয়সে)। 

বঙ্গবন্ধুর একটি প্রিয় গান ছিলÑ ‘আমার সাধ না মিটিল, আশা না পূরিল।’ স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনের মধ্য দিয়ে তাঁর সাধ মিটেছিল; সেই স্বীকারোক্তি তাঁর ১০ জানুয়ারির ভাষণের শুরুতেই আছে। কিন্তু আশা পূরণ হয়নি। ঘাতকের বুলেট তাঁর জীবন কেড়ে নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার আশা অপূর্ণ করে দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম দুটোই অসমাপ্ত। কিন্তু এ অসমাপ্ত রাজনীতির জীবনে আদর্শিক ভিত্তি ছিল মানুষ ও বাঙালি। বঙ্গবন্ধুর নিজস্ব মন্তব্য থেকে তা বুঝে নেওয়া সম্ভবÑ “একজন মানুষ হিসেবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসেবে যা কিছু বাঙালিদের সাথে সম্পর্কিত তা-ই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। এই নিরন্তর সম্পৃক্তির উৎস ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা, যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি এবং অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে।” ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির পর্যবেক্ষণ হলো, এমন মন্তব্য থেকে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে ‘সামগ্রিক ধারণা’ পাওয়া যায়। আসলেও তাই। আর বাঙালি সম্পর্কে প্রাণের আকুতির কথা বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন অন্নদাশঙ্কর রায়কেÑ “আমি চাই সব বাঙালির এক দেশ। বাঙালিরা এক হলে কী না করতে পারত। তারা জগৎ জয় করতে পারত।” তুলনীয় বিদ্রোহী কবি নজরুলের মন্দ্রিত উচ্চারণÑ “বাঙালি যেদিন ঐক্যবদ্ধ হয়ে বলতে পারবে ‘বাঙালির বাংল ‘ সেদিন তারা অসাধ্য সাধন করবে।” (নবযুগ, ১৯৪২)। সব বাঙালির এক দেশ হবার কথা ছিল যুক্তবাংলার প্রস্তাবে (২৭ এপ্রিল ১৯৪৭), যা ভেস্তে গেলে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে বাঙালির এক দেশের দ্রষ্টা ও স্রষ্টা হয়েছিলেন। তবে বাংলাদেশ নিয়ে বঙ্গবন্ধুর অতৃপ্তি/অসন্তুষ্টি ছিল। অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাসকে তিনি বলেছিলেন, “আমি যা করি তা কেউ বোঝে না।” ১৯৭৩-এ তিনি আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীকে দুই পঙ্‌ক্তির একটি স্বরচিত কবিতা দিয়েছিলেন, যাতে লেখা ছিলÑ “আমার বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে/বাংলার ভদ্রলোকেরা চুরি করে আর গোপনে বোঁচকা বাঁধে।” বঙ্গবন্ধু বলেননি এটা কবিতা হয়েছে, তবে তিনি বলেছিলেন, “গবিতা তো হয়েছে।” আর তিনি কবিতা দেওয়ার সময়ে তাঁর অন্তর্জ্বালার কথা বলেছিলেন এভাবে, “কবিতাটি আমি তোমাদের কাছে রেখে যাব। তাহলে আমার মৃত্যুর পরেও বাংলার দুঃখী মানুষ জানবে, আমি তাদের ভাত-কাপড়ের ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ভদ্রলোকদের চুরি আর দুর্নীতির জন্য কিছুই করতে পারছিলাম না।” বঙ্গবন্ধুর মনের কষ্ট আমরা বুঝি; কিন্তু আমাদের চেয়েও বেশি বুঝছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শ্বেতাঙ্গ মানুষ ছিলেন জন ব্রাউন। এই বিবেকী মানুষটি নিগ্রো ক্রীতদাসদের মুক্তির জন্য পুত্র ও জামাতাসহ প্রাণপাত করেছিলেন। তার স্মরণে একটি নিগ্রো লোকগীতির প্রথম দুটি পঙ্‌ক্তিÑ

“John Brown’s body lies mouldering in his grave,

But his soul goes on marching.”

বঙ্গবন্ধুর নির্মম লোকান্তরণের পর অন্নদাশঙ্কর রায় এ লোকগীতি অনুসরণে লিখলেনÑ 

Sheikh Mujib’s body lies mouldering in his grave,

But his soul goes marching on.

বঙ্গবন্ধুর দেহ নশ্বর, কিন্তু আত্মা অমর। দেহের ক্ষয়-বিনাশ আছে, কিন্তু আত্মা অক্ষয়-অবিনশ্বর।

অক্ষয়-অবিনশ্বর আত্মার বঙ্গবন্ধু চিরঞ্জীব। কারণ তিনি বাঙালিকে মুক্তির পথ দেখিয়েছিলেন। সংস্কৃত প্রবচন আছেÑ রত্ন কর্ষতি পুরঃ পরমেক/স্তদগতানুগতিকো ন মহার্ঘ্য। অর্থাৎÑ একজনই আগে পথ তৈরি করে দেন। পরে সে পথ দিয়ে যাতায়াত করার লোক দুর্লভ হয় না। জন সি. ম্যাক্সওয়েল নেতৃত্ব সম্পর্কে অভিন্ন মন্তব্য করেছেনÑ “A leader is one who knows the way, goes the way and shows the way.” বঙ্গবন্ধু বাঙালির মুক্তির পথ জানতেন; তিনি তাদেরকে মুক্তির পথে তুলে দিয়ে গেছেন।

  • লেখক :  অধ্যাপক, বঙ্গবন্ধু চেয়ার, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনাল্‌স (বিইউপি)
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা