× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইতিহাসজুড়ে যাঁর ব্যাপ্তি

ড. অনুপম সেন

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৩ ১২:৩১ পিএম

ড. অনুপম সেন।

ড. অনুপম সেন।

১৫ আগস্ট ১৯৭৫। বাংলা ভাষাভাষী বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসের জঘন্য ও নিষ্ঠুরতম দিন। এই দিনে পাকিস্তানপন্থি কিছু স্বজাত্যদ্রোহী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। শুধু জাতির পিতাকেই নয়, তাঁর পুরো পরিবারকে হত্যা করে।

বঙ্গবন্ধুর অন্তঃসত্ত্বা পুত্রবধূকে হত্যা করতে তারা দ্বিধাবোধ করেনি। হত্যাকারীরা এমনই পাষবচিত্ত ও হৃদয়হীন যে, দশ বছরের শিশু শেখ রাসেলকে হত্যা করার সময়ও তাদের বুক কাঁপেনি। বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী হাজার বছরের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুকে ‘হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাঙালির নৃতাত্ত্বিক অস্তিত্ব হাজার বছরের। যদিও আমরা বাংলা ভাষাভাষীর ধারাবাহিকতা দেখতে পাই না। প্রাচীনকাল থেকে আধুনিক সময় পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে এই অঞ্চলে স্বাধীন রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পাল শাসনামল, সেন যুগ, মুসলমানদের শাসন, মোগল সাম্রাজ্য এবং পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলা নিহত হওয়ার সংগ্রামী ইতিহাস আমাদের। নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের ফলে বাঙালিকে ১৯০ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন মেনে নিতে হয়। ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটার পর তারা অখণ্ড ভারত উপমহাদেশে দুটো স্বাধীন রাষ্ট্র ভাগ করে যায়। ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটো স্বাধীন দেশ গড়ে তোলা হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রে পূর্ব পাকিস্তান বলে পরিচিত অংশটিই আজকের বাংলাদেশ। পাকিস্তানের ৫৬ শতাংশ মানুষ এই পূর্ব পাকিস্তানে বাস করত। অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ পূর্ব পাকিস্তানেই বাস করত এবং তারা বাংলা ভাষায় কথা বলত। 

পাকিস্তান সৃষ্টির অব্যবহিত পরেই, বস্তুত পাকিস্তান সৃষ্টির আগেই আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু।’ তখন পূর্ব পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবীরা এই মন্তব্যের ব্যাপক সমালোচনা করেন। পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার আগমন উপলক্ষে বিশেষ সমাবর্তনের আয়োজন করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তো বটেই, অন্য আরেকটি জনসভায় তিনি দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।’ অথচ পাকিস্তানের ৫৬ শতাংশ মানুষই বাংলা ভাষায় কথা বলত। তখন বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ১৯৪৮ সালে ছাত্রাবস্থায় তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, বাঙালি প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতা পায়নি। পাকিস্তানের সবকিছুই পশ্চিম পাকিস্তানে করা হয়। যেমন পাকিস্তানের প্রথম রাজধানী করাচি। পরবর্তীতে রাজধানী স্থানান্তর করে রাওয়ালপিন্ডিতে নেওয়া হয়। আরও পরে ইসলামাবাদকে রাজধানী করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার পরও সবকিছু পশ্চিম পাকিস্তানকে ঘিরে করা হয়। পার্লামেন্টারি আসন ছেড়ে দিয়ে বাঙালিরা বিভিন্ন সময়ে উদারতা ও রাজনৈতিক সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেনÑ পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের নানাভাবে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করেও বাঙালির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয়নি। 

পাকিস্তান সৃষ্টির পর সামরিক খাতকে ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাকিস্তানের বাজেটের ৫০ শতাংশই ব্যয় হতো সামরিক খাতে। সামরিক বরাদ্দের ৪৮ শতাংশই ব্যয় করা হতো পশ্চিম পাকিস্তানে। পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর তিনটি হেডকোয়ার্টারÑ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনীর ঘাঁটি গড়ে তোলা হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে ৯৯ শতাংশ ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানি। পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে প্রায় ২২ হাজার অফিসার ছিলেন। তাদের মধ্যে মাত্র ১৯৪ জন সামরিক অফিসার ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের। একাত্তরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণার সময় সামরিক বাহিনীতে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সংখ্যা অনেক কম ছিল। ব্রিগেডিয়ার মজুমদার এবং কর্নেল এমএজি ওসমানীসহ গুটিকয়েক সামরিক অফিসারের নাম খুঁজে পাওয়া যাবে। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তান সম্পূর্ণভাবে অরক্ষিত ছিল। ফলে ভারত সহজেই এই অঞ্চলের কর্তৃত্ব নিতে পারত। ১৯৬৬ সালে আইয়ুব খান ভারতের প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর সঙ্গে একটি শান্তিচুক্তি করেন।

‘ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতি শান্তিচুক্তি’ নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের নেতৃবর্গ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন। এজন্য ওই বছরই তারা একটি সভার আয়োজন করেছিলেন। যুদ্ধবিরতি বিষয়ে বঙ্গবন্ধু কোনো কথা বলেননি। তিনি ছয় দফা ঘোষণা করেন। পশ্চিম পাকিস্তানিরা বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা প্রস্তাবে রাজি হয়নি। সভা শেষে তিনি সংবাদমাধ্যমের সামনেও ছয় দফা দাবি ঘোষণা করেন। ঢাকায় ফিরে ছয় দফা দাবির লক্ষ্য আদায়ে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে তিনি একটি সভা করেন। দুটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের অবয়ব ফুটে ওঠায় আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতৃবৃন্দের অনেকেই এই ছয় দফা দাবি গ্রহণ করতে দ্বিধাবোধ করছিলেন। ছয় দফা দাবির বিরুদ্ধেও অনেকে লিখেছিলেন। বঙ্গবন্ধু একাই ছয় দফা দাবির লক্ষ্য আদায়ের দায়িত্ব নিয়ে লালদীঘি ময়দানে সভা করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন স্থানে বঙ্গবন্ধু ছয় দফা দাবি ব্যাখ্যা করে জনমত গঠনের কাজ শুরু করেন। যেখানেই তিনি ছয় দফা দাবি প্রস্তাব নিয়ে সভা-সমাবেশ করেছেন, সেখানেই তাঁকে গ্রেপ্তার হতে হয়েছিল। 

ছয় দফা দাবিতে পাকিস্তানের দুই অংশের জন্য আলাদা মুদ্রা প্রচলনের দাবি করা হয়েছিল। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুটি আলাদা হিসাবের প্রস্তাবও বঙ্গবন্ধু দিয়েছিলেন। এই ছয় দফার মধ্যেই পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আলাদা মিলিশিয়ার দাবি করা হয়েছিল। ছয় দফার মধ্যেই পাকিস্তানকে একটি ফেডারেশন গড়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পাকিস্তানের দুটো প্রদেশ সম্পূর্ণভাবে স্বায়ত্তশাসন দ্বারা পরিচালিত হবে, এমনটিই ছিল তাঁর আকাঙ্ক্ষা। উভয় প্রদেশের স্বাধীনভাবে বাণিজ্য করার অধিকার নিয়েও কথা বলা হয়েছিল। প্রস্তাবগুলো দুটি আলাদা রাষ্ট্রের অবয়ব ফুটিয়ে তুলছিল। শুধু স্বরাষ্ট্র এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থাকবে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে। ছয় দফার দাবিগুলো মেনে নেওয়া পশ্চিম পাকিস্তানিদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। আইয়ুব খান এটিকে বলেছিলেন বিশ্বাসঘাতকতা। তিনি এও বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু যদি তাঁর ছয় দফা দাবি প্রত্যাহার করে না নেন তাহলে তাঁকে অস্ত্রের ভাষা দিয়ে শিক্ষা দেওয়া হবে।’ শাসকদের রোষানল তাঁর ওপর পড়েছিল। সভা-সমাবেশ করার পর বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হতো। সিলেটে সমাবেশ করার পর তাঁকে আর ওই বছর সভা-সমাবেশ করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। কিছুদিন পর অর্থাৎ ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা করা হয়। শেখ মুজিব যদি যুক্তির ভাষা না বোঝেন তাহলে তাঁকে অস্ত্রের ভাষা দিয়ে বোঝানো হবেÑ আইয়ুব খানের এই মন্তব্যের ফলস্বরূপ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা করা হয়। ওই মামলার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু তো বটেই,  তখনকার কতিপয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সামরিক অফিসার এবং সাধারণ মানুষকে ফাঁসি দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছিল। স্পষ্ট স্মরণে আছে, সংবাদমাধ্যমে যখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিবরণ প্রকাশিত হয় তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চোখেমুখে এক ধরনের ভীতি ফুটে ওঠে। বঙ্গবন্ধুকে শেষ পর্যন্ত ফাঁসি দেওয়া হবে, এমন আশঙ্কা থেকেই তারা ভীত হয়ে উঠছিলেন। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্রদের তীব্র আন্দোলন বঙ্গবন্ধুকে সব অভিযোগের শৃঙ্খল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আসে। ওই বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি তিনি মুক্তি পান। ২৩ ফেব্রুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেওয়া হয়। 

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেক কিছু বলার আছে। পূর্ব পাকিস্তানে উৎপাদিত কৃষিপণ্য পাট অবলম্বন করেই পশ্চিম পাকিস্তান গড়ে উঠেছিল। শোষণের মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তান ক্রমেই সমৃদ্ধ হলেও পূর্ব পাকিস্তান কৃষিভিত্তিক পশ্চাৎপদ জনপদই থেকে যায়। পশ্চিম পাকিস্তানে শিল্প ও সেবা খাতের বিপুল প্রবৃদ্ধি ঘটানো হয়। কৃষি খাতেরও প্রবল প্রবৃদ্ধি ঘটানো হয়। অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তান শোষিত, অবহেলিত ছিল। অথচ পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদকে কেন্দ্র করে পশ্চিম পাকিস্তান সমৃদ্ধ হচ্ছিল। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল। এই বাণিজ্য ঘাটতি পূরণ করা হতো পূর্ব পাকিস্তানের উদ্বৃত্ত অর্থের মাধ্যমে। বাণিজ্য উদ্বৃত্ত আদায় হতো পাটের মাধ্যমে। এখন আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক শিল্প। কিন্তু পাকিস্তান শাসনামলে পাট শিল্পই ছিল পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস। পাট শিল্পকে কেন্দ্র করে আদমজী জুট মিল, আমিন জুট মিলসহ নানা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। পাট শিল্পের মুনাফা পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যেত। 

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির সময় পূর্ব পাকিস্তানের জিডিপি পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বেশি ছিল। ১৯৬৯-৭০ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের জিডিপি পূর্ব পাকিস্তানের জিডিপির তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি ছিল। এমনকি পশ্চিম পাকিস্তানের মাথাপিছু আয়ও পূর্ব পাকিস্তানের তুলনায় ৭০ শতাংশ বেশি ছিল। আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় পাকিস্তান থেকে ৪৫ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টি না হলে এমনটি কোনোদিনই সম্ভব হতো না। বঙ্গবন্ধু আমাদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র দিয়েছেন। এর আগে বাঙালি বিভিন্ন সময়ে স্বাধীন শাসকের অধীনে ছিল। কিন্তু বাঙালির স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি কোনোদিন। রাজা ও নবাবদের শাসনাধীন থাকায় তাদের কোনো স্বাধীন সত্তা ছিল না। গ্রামীণ অঞ্চলে যদিও কিছুটা স্বাধীনতা উপভোগ করার সুযোগ ছিল। কিন্তু প্রকৃত অর্থে বাঙালি স্বাধীনতা অর্জন করেনি। তাদের যাপিত জীবনের নিয়ন্ত্রণ ছিল রাজা কিংবা নবাবদের হাতে। নিজ মতামত বা সত্তার কোনো স্বাধীনতা তাদের ছিল না। বাঙালিকে সর্বপ্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র উপহার দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তথাকথিত স্বাধীন বঙ্গে বাঙালির স্বাধীনতা ছিল না। ১৯৭১ সালে সর্বপ্রথম বাঙালি স্বাধীনতা পায়। ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হয় এবং একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বাঙালি প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতা অর্জন করে। 

বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর বাঙালি নিজের সংবিধান পেয়েছিল। পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান তৈরি হয় ১৯৫৬ সালে। স্বাধীনতার পর তাদের প্রায় নয় বছর লেগেছে সংবিধান রচনার জন্য। অথচ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরবর্তী দশ মাসে বাঙালি নিজের সংবিধান উপহার পায়। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে বাঙালির জন্য প্রথম সংবিধান উপস্থাপন করেন বঙ্গবন্ধু। তিনি দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, এটিই বাঙালির প্রথম সংবিধান। এই সংবিধানে উল্লেখ রয়েছে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ক্ষমতার উৎস থাকবে জনগণের হাতে। বঙ্গবন্ধু বাঙালির রাষ্ট্রটিকে গড়ে তুলছিলেন। স্বাধীনতার পর একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাঁকে কাঁধে নিতে হয়েছিল। বাংলাদেশ যেন তার স্বাধীন সত্তা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয় সেজন্য পশ্চিম পাকিস্তানিরা এখানে অবর্ণনীয় ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল। প্রায় এক কোটি মানুষ শরণার্থী হয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। দেশের অভ্যন্তরেও মানুষ নিরাপত্তার জন্য ছুটে বেরিয়েছে। স্বাধীনতার পর ভারতে আশ্রয় নেওয়া এক কোটি মানুষকে পুনর্বাসিত করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি বাঙালিকে শুধু সংবিধান উপহার দিয়েছেন এমন নয়, তিনি স্বাধীনতার পর একটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মাধ্যমে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করার পরিকল্পনাও করেছিলেন। দেশের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে বঙ্গবন্ধুর অবদান নেই। যুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধু সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু যারা ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল বা লুটতরাজ করেছিল তাদের বিচারের ব্যবস্থা তিনি ঠিকই করেছেন। ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে আলোচনাও বঙ্গবন্ধু শুরু করেছিলেন। 

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার আগে তিনি দেশে অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। ১৯৭৩-৭৪ সালে দেশে শিল্পবিপ্লব ঘটে। তখন বাংলাদেশে পাট শিল্প ছাড়া উল্লেখযোগ্য শিল্প খাত ছিল না। দেশে নানাবিধ শিল্পের স্থাপনা শুরু করার কাজটি বঙ্গবন্ধু করেছিলেন। পাকিস্তান শাসনামলে পশ্চিম পাকিস্তানেই সব শিল্প গড়ে তোলা হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতা দূর করার জন্য বঙ্গবন্ধু অসংখ্য উদ্যোগ নিয়েছিলেন। শিল্পের নানা ক্ষেত্রে দেশ এগিয়ে যাচ্ছিল। বাঙালির অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার সূচনালগ্নেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগেই বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। বঙ্গবন্ধুকে ফিদেল কাস্ট্রো হিমালয়সদৃশ ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখেছিলেন। সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর দেশের রাজনীতিতে যে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয় তা ১৯৯১ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। ওই সময়ের ইতিহাস বাঙালির পিছিয়ে যাওয়ার ইতিহাস। এই দীর্ঘ সময়ে বাঙালি কতটা পিছিয়েছে তা হিসাব করা কঠিন। যে চারটি স্তম্ভের ওপর বাঙালি জাতিসত্তা ও রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল তাকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করা হয়। 

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার ঘটনা বলতে গেলে এত প্রসঙ্গ চলে আসে যে কোনটি বাদ দিয়ে কোনটি উল্লেখ করব সেই সিদ্ধান্ত নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। সংক্ষিপ্ত সময়ে এই ইতিহাস ও ক্ষতি বর্ণনা করা যাবে না। বঙ্গবন্ধু যদি আরও দশ বছর রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেতেন তাহলে বাংলাদেশ আরও আগেই উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় স্থান করে নিত। যদিও গত দেড় দশকে অর্থনীতির নানা সূচকে বাংলাদেশ এগিয়েছে। আমি মনে করি, বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে আমরা আরও আগে এই অর্জন পেতাম। পরিতাপের বিষয়, শুধু বঙ্গবন্ধুই নয়, তাঁর পরিবারের নিরীহ সদস্যদেরও যেভাবে হত্যা করা হয় বিশ্বের ইতিহাসে এমন নির্মমতার ইতিহাস বিরল। এই খুনীদের ইনডেমনিটি দেওয়া হয়েছিল। এও তো এক ধরনের অপরাধ। হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে হত্যাকারীরা বিচারের সম্মুখীন না হওয়ার বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি গড়ে ওঠে। এই বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি দীর্ঘদিন বাঙালিকে তাড়া করে ফিরবে। আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ মানবাধিকার বিষয়ে নানাবিধ কথা বলে। অথচ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর তারা যেন মানবাধিকারের বিষয়টি বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল। তাদের নীরবতায় আমাদের বিস্মিত হওয়া ছাড়া কিছুই করার নেই। তবে তাদের স্মরণ করিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আমরা এড়াতে পারি না। বিদেশিরা সব সময় তাদের স্বার্থকেই বড় করে দেখে। তাদের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেই তারা উদ্যোগ নেয়। বিচারহীনতার অপসংস্কৃতির বিলোপ করতেই হবে। পঁচাত্তরের মর্মন্তুদ অধ্যায়ের দণ্ডিত পলাতক খুনীদের ফিরিয়ে দণ্ড কার্যকর করে অসমাপ্ত অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটাতে হবে।

  • সমাজবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা