আবদুল মান্নান, শিক্ষাবিদ-গবেষক
প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৩ ১২:১৬ পিএম
আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২৩ ১২:৫৮ পিএম
আবদুল মান্নান।
শোকের মাস আগস্ট। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে একদল সেনা সদস্য ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে অবস্থিত তাঁর নিজ বাসভবনে তাঁকে ও পরিবারের অন্য সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। শুরুতেই ১৫ আগস্টের শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। সেদিন বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশের বাইরে ছিলেন বলে প্রাণে বেঁচে যান। তাদের একজন শেখ হাসিনা এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। ছিলেন গৃহবধূ, ভাগ্য তাকে রাজনীতিতে নিয়ে এসেছে। সেই গৃহবধূ এখন একজন বিশ্বনন্দিত রাষ্ট্রনায়ক। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিশ্বে একটি উদীয়মান অর্থনীতি, উন্নয়নের রোল মডেল। পিতা ও পরিবার হারানোর পর ২১ বছর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতার বাইরে ছিল। শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের আগে দল ছিল নেতৃত্বশূন্য।
রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানÑ সব রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিল নানা রকমের ষড়যন্ত্র। অতীতে এসব হত্যাকাণ্ডে সাধারণত জড়িত থাকত স্থানীয় ষড়যন্ত্রকারীরা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এদের সঙ্গে যোগ হয় বাইরের কিছু শক্তি; যাদের অন্যতম কাজই হচ্ছে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে কোনো একটি বাছাই করা দেশকে অস্থিতিশীল করে সেখানে এক বা একাধিক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে সম্পদ দখল করা। এ কাজে তাদের সহায়তা করার জন্য সে দেশে তারা একটি তাঁবেদার সরকারকে ক্ষমতায় আনে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এ কাজে বিশেষ পারদর্শিতা দেখিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। অথচ এ দেশটিরও স্বাধীনতা এসেছিল একটি মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। আড়াইশ বছর আগে তারা ইংরেজের শোষণ ও শাসন থেকে মুক্ত হতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল হাতে। এ দেশেই জর্জ ওয়াশিংটন, থমাস জেফারসন, আব্রাহাম লিঙ্কন বা ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টের মতো কালজয়ী রাজনৈতিক নেতার জন্ম হয়েছিল।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার আগে পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয় একটি ক্ষেত্র। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দৌলাকে মসনদ থেকে উৎখাতের জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্ণধার ক্লাইভ ও তাকে ঘিরে থাকা দেশি ষড়যন্ত্রকারীরা নবাবের চরিত্রহননের এক সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করে। জনগণকে বোঝানো হয় সিরাজদ্দৌলা একজন লম্পট, নারীলোভী, সর্বক্ষণ সুরা আর সাকি নিয়ে মশগুল থাকেন। তাঁকে সরানো হলে বাংলার মানুষ সুখে শান্তিতে থাকতে পারবে। পরবর্তী ঘটনা এখন ইতিহাস।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের অনেক অসত্য ও বানোয়াট কারণের সঙ্গে অনেকে রক্ষীবাহিনীকে সম্পৃক্ত করেন এবং বলেন, বঙ্গবন্ধু সেনাবাহিনীর চেয়ে রক্ষীবাহিনীকে বেশি গুরুত্ব দিতেন এবং তাদের জন্য প্রতিরক্ষা বাজেটের সিংহভাগ বরাদ্দ করতেন। কেউ কেউ এমন কথাও বলেন, বঙ্গবন্ধু একসময় সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করে দেবেন। বাস্তবে রক্ষীবাহিনী গঠিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধফেরত ওই মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে যাদের নিয়মিত সেনাবাহিনীতে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। আর রক্ষীবাহিনীর জন্য সর্বোচ্চ বরাদ্দ ছিল প্রতিরক্ষা বাজেটের মাত্র ৯ শতাংশ।
তবে ষড়যন্ত্র যে তখনই শুরু হয়েছিল, তা তিনি বুঝেছিলেন। ১৯৭২ সালের ১৫ জানুয়ারির ভাষণে তার উল্লেখ পাওয়া যায়। দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে শুরুতেই তিনি বলেন, ‘কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহল বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের চেষ্টা চালাচ্ছে।’ ভাষণে তিনি আরও বলেন, ‘আমি কখনও প্রধানমন্ত্রী হতে চাইনি। আমি শুধু আমার জনগণের জন্য স্বাধীনতাকেই চেয়েছিলাম। শত্রুর মোকাবিলার জন্য আমি যে আহ্বান জানিয়েছিলাম বাংলাদেশের জনগণ তাতে পুরোপুরি সাড়া দিয়েছে। আমি জানতাম আমার জনগণ এমনটিই করবে।’ বঙ্গবন্ধুর বড় দুর্বলতা ছিল তিনি সহজে বাঙালিকে বিশ্বাস করতেন এবং কোনো বাঙালি তাঁকে হত্যা করবে, তা ছিল তাঁর কাছে অবিশ্বাস্য। খুনিদের অন্যতম মেজর ডালিমের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু পরিবারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং জানা মতে ডালিম সস্ত্রীক বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার দুই দিন আগে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে বেগম মুজিবের রান্না করা রাতের খাবারও খেয়েছিলেন। সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ জেনারেল জিয়াকে যারা কাছ থেকে দেখেছেন, তারা জানতেন, তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী সেনা অফিসার। জিয়া তার জুনিয়র অফিসার শফিউল্লাহকে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব দেওয়ায় বেশ ক্ষুব্ধ ছিলেন। বঙ্গবন্ধু বিষয়টিকে তাৎক্ষণিক কোনো গুরুত্ব দেননি। প্রসঙ্গত, বঙ্গবন্ধু জিয়ার জন্যই সেনাবাহিনীতে ডেপুটি চিফ অব স্টাফ পদটি সৃষ্টি করেছিলেন। ওই পদে তিনিই ছিলেন প্রথম ও শেষ কর্মকর্তা। জিয়াকে ডেপুটি চিফ করলেও তিনি তাতে সন্তুষ্ট ছিলেন না; কারণ সেনাবাহিনীর ওপর তার তেমন কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। কিছুদিনের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু জিয়ার এই নাখোশ হওয়ার বিষয়টি উপলব্ধি করেন। তিনি নিহত হওয়ার কয়েক মাস আগে জিয়ার চাকরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। ঠিক হয়েছিল তাকে হয় পূর্ব জার্মানি অথবা বেলজিয়ামে রাষ্ট্রদূত করে পাঠানো হবে। এতেও জিয়া তার নিকটজনদের কাছে বেশ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। (দ্য ডেইলি স্টার, ১৫ আগস্ট ২০১৪)। জিয়া যে একজন ক্ষমতালিপ্সু ব্যক্তি ছিলেন, তা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর যখন একপর্যায়ে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি হন, তখন তা তিনি উপলব্ধি করেছেন, যা তিনি তার At Bangabhaban-Last Phase গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। বিচারপতি সায়েম লিখেছেন, জিয়া শেষের দিকে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিলেন যে তিনি তার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য হয়েছিলেন। জিয়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তার চাকরি ন্যস্ত করার বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতার হাতে-পায়ে ধরা শুরু করেন। জিয়া বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব তোফায়েল আহমেদের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সুযোগ পান। জিয়ার আকুতিমিনতির কারণে বঙ্গবন্ধু জিয়াকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তার চাকরি আবার সেনাবাহিনীতে বহাল করার নির্দেশ দেন। সেই জিয়ার সঙ্গে ১৫ আগস্টের ঘাতকদের অন্যতম কর্নেল (অব.) রশীদ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পরিকল্পনা নিয়ে সবিস্তার আলোচনা করেন মার্চে। জিয়া ঘাতকদের প্রতি তার প্রত্যক্ষ সমর্থন জানান। শেষতক জিয়াই বঙ্গবন্ধু হত্যার সবচেয়ে বড় বেনিফিশিয়ারি হয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যারা জড়িত ছিলেন তার অধিকাংশই সরাসরি পাকিস্তানি সেনা গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের সঙ্গে অথবা অন্য কোনো গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৫ আগস্টের আগে সে সময় ডিজিএফআইয়ে কর্মরত মুক্তিযোদ্ধা অফিসার মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সেনাবাহিনীতে যে একটি ষড়যন্ত্র হচ্ছে, তা নোট আকারে বঙ্গবন্ধুর কাছে গোপন নথি হিসেবে তারা পাঠিয়েছিলেন। সেই নোট বঙ্গবন্ধুর হাতে এক রহস্যজনক কারণে পৌঁছায়নি। এর অন্যতম কারণ, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার আগের দিনগুলোয় তিনি পাকিস্তানফেরত ষড়যন্ত্রকারীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে গিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর মিলিটারি সেক্রেটারি ব্রিগেডিয়ার মাশরুল হক ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জামিল ছিলেন পাকিস্তানফেরত সামরিক কর্মকর্তা। তারা কেউই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেননি। রাষ্ট্রপতি (বঙ্গবন্ধু) ভিজিলেন্স টিমের প্রধান ডিআইজি এবিএস সফদার একাত্তরে পাকিস্তানের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান ছিলেন। রাষ্ট্রপতির তিনজন এডিসি ক্যাপ্টেন শরীফ আজিজ, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মোশাররফ ও লেফটেন্যান্ট গোলাম রাব্বানী কেউই মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা নন। তারা সবাই পাকিস্তানফেরত। রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দায়িত্ব ছিল সরাসরি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হাতে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সময় স্বরাষ্ট্র সচিব ছিলেন আবদুর রহিম, যিনি ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান স্পেশাল ফোর্সের পরিচালক ছিলেন। এই ফোর্স গঠিত হয়েছিল রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তি কমিটির সদস্যদের নিয়ে। ১৯৭৫ সালে পুলিশের আইজি তসলিম উদ্দিন একাত্তরে পাকিস্তান পুলিশের আইজি ছিলেন। সেনা গোয়েন্দা ডিজিএফআইয়ের প্রধান আবদুর রউফ পাকিস্তানফেরত সেনা কর্মকর্তা। এসবির প্রধান ইএ চৌধুরী একাত্তরে ঢাকা জেলার এসপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা এনএসআইয়ের প্রধান আবদুল হাকিম একাত্তরে নোয়াখালীর এসপির দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। এনএসআইয়ের তিনজন ডেপুটি ডিরেক্টর এমএন হুদা, মুসা মিয়া চৌধুরী ও একেএম মোসলেমউদ্দিন একাত্তরে পাকিস্তানের সেবা করেছেন। বিডিআরের প্রধান মেজর জেনারেল খলিলুর রহমান একজন পাকিস্তানফেরত সেনা কর্মকর্তা। সুতরাং এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ষড়যন্ত্রের জাল বিছানোর কাজ অনেক আগেই শুরু হয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের সিআইএ’র স্টেশন চিফ ফিলিপ চেরি। এ প্রসঙ্গে কয়েক বছর আগে প্রখ্যাত মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলৎজ ধারাবাহিকভাবে একটি জাতীয় দৈনিকে বর্ণনামূলক ফিচার লিখেছিলেন। লিফশুলৎজ কর্নেল তাহের হত্যা মামলায় সাক্ষ্য দিতে ঢাকায় এলে এ বিষয়টি নিয়ে আমি তার সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ করেছি। তিনি বলেছেন, এ বিষয়ে তিনি দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন এবং আগামীতে আরও লেখার ইচ্ছা রাখেন। তিনি এ-ও বলেন, অসত্য তথ্য পরিবেশন করা একজন পেশাদার সাংবাদিকের কাজ নয়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের সঙ্গে তার (ফিলিপ চেরি) নিয়মিত যোগাযোগ ছিল এবং এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার অনুমোদন দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার আগে ৫ আগস্ট বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইউনি বোসস্টার বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাকশাল সম্পর্কে জানতে চান। ১৫ আগস্টের সপ্তাহখানেক আগে জিয়া বেগম জিয়াসহ গুলশানে এক ব্যবসায়ীর বাসায় ডিনারে যান। সেখানে ফিলিপ চেরির সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেন। তাদের মধ্যে কী আলাপ হয়েছে জানা যায়নি।
১৯৭৪ সালে কিসিঞ্জার ঢাকা সফর করে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠক শেষে ১০ মিনিটের সংবাদ সম্মেলন করে ঢাকা ত্যাগ করেন। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের সঙ্গে দেখা করতে গেলে কিসিঞ্জার দুই রাষ্ট্রপ্রধানের বৈঠকে উপস্থিত থাকতে অস্বীকৃতি জানান। কিসিঞ্জার বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বঙ্গবন্ধুর বিদায় চাইবেন, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বর্তমানে বঙ্গবন্ধুকন্যা যে ক্ষমতায় আছেন, তা-ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তেমন একটা সুখকর নয়, যা তাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। যুক্তরাষ্ট্রের অভিপ্রায়, বাংলাদেশ একটি জঙ্গিরাষ্ট্র হয়ে উঠুক; ফলে এ দেশে তারা গণতন্ত্র রপ্তানি করতে সক্ষম হবে, যেমন মধ্যপ্রাচ্যে করেছে।
বঙ্গবন্ধু আমৃত্যু বাংলা ও বাঙালির কল্যাণ কামনা করে গেছেন। নিজেকে এ দেশের সাধারণ মানুষের একজন মনে করেছেন। দলের শীর্ষ নেতা, দেশের প্রধান ব্যক্তি হয়েও তিনি ছিলেন সবার, সব বাঙালির কাছের মানুষ। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর ইতিহাস থেকে তার নাম মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান জয় বাংলা মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়। বাঙালির জনক ‘বঙ্গবন্ধু’ ও তাঁর দেওয়া স্লোগান সংরক্ষণে ভূমিকা নেয় আওয়ামী লীগ। একটা কৃষ্ণ সময় তো এসেছিল এ দেশে, যখন বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করা, জয় বাংলা স্লোগান দেওয়া অপরাধ হিসেবেই গণ্য হতো। সেই অন্ধকার কেটে গিয়ে উজ্জ্বলতায় উদ্ভাসিত আজকের বাংলাদেশ, তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালির জাতিসত্তার প্রতীক তিনি। বাঙালির স্বপ্নদ্রষ্টা অমর নায়ক। বাঙালির হৃদয়ে তাঁর অধিষ্ঠান।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর যারা মোশতাকের উপদেষ্টামণ্ডলী ও পরে তার মন্ত্রিসভার সদস্য হয়েছিলেন তারা সবাই বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত কাছের, আস্থাভাজন ছিলেন। কেউ কেউ হয়তো বন্দুকের নলের ডগায় মোশতাকের মন্ত্রিসভায় শপথ নিয়েছিলেন। নেননি চার জাতীয় নেতা। তাঁরা নির্ভয়ে কারাগারে যান। জীবন দিয়ে প্রমাণ করেন তাঁরা মৃত্যুঞ্জয়ী।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ষড়যন্ত্রের খেলা শুরু হয় গণতন্ত্র আর মানবাধিকার রক্ষার জিগির তুলে দিয়ে। শেষ হয় দেশটি ধ্বংস আর সে দেশের সম্পদ দখল করে। আর তার জন্য তারা ক্ষমতায় বসায় একটি তাঁবেদার সরকার। বাংলাদেশেও ইদানীং এ খেলা শুরু হয়েছে। সময় হয়েছে বাংলাদেশকে যারা ভালোবাসেন তাদের একজোট হয়ে এ ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা করার। স্বাধীনতা অর্জন যত কঠিন তা রক্ষা করা আরও কঠিন।
দেশের খ্যাতিমান লেখক আহমদ ছফা কোনো রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন না। তিনি ১৯৯৪ সালে ‘শেখ মুজিবুর রহমান’ শিরোনামে চট্টগ্রাম ‘বিজয় মেলা’র স্মারক গ্রন্থে এক প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘আজ থেকে অনেক দিন পরে হয়তো কোনো এক পিতা তার পুত্রকে বলবেন, জানো খোকা, আমাদের দেশে একজন মানুষ জন্ম নিয়েছিলেন, যার দৃঢ়তা ছিল, তেজ ছিল আর ছিল অসংখ্য দুর্বলতা। কিন্তু মানুষটির হৃদয় ছিল, ভালোবাসতে জানতেন। দিবসের উজ্জ্বল সূর্যালোকে যে বস্তু চিকচিক করে জ্বলে তা মানুষটির সাহস। আর জ্যোৎস্না রাতে রূপালি কিরণ ধারায় মায়ের স্নেহের মতো যে বস্তু আমাদের অন্তরে শান্তি এবং নিশ্চয়তার বোধ জাগিয়ে তোলে তা হলো তাঁর ভালোবাসা। জানো খোকা, তাঁর নাম শেখ মুজিবুর রহমান।’
বঙ্গবন্ধুসহ জাতীয় চার নেতা মহাকালের মহানায়ক। ঘাতকদের হাতে মৃত্যু ইতিহাসে তাঁদের অমর করে রেখেছে। আজকের এই দিনে ১৫ আগস্টের শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।