কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ, অর্থনীতিবিদ
প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৩ ০০:৫০ এএম
আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২৩ ১২:১৭ পিএম
কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ। সংগৃহীত ছবি
বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একদিকে দেশ স্বাধীন করার সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন, অন্যদিকে স্বাধীন বাংলাদেশের পরিকল্পিত উন্নয়নের রূপরেখা নির্ধারণ করেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে খুব পরিষ্কার করে তিনি বলেছেন, কীভাবে অর্থনীতি ও সমাজ সাজানো হবে। যেমন বলা আছে যে, বাংলাদেশের মানুষ নিপীড়িত, নির্যাতিত। এখানে একটা শোষণমুক্ত সমাজ তৈরি করা হবে- এটা ছিল বঙ্গবন্ধুর দর্শন।
১৯৭০-এর নির্বাচনী ইশতেহারে বলা আছে, কৃষকদের ২৫ বিঘা পর্যন্ত খাজনা মওকুফ করা হবে। কৃষির কোন কোন দিকে জোর দেওয়া হবে সেটাও ওখানে বলা আছে। বড় শিল্পের ক্ষেত্রে বলা আছে- শুধু বড় শিল্প নয়, বীমা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয়করণ করা হবে। এতে আরও বলা আছে যে, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র যেসব শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেগুলো বেসরকারি খাতে থাকবে এবং সরকার সেগুলোর সম্প্রসারণে সহায়তা করবে। এসকল এবং অন্যান্য প্রস্তাবনা পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের উন্নয়ন পথপরিক্রমায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
আরেকটা বিষয় উল্লেখ করতে চাই, ১৯৬০ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় উৎপাদ (জিডিপি) ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে ১৪ শতাংশ বেশি। ১৯৭০ সালে এসে পশ্চিম পাকিস্তানের জাতীয় উৎপাদন ১০% বেশি হয়ে গেল। সেই ১৪ শতাংশ ঘাটতি কাটিয়ে উঠে তাদের আরও ১০ শতাংশ বেশি হয়ে গেল। পূর্ব পাকিস্তানে নির্যাতন কত রকমভাবে চলছিল। অর্থনৈতিকভাবে আমাদের পিছিয়ে রাখার যে পরিকল্পনা ও কর্মসূচি ছিল, এর অংশ হিসেবে এখানে বিনিয়োগ কম হতো।
আমরা যখন স্বাধীন হলাম তখন এদেশ সার্বিকভাবে বিধ্বস্ত ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়। কৃষি খাত ও যোগাযোগব্যবস্থায় ধস নামে। শিল্প খাত অচল হয়। ব্যাংকে কোনো অর্থ ছিল না। বৈদেশিক মুদ্রার তহবিল শূন্য ছিল ।আরেকটা বড় সমস্যা ছিলÑ প্রশাসনিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল। তার মানে নীতি নির্ধারণ, কর্মসূচি গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিল না।
পাকিস্তানি জেল থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে এসে বিধ্বস্ত অবস্থা থেকে দেশ পুনর্গঠন শুরু করলেন। আমার ধারণা, কোনো সাধারণ নেতা হলে ভড়কে যেতেন যে এই অবস্থায় আমি কী করব! তার ওপর এক কোটি মানুষ ভারত থেকে ফিরে এসেছে। এখানে অসংখ্য মানুষ দরিদ্র। তখন দেশে প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ দরিদ্র ছিল। ৯০ শতাংশের ওপরে মানুষ গ্রামে বাস করত। রাস্তাঘাট নাই, পুল-ব্রিজ নাই। অর্থাৎ প্রায় শূন্য থেকে শুরু।
বঙ্গবন্ধু ওই বাস্তবতাকে বিবেচনায় রেখে পরিকল্পনা শুরু করলেন। তিনি প্রথমে দুটো দিকে বেশি জোর দিয়েছিলেন। একটা হচ্ছে অবকাঠামো অর্থাৎ রাস্তাঘাট, সেতু ইত্যাদি। যাতায়াত ও পরিবহনের ভালো ব্যবস্থা না থাকলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক উন্নয়ন কোনোটাই সম্ভব হয় না। একই সঙ্গে কৃষির দিকে নজর দিলেন। কৃষিতে তিনি অনেক সুযোগ-সুবিধা দিয়েছেন। ওই সময়ে সম্পদ বলতে তেমন কিছুই ছিল না। তবুও কৃষকদেরকে পুনর্বাসিত করার জন্য ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। ১০ লাখ সার্টিফিকেট মামলা তুলে নিলেন। আগের খাজনা সব মওকুফ করে দিলেন। এমনকি বীজ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণের ব্যবস্থা তিনি শুরু করেছিলেন। ঋণের ক্ষেত্রে টেস্ট রিলিফের জন্য ১৬ কোটি দিয়েছিলেন; আরও ১০ কোটি টাকা দিয়েছিলেন তাকাবি ঋণ এবং সমবায় ঋণ পাঁচ কোটি। তারপর তাঁর দলের লোক ও প্রশাসনের লোকদের জন্য নির্দেশনা দিলেন কৃষকদেরকে সম্মান করে কথা বলতে হবে। তাদের টাকায় বেতনভোগীদের জীবনযাপন করতে হয়, অতএব তাদেরকে সম্মান দিতে হবে।
আমি যেটা বলতে চাই, বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন দর্শনটাই ছিল মানুষকেন্দ্রিক। মানুষ বললে এর সঙ্গে আমি বহুমাত্রিকতা সামনে চলে আসে। একজন মানুষের তো অনেক কিছু লাগে- তাঁর অর্থনৈতিক দিক আছে, সামাজিক দিক আছে, শিক্ষা লাগে, স্বাস্থ্যসেবা লাগে। সবদিকেই তিনি নজর দেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় বা আমাদের বিজয়ের পরপর পাকিস্তানি শিল্পপতিরা চলে যাওয়ায় একটা অচল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। কারণ এদেশের বেশিরভাগ বড় শিল্প, বীমা, ব্যাংক তাদের হাতে ছিল। আমি মনে করি এই অবস্থা সৃষ্টি না হলেও এগুলোকে রাষ্ট্রীয়করণ করা হতো সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ হিসেবে। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, এদেশে বেশি ধনী কেউ হবে না; বেশি গরিব কেউ থাকবে না। শোষণহীন সমাজ গড়ার উল্লেখ ছিল ১৯৭০ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে।
সেই ইশতেহারে বঙ্গবন্ধু আরও ঘোষণা করেছিলেন যে, কুটির এবং অতিক্ষুদ্র শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে থাকবে এবং সরকারি সহয়তা পাবে। এগুলোর মাধ্যমে স্বল্প আয়ের মানুষদের আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হবে।
বঙ্গবন্ধুর একটি কথা আমার খুবই পছন্দ; যেটা আমি বিভিন্ন লেখায় উল্লেখ করেছি; যা পল্লী কর্মসংস্থান সহায়ক ফাউন্ডেশনের কাজের মাধ্যমে বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছি। তা হলো, দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো।
আমি মনে করি, বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন দর্শনের নির্যাস এই বক্তব্যে রয়েছে। তার মানে, যারা পিছিয়ে আছে, যারা নিজেদের অগ্রগতি নিজেরা অর্জন করতে পারছে না, তাদের দিকে নজর দিতে হবে। সব উন্নয়ন পরিকল্পনা ও কর্মসূচিতে এই দিকনির্দেশনা কেন্দ্রে রাখতে হবে। পিছিয়ে পড়া মানুষদের যদি এগিয়ে আসার সুযোগ সৃষ্টি না করা হয় তাহলে সমাজ বৈষম্যপূর্ণই হবে।
আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বলা আছে, সমাজ হবে বৈষম্যহীন। ১৯৭০-এর নির্বাচনী ইশতেহারে বঙ্গবন্ধু শোষণহীন সমাজের কথা বলেছেন। আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে আরও বলা হয়েছে, দেশের সকল মানুষ মানব-মর্যাদায় বসবাস করবে এবং সবার সব মানবাধিকার নিশ্চিত হবে। এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে বঙ্গবন্ধু পদক্ষেপ নিতে শুরু করেন।
বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, সেনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা দেড় বছরের মধ্যে তৈরি করা হয়েছিল। সোনার বাংলা, সমাজতান্ত্রিক বাংলা গড়ার ক্যাডার তৈরির পরিকল্পনা এই পরিকল্পনা দলিলে বিধৃত ছিল।
নৈতিক বোধের ওপর বঙ্গবন্ধু বিশেষ জোর দেন। তিনি দুঃখ করে একবার বলেছিলেন, পাকিস্তানিরা সব নিয়ে গেল, চোরগুলোকে নিল না। একটি সুস্থ, প্রগতিশীল, ন্যায্যভিত্তিক সমাজ গড়ার জন্য নৈতিকতাবোধসম্পন্ন ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ মানুষ প্রয়োজন। সেই বিষয়ের দিকেও পরিকল্পনায় নজর দেওয়া হয়।
বঙ্গবন্ধু সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।
তবে তিনি জানতেন, দেশের বিরাজমান বাস্তবতায় (অতিদুর্বল অর্থনীতি, দুর্বল সমাজ, দুর্বল প্রশাসনিক ব্যবস্থাÑ তার ওপর ক্যাডার নাই) তা রাতারাতি সম্ভব নয়। তাই সেই লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হওয়ার পথ রচনা করতে চেয়েছিলেন। প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সেই কাজটা করার চেষ্টা করা হয় বঙ্গবন্ধুর দিকনির্দেশনায়।
ওই সময়ে সারা বিশ্বে পরিবেশ নিয়ে তেমন সচেতনতা ছিল না। পরিবেশ নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে সচেতনতা মূলত শুরু হয় ১৯৭২ সালে, স্টকহোমে একটা আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মাধ্যমে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সেই সময়ে পরিবেশের দিকে নজর দিয়েছেন। সবাইকে গাছ লাগাতে বলেছেন। এ ছাড়াও একটি বড় কাজ করেছিলেন, সেটি হলো- সুন্দরবনের শ্যালা নদী দিয়ে জাহাজ গেলে পরিবেশ নষ্ট হয়, সেজন্য তিনি ঘষিয়াখালী থেকে মোংলা পর্যন্ত বিকল্প নৌপথ চালু করেন, যার জন্য ছয় কিলোমিটারের মতো খনন করা হয়। ওইটা ২০১০ সালে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৬ সালে প্রয়োজনীয় খননকাজ শেষে আবার এটা চালু করেছেন।
এ ছাড়াও তিনি অন্যান্য আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং বৈজ্ঞানিক, গবেষণা ও জাতিগঠনের এবং সমাজতন্ত্রে উত্তরণের বিভিন্ন নীতি নির্ধারণ ও বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
কিন্তু সময় পেয়েছিলেন মাত্র সাড়ে তিন বছর। তার মধ্যেও তিনি দেশের মানকেন্দ্রিক উন্নয়নের একটি পরিচ্ছন্ন দর্শন এবং এগিয়ে চলার ভিত তৈরি করে দিয়ে যান। বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক শক্ত অবস্থান, দূরদর্শিতা, মানবতাবাদ ও যখন যা করতে হবে তা নির্ধারণ করার মেধা এবং দেশের মানুষের, বিশেষ করে দরিদ্র ও পিছিয়ে থাকা মানুষের অর্থাৎ দুঃখী মানুষের সেই অবস্থান থেকে উত্তরণে অঙ্গীকারের কারণেই তিনি এত অল্প সময়ে এত কিছু অর্জন রেখে গেছেন।
বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির উদ্দেশে গভীর শ্রদ্ধা জানাই এবং তাঁর মাগফিরাতের জন্য কায়মনে দোয়া করি।