মৎস্যসম্পদ
ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ
প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২৩ ১৫:৩৭ পিএম
অলঙ্করন : জয়ন্ত জন
‘নিরাপদ মাছে ভরবো দেশ, গড়বো স্মার্ট বাংলাদেশ’Ñ এই প্রতিপাদ্যকে
সামনে রেখে ২৪-৩০ জুলাই দেশব্যাপী মৎস্য সপ্তাহ উদযাপিত হয়েছে। বিজ্ঞানভিত্তিক মাছ
চাষে উদ্বুদ্ধকরণসহ স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে মৎস্য খাতের গুরুত্ব ও সম্ভাবনা সম্পর্কে
জনগণকে অবহিতকরণ, মৎস্য চাষ এবং উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় আধুনিক ও ডিজিটাল যন্ত্রপাতি,
প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সামগ্রিকভাবে বিষয়টিকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়াই মৎস্য সপ্তাহের
মূল লক্ষ্য।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটে ইতোমধ্যে মৎস্য চাষ ও ব্যবস্থাপনা
বিষয়ক ৭৫টি লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে এবং উদ্ভাবিত প্রযুক্তি মৎস্য অধিদপ্তর
ও বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণের ফলে সাম্প্রতিককালে দেশে মাছের
উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইনস্টিটিউট থেকে উদ্ভাবিত এসব প্রযুক্তির
মধ্যে বিপন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ সংরক্ষণ ও চাষ, কৈ মাছের রোগ নিরাময়ে ভ্যাকসিন তৈরি,
অ্যাকোয়াপনিক পদ্ধতিতে স্বাস্থ্যসম্মত মাছ ও সবজি উৎপাদন, নোনাপানির চিত্রা ও দাতিনা
মাছের পোনা উৎপাদন, অপ্রচলিত মৎস্যসম্পদ যেমন কুঁচিয়া ও কাঁকড়ার পোনা উৎপাদন এবং চাষ,
মিঠাপানির ঝিনুকে ইমেজ মুক্তা উৎপাদন, সাগর উপকূলে সিউইড চাষ ও এর ব্যবহার, বিএফআরআই
মেকানিক্যাল ফিশ ড্রায়ার ব্যবহারের মাধ্যমে গুণগত মানসম্পন্ন শুঁটকি মাছ উৎপাদন এবং
ইলিশের ছয়টি অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা অন্যতম।
মৎস্য উৎপাদনে উন্নত প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে ব্যবহার ও সরকারের
মৎস্যবান্ধব বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণের ফলে দেশে মাছের উৎপাদন ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪৬.২১
লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। গবেষণা ক্ষেত্রে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধিসহ বিএফআরআই এবং মৎস্য অধিদপ্তরের
জনবল ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। অপরদিকে প্রকৃত মৎস্যজীবী/জেলেদের নিবন্ধন সম্পন্ন
হয়েছে এবং অধিকার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে মৎস্য অধিদপ্তর কর্তৃক ইতোমধ্যে ১৬ লাখ ২০ হাজার
জেলের নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে। জেলেদের জীবনমানের উন্নয়নের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
আইইউসিএন (২০১৫) এর তথ্যমতে, আমাদের মিঠাপানির ২৬০ প্রজাতির
মাছের মধ্যে ৬৪ প্রজাতির মাছ বিপন্নের তালিকায় চলে গিয়েছিল। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা
ইনস্টিটিউট ইতোমধ্যে বিপন্ন প্রজাতির ৩৯টি মাছের প্রজনন এবং চাষাবাদ কৌশল উদ্ভাবন করতে
সক্ষম হয়েছে। দেশে প্রথমবারের মতো ইনস্টিটিউটের ময়মনসিংহস্থ স্বাদুপানি কেন্দ্রে দেশীয়
মাছের লাইভ জিন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত এ লাইভ জিন ব্যাংকে মিঠাপানির
১১২ প্রজাতির মাছ সংরক্ষণ করা হয়েছে। প্রকৃতিতে কোনো মাছ হারিয়ে গেলে কিংবা বিপন্ন
হলে লাইভ জিন ব্যাংকের মাছ থেকে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে এসব মাছ পুনরুদ্ধার করা যাবে।
প্রচলিত মৎস্যসম্পদের পাশাপাশি বাণিজ্যিক গুরুত্বসম্পন্ন অপ্রচলিত
মৎস্যসম্পদ যেমনÑ কুঁচিয়া, শামুক, ঝিনুক, কাঁকড়া, সিউইড ইত্যাদি সংরক্ষণ ও উন্নয়নে
বর্তমান সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। আমাদের খাদ্যতালিকায় এসব অপ্রচলিত প্রজাতি না
থাকলেও বিদেশে এদের প্রচুর চাহিদা ও বাজারমূল্য রয়েছে। এসব পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে
প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। এ পরিপ্রেক্ষিতে কুঁচিয়া, কাঁকড়া, শামুক ও ঝিনুক
সংরক্ষণ এবং উন্নয়নে মৎস্য অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট কাজ করছে।
কাঁকড়ার পোনা উৎপাদনে ইনস্টিটিউট এখন সক্ষম। বিশ্বে ইলিশ উৎপাদনকারী ১১টি দেশের মধ্যে
একমাত্র বাংলাদেশেই এর উৎপাদন বেড়েছে। অপর ১০টি দেশে ইলিশ উৎপাদন কমেছে। দেশে মৎস্য
উৎপাদনে ইলিশের অবদান ১২.২২ ভাগ, যার বর্তমান বাজারমূল্য ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি।
দেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর পুষ্টি চাহিদা মেটাতে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির ধারা আমাদের
অব্যাহত রাখতে হবে। এ লক্ষ্যে পুকুরে চাষের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয় যেমনÑ
নদনদী, প্লাবনভূমি, সুন্দরবন, হাওর-বাঁওড়, কাপ্তাই লেক ইত্যাদি জলাশয়কে বিজ্ঞানভিত্তিক
চাষ ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হচ্ছে।
মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং প্রতিযোগিতামূলক
আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার লক্ষ্যে নিরাপদ মৎস্য উৎপাদন জরুরি। বাংলাদেশ বর্তমানে
অর্ধশতাধিক দেশে মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করছে। মানসম্মত মৎস্য ও মৎস্যপণ্য পরীক্ষার
জন্য ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় আন্তর্জাতিক মানের তিনটি মান নিয়ন্ত্রণ গবেষণার প্রতিষ্ঠা
করা হয়েছে। ফলে মৎস্য ও মৎস্যজাতীয় পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বে
বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে মাছের আহরণোত্তর ক্ষতি কমিয়ে আনার লক্ষ্যে
আমাদের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, সঠিক পরিচর্যা ও বাজারজাতকরণের
অভাবে মাছে শতকরা ৩০-৪০ ভাগ পুষ্টি কম পাওয়া যায়। সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের স্মার্ট
ব্যবস্থাপনার অভাবে আমরা কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন পাচ্ছি না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী
ও প্রাজ্ঞ নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার
এলাকায় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের মজুদ ও
বিস্তৃতি নির্ণয় এবং সর্বোচ্চ সহনশীল আহরণমাত্রা নির্ণয়ের লক্ষ্যে সমুদ্রে জরিপকার্য
পরিচালনা করা হয়েছে। মৎস্যসম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা কৌশল উদ্ভাবন নিয়ে কাজ করছে মৎস্য
ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং আহরিত তথ্যের ভিত্তিতে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের ব্যবস্থাপনা
কৌশল উদ্ভাবন করা সম্ভব হবে।
মৎস্য খাতে স্মার্ট প্রযুক্তি যেমন রিমোট কন্ট্রোল অপারেটেড
ফিশ ফিডার, অটোমেটিক পদ্ধতিতে পানির গুণাগুণ নির্ণয়, স্মার্ট সেন্সর, স্মার্ট আন্ডারওয়াটার
ক্যামেরা, আইওটি ভিত্তিক স্মার্ট মত্স্য খামার ব্যবস্থাপনা, রিমোট সেনসিং এবং জিআইএস
প্রযুক্তির মাধ্যমে রোগের পূর্বাভাস প্রদান ও দমন, রোবটিক্সের ব্যবহার ইত্যাদি অন্যতম।
বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে আমাদের কম সময় ও কম খরচে অধিক ফলন বৃদ্ধির জন্য এসব
স্মার্ট প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে আধুনিক প্রযুক্তি যেমন অটোমেটিক ফিশ ফিলেটিং মেশিন, অটোমেটিক ফিশ ইনস্পেকশন সেন্সর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আমাদের মৎস্য প্রক্রিয়াজাত কারখানায় এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায়। দেশের মৎস্য চাষি ও সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডাদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার মনস্ক ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। এতে মৎস্য খাতে আধুনিক ও প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে, মাছের উৎপাদন বাড়বে এবং অর্থনীতির ভিত মজবুত হবে।