জলমগ্ন চট্টগ্রাম
ড. বিশ্বজিৎ নাথ
প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০২৩ ১৪:০৮ পিএম
অলঙ্করন : জয়ন্ত জন
সময়ের প্রবহমান স্রোতে প্রকৃতি ও মানুষ একে অপরের পথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে। প্রকৃতি, প্রাণ ও পরিবেশ—এ তিনের মধ্যে অসামঞ্জস্যতা দেখা দিলেই দুর্যোগের ঘনঘটা শুরু হতে থাকে প্রকৃতিতে। বর্তমানে বহুল আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন সামগ্রিকভাবেই বিশ্বকে ভাবিয়ে তুলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে যা অতি দানবীয়রূপে আবির্ভূত হয়ে মানবজাতিকে স্বল্প সময়ের মধ্যেই বিপদাপন্ন করে তুলেছে, যার ফলে দ্রুত সময়ে দুর্যোগ মোকাবিলা করতে গিয়েও হিমশিম খেতে হচ্ছে। আমরা চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে যে নাজুক পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করছি তা এ থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। প্লাবণে ভেসে গেলো চট্টগ্রাম। এমন অভিঘাত চট্টগ্রামে যে প্রথম লেগেছে তা-ও নয়।
চট্টগ্রামসহ পার্বত্য
এলাকায় প্লাবণের পানি নামতে শুরু করেছে বটে কিন্তু এর সঙ্গে বেরিয়ে আসছে দুর্যোগের
ক্ষতচিহ্ন। কক্সবাজারে প্রায় ১৪০ কিলোমিটার সড়কে প্লাবণের ভয়াবহ আঘাত লেগেছে। লক্ষাধিক
ঘরবাড়ি সমগ্র চট্টগ্রামে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আরও যেসব ক্ষয়ক্ষতির চিত্র উঠে আসছে তাতে
সহজেই প্রতীয়মান হয় চট্টগ্রামে প্রাকৃতিক দুর্যোগে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, তা সারিয়ে
তোলা খুব সহজ নয়। ১১ আগস্ট প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম
ও পার্বত্য চট্টগ্রামে লাশের সারি দীর্ঘ হচ্ছে। প্রতিবেদনের ভাষ্য, ১০ আগস্ট ১১ জনের
প্রাণহানিসহ এখন পর্যন্ত মোট ৩৯ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। পাহাড় ধসেও আবার ঘটেছে প্রাণহানি।
গত প্রায় দশদিনে বর্ষণ ও জলাবদ্ধতা চট্টগ্রামে যেভাবে প্রলম্বিত ও নতুন নতুন এলাকায়
সম্প্রসারিত হয়েছে তা নজিরবিহীন। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান—এই তিন পার্বত্য জেলা এবং ‘সমুদ্রকন্যা’ হিসেবে পরিচিত কক্সবাজারে যে
বন্যা দেখা দিয়েছে এমনটি অতীতে কখনও দৃশ্যমান হয়নি। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে
সৃষ্ট দুর্যোগ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এ প্রশ্নও দাঁড়ায়, এই দুর্যোগের পেছনে মানুষ
কিংবা প্রকৃতির দায় কতটা। তবে এ কথা মনে রাখতেই হবে, প্রকৃতির প্রতি অবিচার করলে প্রকৃতি
অভিঘাত করবেই। পাহাড় ধসের ফলে এমন মর্মন্তুদতার জন্য পরিকল্পনাগত ভুলের দায় এড়িয়ে যাওয়ার
নয়। স্যাটেলাইট কিংবা উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস সংগ্রহ
করা সম্ভব। স্যাটেলাইট ইমেজ ব্যবহার করে খুব সহজে পাহাড় ধসের সম্ভাব্য এলাকা এবং কবে
নাগাদ ঘটতে পারে, তা জানা কঠিন নয়। আবহাওয়া ও দুর্যোগের পূর্বাভাস সচরাচর ব্যক্তিগত
উদ্যোগে গবেষকরা করে থাকেন। তবে পূর্বাভাস দিলেও এর বিস্তারিত তথ্য আমরা পাই না। এক্ষেত্রে
দুর্যোগ বিষয়ে গবেষণা, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিশেষায়িত গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে
তুললে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা দৃশ্যমান হতো।
বৈশ্বিক জলবায়ুর
পরিবর্তনে প্রত্যক্ষভাবে অবদান রাখছে মানবসৃষ্ট অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ড। সঠিক সময়ে সঠিক
জ্ঞানের প্রয়োগ না করা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সদ্ব্যবহার এড়িয়ে যাওয়া, সমন্বয়ের অভাব,
ঝুঁকি অনুমান, ঝুঁকির মাত্রা কমিয়ে আনার পরিকল্পনা কিংবা প্রস্তুতি ও বৈজ্ঞানিক গবেষণালব্ধ
ফলাফলের ওপর গুরুত্ব না দেওয়ার ফলস্বরূপ সামগ্রিক উন্নয়নের পথে পরিবেশ ও প্রকৃতি ক্ষতিগ্রস্ত
হচ্ছে। প্রকৃতিপ্রদত্ত বাস্তুসংস্থানের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ না করে নির্বিচারে ভূমির
ব্যবহার, অনিয়ন্ত্রিতভাবে স্থানীয় মানুষের স্থাপনাকৌশল বাদ দিয়ে কংক্রিট স্থাপনার সম্প্রসারণ
করে ভূমিরূপের ক্ষয়সাধনকে ত্বরান্বিত করা হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই বেশি গাছপালা, পরিমাণমতো
বৃষ্টিপাত, নদ-নদী, ছড়াসহ জলাধারসমূহের স্বাভাবিক পানির প্রবাহ, মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিসহ
নানাবিধ বিষয়ের ওপরেই মনুষ্যসৃষ্ট কার্যক্রম সাম্প্রতিক সময়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
প্রকৃতির নানা স্বাভাবিক চক্র ক্রমেই বিনষ্ট হচ্ছে মানুষের অতি ভোগবিলাসিতার কারণে।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের দিকে চোখ রাখলেই তার ছাপ যেন সুস্পষ্টরূপে ধরা
দেয়। এর ব্যতিক্রম নয় আমাদের প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যে ভরা নদ-নদী, পাহাড়-সমুদ্রে ঘেরা বাংলাদেশও।
জন্মলগ্ন থেকেই
প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ এ দেশের
সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। কিন্তু বর্তমানে পৃথক দুর্যোগ আঘাত হানার বদলে সমন্বিত দুর্যোগ
হানা দিচ্ছে। একটি দুর্যোগ আরেকটি দুর্যোগকে প্রভাবিত করছে। সৃষ্টি হচ্ছে নানাবিধ সমস্যা,
যা অর্থনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো কোনো দুর্যোগ
একটি অপরটিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে মাত্রা ও দীর্ঘস্থায়িত্বের দিক থেকে। আমরা দেখছি, প্রতিবছর
বিভিন্ন সময় দুর্যোগ মহামারির আকার ধারণ করে। এই দুর্যোগ জানান দিচ্ছে মানুষের কর্মকাণ্ডের
নানা বিচ্যুতি। ক্রমশ পরিবর্তিত আবহাওয়া ও জলবায়ুর সঙ্গে অভিযোজন ঘটিয়ে নেওয়ার জন্য
স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের মধ্যে পরিবেশের নানাবিধ বিষয় ও দুর্যোগের বিষয়াবলির নানাদিক
ও মোকাবিলা করার সক্ষমতা বৃদ্ধি করার কার্যক্রম বাড়াতে হবে। পাহাড় ও সমতলের মধ্যে মেলবন্ধন
করতে গিয়ে অপরিকল্পিত বসতি স্থাপনসহ অবকাঠামোগত উন্নয়ন যা সঠিকভাবে গবেষণালব্ধ ফলাফল
বের না করেই তড়িঘড়ি করে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বনায়নের হার না বাড়িয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে
ভূমির যথেচ্ছ ব্যবহার ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে পরিবেশগত ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে। প্রাকৃতিক
বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। যেমন বনায়ন হ্রাসে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ
হ্রাস পাওয়া, ঘনসন্নিবিষ্ট নগরে স্বাভাবিক তাপমাত্রার উচ্চবৃদ্ধি হার, অল্প সময়ে বেশি
পরিমাণ বৃষ্টিপাত, অপরিকল্পিতভাবে সড়ক উন্নয়ন, অধিক জনসংখ্যার চাহিদা মেটানোর নেতিবাচক
প্রভাব, ইত্যাদি।
পদ্ধতিগত রুটি,
প্রায়োগিক ও বৈজ্ঞানিক স্যাটেলাইট, তথ্যপ্রযুক্তির সঠিক ও আগাম পূর্বাভাস ব্যবহার না
করা, দক্ষ জনবলের অভাবসহ ঝুঁকি অনুমান না করতে পারা বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে
ব্যাহত করছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যমাত্রার দিকে এগোতে গেলে
সমন্বয়মূলক পদক্ষেপ একান্ত জরুরি। সমন্বয়মূলক কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে আগাম সতর্কতা
হিসেবে দুর্যোগ মোকাবিলায় একাধিক সুবিধা পাওয়া যাবে। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে
গবেষণায় উৎসাহ বাড়ানো জরুরি। চীনের বেইজিংয়ে রিমোট সেন্সিং ইনস্টিটিউটে গবেষণা করতে
গিয়ে দেখেছি সরকার আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও দুর্যোগের সম্ভাব্যতার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ,
প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ঝুঁকির মাত্রা কমিয়ে আনার পরিকল্পনার দায়িত্ব একাডেমিয়ার ওপর
ন্যস্ত করেছে। তারা দ্রুততম সময়ে সময়োপযোগী পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে
পাঠায় এবং প্রশাসনিক পর্যায়ে এর বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সমন্বয়ের ফলে কার্যক্ষেত্রে
যেমন দায়িত্ব ভাগ করা যায় তেমনি পরিকল্পনা বাস্তবায়নও সহজ হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের
দেশে এমনটি নেই।
ভূমিধস, পাহাড়ধস,
আকস্মিক বন্যা, তীব্র দাবদাহ, পাহাড় ও সমতলে সুপেয় পানির সংকট ও ভূগর্ভস্থ পানির নির্ভরশীলতা
বৃদ্ধি পাওয়ায় ভূপৃষ্ঠের ও উপরিভাগের পানি সঞ্চালন প্রক্রিয়ার ব্যাপক তারতম্য পরিলক্ষিত
হচ্ছে। এর ফলে অল্প সময়েই বড় দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ঝুঁকিপূরণ স্থানগুলোতে
মানববসতি স্থাপন না করা, সড়ক সম্প্রসারণ করতে গিয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি না করা,
সঠিকভাবে কম উচ্চতাসম্পন্ন ও কম দুর্যোগ সহনশীল ভবন নির্মাণ করার পাশাপাশি ভূমির ওপর
অতিমাত্রায় চাপ না ফেলা, নদ-নদী, খালবিলের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার সমন্বিত পরিকল্পনা
করাসহ নানাবিধ বিষয়ে নজর দিতে হবে। এক্ষেত্রে শুধু সাতকানিয়া ও আশপাশের জনপদের মানুষেরই
নয়, দেশের বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ উঠেছে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের রেলপথের নির্মাণত্রুটির
কারণে ওই অঞ্চলে আজকের এই বিপর্যয়। অপরিকল্পিতভাবে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের চিত্র দেখলে
এমন অভিযোগের সত্যতা অনুধাবন করা যায়। বড় পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য অধিকাংশ সময় পরিবেশের
ভারসাম্য নষ্ট করা হয়। প্রকল্পের মাঝপথে জলাশয় থাকলে এবং তা প্রয়োজন না হলে জলাশয় ভরাট
করার মাধ্যমে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগের মাত্রা বেড়ে যায়। প্রকৃতির
নানা প্রভাবক ও আদর্শ স্থান বিবেচনা করে প্রকল্প বাস্তবায়ন না করলে বিরূপতা তো সৃষ্টি
হবেই।
স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের ও গবেষণালব্ধ তথ্যের বাস্তবিক প্রয়োগসাধনপূর্বক ঝুঁকিপূর্ণ ও সহায়ক স্থান চিহ্নিত করা, পরিবেশের ক্ষতি করে এমন কাজ বন্ধ করা অতীব জরুরি। আমাদের মনে রাখতে হবে ও বুঝতে হবে, প্রকৃতির কোন জায়গা ভালো আর কোন জায়গা খারাপ। আমরা কোথায় বসতি গড়তে পারব আর কোথায় গড়তে পারব না। দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রাণ-প্রকৃতির কথা বিবেচনা না করে বাস্তুসংস্থানের চক্রাকারে নিজেদের সর্বোচ্চ নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে চলেছি। ফলে অগোচরেই নিজেদের বিপর্যয় ডেকে আনা হচ্ছে। সৃষ্টি হচ্ছে আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস, জলাবদ্ধতা। বিদ্যমান বাস্তবতায় ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভবিষ্যতে বড় আকার ধারণ করতে পারে এই আশঙ্কা অমূলক নয়। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের স্থানিক ও কালীন দুর্যোগ মোকাবিলা পরিকল্পনা দেশজুড়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। অতীতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ধারাবাহিকতার তুলনায় বর্তমানে দুর্যোগের ধারাবাহিকতা অনেক বেশি। পরিবেশবান্ধব স্থাপনা নির্মাণসহ, দক্ষ জনবল বাড়াতে হবে। আবহাওয়া ও জলবায়ু বিষয়ে উচ্চতর গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগকেও কাজ করতে দিতে হবে। দেশে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গবেষণার প্রায়োগিক দিকগুলোর সঙ্গে পরিচিত হতে পারে না। অথচ এই বিভাগগুলো প্রতিষ্ঠাই করা হয়েছে উচ্চতর গবেষণার মাধ্যমে সঠিক প্রায়োগিক পরিকল্পনা ও ঝুঁকি হ্রাসের বিষয়গুলো জানাতে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস যদি আমরা সমন্বিতভাবে আগেই আদায় করতে পারি তাহলে জীবনরক্ষা করা সম্ভব হবে। এমনকি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দেওয়াও সহজ হবে।