স্মরণ
ছবি: সংগৃহীত
‘মূলত আমাদের
দেশে লেখকেরা ঘরের বাইরে মূল্যায়িত হলেও ঘরে বোধহয় তেমনটা হন না’Ñ বাবার প্রসঙ্গে কথাটি
এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন মৌলি আজাদ। কিশোরদের জন্য সাড়া জাগানো বই ‘ফুলের গন্ধে ঘুম
আসে না’ হুমায়ুন আজাদ উৎসর্গ করেছিলেন মেয়ে মৌলি আজাদকে। বইটির শুরুও মৌলিকে সম্বোধন
করা বাক্য, ‘মৌলি, তোমাকে বলি...’ দিয়ে। বইটি কিশোর বয়সে প্রথম হাতে পেয়ে মৌলি আজাদ
বোঝেননি তিনি কী দামি উপহার পেয়েছিলেন। সেই কথাটিই তিনি এক সাক্ষাৎকারে ব্যাখ্যা দিয়ে
তুলে এনে ওপরের কথাটি বলেন। লেখকদের মূল্যায়িত না হওয়া, আমাদের সমাজিক সংকট। কারণ শিশু-কিশোরদের
সামনে উদাহরণ না থাকলে, দৃষ্টান্ত না থাকলে তারা কোন স্বপ্ন নিয়ে বড় হবে? হুমায়ুন আজাদ
সেই বিরল প্রতিভাদের অন্যতম, যিনি ঘরে ও বাইরে মূল্যায়িত হয়েছেন এবং স্বপ্ন দেখাতে
শিখিয়েছেন।
হুমায়ুন আজাদ
(২৮ এপ্রিল ১৯৪৭-১২ আগস্ট ২০০৪) প্রথাবিরোধী বহুমাত্রিক লেখক হিসেবে পরিচিত। তবে যে
অভিধায়ই তিনি চিহ্নিত হোন না কেন, তার বড় পরিচয় তিনি কবি। বিশ শতকের ষাটের দশকের কবিতার
সচেতন শিল্পী। তার কবিতা আবেগের সৃষ্টিশীল রূপ। যেখানের আবেগের পরিশীলিত বোধ এবং শিল্পরূপ
স্পষ্ট। নিজের কবিতা সম্পর্কে কাব্যসমগ্রের ভূমিকায় বলেছিলেন, ‘খ্যাতি, সমাজবদল এবং
এমন আরো বহু মহৎ উদ্দেশ্যে কবিতা আমি লিখিনি ব’লেই মনে হয়; লিখেছি সৌন্দর্যসৃষ্টির
জন্যে, আমার ভেতরের চোখ যে শোভা দেখে, তা আঁকার জন্যে; আমার মন যেভাবে কেঁপে ওঠে, সে
কম্পন ধরে রাখার জন্যে।’ সৌন্দর্যসৃষ্টি, শোভা মনের কম্পন তুলে ধরার জন্য হুমায়ুন আজাদ
যে দৃষ্টিভঙ্গি এবং জীবন-অভিজ্ঞতা উপজীব্য করে তার কবিতাকে সমর্পিত করলেন, তা ষাটের
দশকের কবিতার রুচি ও বৈদগ্ধ্যে সত্যিকার অর্থেই আলাদাভাবে তাকে চিহ্নিত করে।
হুমায়ুন আজাদ
এবং তার কবিতা আলাদা করে দেয়। তিনি কবিতার বিষয়, আকাঙ্ক্ষা এবং ব্যক্তির চৈতন্যমুক্তির
মধ্য দিয়ে হয়ে ওঠেন নাগরিক এবং একই সঙ্গে সময়াবর্তের এক স্পষ্ট বক্তা। ফলে আত্মকেন্দ্রিক
এবং অভিজ্ঞতালব্ধ কল্পনার পাখায় ভর করে জীবনবোধের উজ্জ্বলতাকেই তিনি লেখায় স্পষ্ট করে
তুলতে সক্ষম হয়েছেন। তাই তার কবিতা কখনোই আত্মনিমগ্নতার স্থির অচল বৃত্তে বন্দি থাকেনি।
ঐতিহ্য আশ্রয় করে জীবনের অগ্রগতি অনুসন্ধান করেন। সমকালীন পৃথিবীর পরিস্থিতিতে তিনি
প্রতিবাদী। আবার জনজীবনের বৈচিত্র্যময় অনুভূতি প্রকাশের ফলে তার কবিতা সমকালে তো বটেই,
উত্তরকালেও বহুদূর বিস্তৃত। ষাটের দশকের কবিতায় রাজনীতি এবং সমকালের যে বিস্তর ও বাধাহীন
চর্চা, তার শৈল্পিক উৎকর্ষ ছড়িয়ে রয়েছে হুমায়ুন আজাদের কবিতায়। ঐতিহ্য এবং আধুনিক কালের
প্রতিবাদী বিশ্বের সঙ্গে বুদ্ধি-হৃদয় ও কল্পনা মিলিয়ে তার কবিতা হয়ে উঠেছে নাগরিক রুচির
সর্বোত্তম প্রকাশ।
১৯৭৩ সালে প্রকাশ
পায় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অলৌকিক ইস্টিমার’। ‘কাব্যসমগ্র’র ভূমিকায় তিনি বলেন, ‘অজস্র
অসংখ্য কবিতা লেখার মনোরম দেশে আমি কবিতা লিখেছি কমই।’ বিশ শতকের ষাটের দশক বাংলা কবিতার
ফলবান সময়। এ সময়ের অধিকাংশ কবিই প্রচুর লিখেছেন। তারা রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে
এগিয়ে চলেছিলেন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম নেওয়ার অধ্যায়ের দিকে। সেই অভিজ্ঞতা,
সেই রক্তাক্ত স্মৃতি, স্বজন হারানোর বেদনা আর শাসকের হাতে শোষিতের লাঞ্ছনার বেদনার
ভেতর দিয়ে তারা পুষ্ট হয়েছেন। এ দশকের অনেক কবিই দেখেছেন ভারতীয় উপমহাদেশের বিভক্তি।
দেখেছেন উদ্বাস্তু মানুষের আর্তনাদ। ফলে এ দশকের কবিদের কবিতায় সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে
মানুষ এবং মানুষের অন্তর্জগৎ। হুমায়ুন আজাদ তার কবিতায় মৃত্যুবোধ ও ব্যক্তিগত যন্ত্রণার
যে আন্তরিক প্রকাশের মাধ্যমে সময়কে তুলে ধরেছেন, তা বাংলা কবিতায় সহজলভ্য নয়।