পরিপার্শ্ব
আফসানা সাথী
প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০২৩ ০০:১৯ এএম
আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২৩ ০০:২৫ এএম
‘যদি আজ বিকেলের ডাকে তার কোন চিঠি পাই? যদি সে নিজেই এসে থাকে, যদি তার এতকাল পরে মনে হয় দেরি হোক, যায়নি সময়?’ কবি নরেশ গুহের এ পঙ্ক্তির বাস্তবতা হলো, ডাকবাক্সে চিঠির অপেক্ষার সময় ফুরিয়ে গেছে। সেকেন্ডের ব্যবধানে পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে টুংটাং আওয়াজ তুলে খুদে বার্তা পৌঁছে যায়। সে বার্তায় আর চিঠির মতো ভুল বানানের কাটাকুটি শব্দের ওপর হাত বুলিয়ে চিঠিদাতাকে স্পর্শ করার অনুভূতি পাওয়া যায় না।
চিঠি শুধুই একটি যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না, বরং এটি একটি
শিল্পমাধ্যমও। বিখ্যাত অনেক লেখকের অপ্রকাশিত চিঠিও একসময় সাহিত্য হিসেবে বিবেচিত
হয়েছে। কখনও কখনও চিঠির হাতে লেখার পরিবর্তনের দিকে ভালো করে লক্ষ করলে লেখকের
আবেগের তারতম্য অনুধাবন করা যেত। খুশির সংবাদের চিঠিগুলো লেখার সময়, কোনো কোনো
শব্দ কলমের ডগা থেকে সাদা কাগজে বেরিয়ে আসার সময় উত্তেজনায় লেখকের আঙুল কেঁপে উঠত,
দুঃসংবাদের চিঠিগুলোয় খুঁজলে হয়তো দু-আধ ফোঁটা চোখের জলের দাগও পাওয়া যেত। চিঠিতে
যতটা স্নেহ-ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটত, খুদে বার্তায় কখনোই তা প্রকাশ পায় না। খুদে
বার্তা আসলেই বড্ড খুদে, এতে যতটুকু জানতে চাওয়া হয় খুব কার্পণ্যের সঙ্গে ততটুকুই
জানানো হয়। অথচ দূর অতীতে একেকটি চিঠিতে ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে এলাকার সার্বিক
খবরাখবরও তুলে ধরা হতো, যেন হাতে লেখা ছোট্ট একখানা খবরের কাগজ পড়ছি। যন্ত্রের
চিঠি যে যত্নে তুলে রাখা যায় না, ইচ্ছা হলে কাপড়ের ভাঁজ থেকে বের করে গালের সঙ্গে
চেপে ধরা যায় না। আঙুলের স্পর্শে মুহূর্তেই তা মুছে দেওয়া যায়। চিঠির সঙ্গে ফিকে
হয়ে যাচ্ছে চিঠিতে ব্যবহার করা সম্বোধনের শব্দগুলো, এখন আর প্রিয়তমেষু, সুচরিতেষু,
প্রাণেস্বর, প্রীতিভাজনেষু, শ্রদ্ধাভাজনেষু, শ্রীচরণেষু শব্দের ব্যবহার চোখে পড়ে
না।
নব্বইয়ের দশকের সময়টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর দিনের
শেষ কাজ ছিল কিছু জমানো চিঠির উত্তর লিখে ফেলা, আর দিনের প্রথম কাজ ডাকবাক্সে তার
নামে নতুন কোনো চিঠি জমা হয়েছে কি না তার সন্ধান করা। আর তাদের বালিশের তলা খুঁজলে
বাড়ি থেকে পাঠানো একাধিক চিঠি, কিছু খাম এবং অর্ধলিখিত বা লেখা সম্পূর্ণ হয়েছে এমন
কিছু পাওয়া যেত। কাল সকালে পোস্ট করা হবে এমন চিঠির সন্ধান পাওয়া যেত। তরুণ
প্রজন্ম এখন চিঠি শব্দটির সঙ্গে পরিচিত বাংলা দ্বিতীয় পত্রের গৎবাঁধা কায়দাকানুনের
মাধ্যমে। চিঠি কীভাবে পাঠাতে হয় সে কথাও তাদের জানা নেই। জানার কথাও নয়। আজকাল
মোবাইলেই সব যোগাযোগ করে ফেলা যায়। ডাকঘর আর ডাকবাক্সের এখন আর যৌবন নেই। ঢাকা
শহরের কোনো কোনো স্থানের ডাকবাক্সের ঢালাইয়ের লোহার স্থানে স্থানে মরিচা ধরে ক্ষয়ে
পড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এখনও বেশকিছু রঙচটা ডাকবাক্সের
অস্তিত্ব মেলে। কলাভবনের প্রধান ফটকের বাঁ দিকে একটু তীক্ষ্ণ নজর দিলে একটি
শীর্ণকায় ডাকবাক্স দেখতে পাওয়া যায়। এর একদিকে দেয়াল, আরেকদিকে ম্যানহোল আর বাকি
দুই দিক দখল করে আছে ময়লার স্তূপ। মুহসীন হলের গেটের সামনে লাল ডাকবাক্সটি তার
বিবর্ণমুখ নিয়ে এখনও কোনোরকম টিকে আছে।
চিঠি যতই অতীত হোক আমরা কিন্তু আবার বিশেষ ক্ষেত্রে চিঠির
ব্যবহার শুরু করতেই পারি। আধুনিক যুগে সময়ের গুরুত্বে হয়তো সব সময় সম্ভব নয়, তবে
বিশেষ বিশেষ সময়ে একটা এক পাতার চিঠি অনেক দামি উপহারকেও মলিন করে দিতে পারে।
চিঠির ঐতিহ্য সংরক্ষণ করাও জরুরি। ডাকবাক্স পুরোনো দিনের স্মৃতি ও ঐতিহ্য। এ ঐতিহ্য
সংরক্ষণ একান্ত জরুরি।