শ্রদ্ধাঞ্জলি
ফারুক আহমেদ
প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২৩ ১৪:১২ পিএম
আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২৩ ১৯:৪২ পিএম
‘সব শালা কবি হবে, পিঁপড়ে গোঁ ধরেছে উড়বেই,
দাঁতাল শুয়োর এসে রাজাসনে বসবেই’Ñ এক
সামরিক শাসকের বিরুদ্ধে লেখা এই পঙ্ক্তি সেই শাসককে টালমাটাল করে দিল। শব্দ যে স্ফুলিঙ্গের
মতো অন্তর থেকে অন্তরে ছড়িয়ে পড়ে, তা এরশাদ হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন। মোহাম্মদ রফিকের
লেখা ‘খোলা কবিতা’র এ পঙ্ক্তি সে সময়ের মানুষের অনুভূতিকে শব্দে রূপান্তরিত করার কাজটা
করতে পেরেছিল সফলভাবে। এই কবিতা একই সঙ্গে মোহাম্মদ রফিককে কবিমহলের গণ্ডি থেকে নিয়ে
এলো সবরকম পাঠকমহলের বিস্তৃত জমিনে। মানুষ একজন কবি, মানে সত্যদ্রষ্টাকে, একই সঙ্গে
একজন সাহসী পুরুষকে দেখতে পেল; যিনি কিনা জমতে থাকা ক্ষোভকে ভাষা দিলেন। একই সঙ্গে
রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তা ছাপা হয়ে চলে গেল পাঠকের হাতে হাতে।
মোহাম্মদ রফিক
এই কাব্যগ্রন্থ কীভাবে, কোন পরিপ্রেক্ষিতে লিখলেন। পাঠকের হাতেই-বা কীভাবে পৌঁছাল এই
বুটেলপ্রতিম পঙ্ক্তিমালা, এর বয়ান দিয়েছিলেন ‘যা ছিল বলার’ শিরোনামে এক প্রবন্ধে।
‘ধানসিড়ির’র পাঠকের অনেকেই এই লেখা পড়ে থাকবেন আশা করি। সেখানে তিনি, এই কবিতা লিখে
কীভাবে তা ছাপার অক্ষরে পৌঁছে দিলেন ক্ষুধার্ত পাঠকের হাতে, তার বয়ান আছে। এখানে তার
কিছু অংশ তুলে দিচ্ছিÑ ঘোর কাটতেই একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস। তারপরই বেরিয়ে এলো কবিতা। মনে
পড়ে, লিখেছিলাম সারারাত। জানালায় আলো এসে টোকা দিতে, চমকে গেলাম। আর কত!
২.
ধীরে, ভোর হলো।
বাইরে তাকিয়ে রইলাম অপলক, ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে রাত-ভেজা মৃদু আলো। গাছের মাথায়, পত্র-পুষ্পে,
মাঠে কোথাও কিন্তু টুঁ শব্দটি নেই। শব্দ নেই কারও মুখে, না বুদ্ধিজীবীর, না রাজনৈতিক
দলের, গণতন্ত্র-স্বাধীনতার ধ্বজাধারীদের। ভয়ে না আতঙ্কে, না গোপন আঁতাতের দলে, তারা
সবই নিশ্চুপে মেনে নিয়েছে সংবিধান ও গণতন্ত্র-হরণ ও ধর্ষণ। হরণ তো আগে, চলছিলই। এবার
পরিপূর্ণ ধর্ষণ। ভারাক্রান্ত হাতে গুটিয়ে নিলাম ইতস্তত ছড়ানো-ছিটানো লেখাটি। এবার ছাপিয়ে
ফেলার উদ্যোগ নিতে হবে। কে ছাপাবে? মনে এলো, তরুণ কবি আবিদ আজাদের নাম। শত হলেও কবি,
রাজি হয়ে যেতেও পারে। কবির কী আর সম্বল, একমাত্র সাহস ছাড়া, ব্যক্তিক দুঃসাহস। কেন
জানি প্রত্যয় হলো, সে রাজি হবে। তার প্রেস লালবাগে; আমি চিনি। ইতঃপূর্বে সে আমার ভাষা
বিষয়ে পুস্তিকাও ছেপেছে, তার প্রেসে। দেখা যাক।
মোহাম্মদ রফিকের
ভেতর এই ব্যাপারটা ছোটকাল থেকেই ছিল। স্বৈরশাসক, দুঃশাসনের বিরুদ্ধে কবির দাঁড়িয়ে পড়া।
আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধেও তিনি সোচ্চার ছিলেন। লিখেছিলেন কবিতা। কিন্তু এই যে কবি হয়ে
ওঠার ব্যাপারটা, সেখানে কিন্তু এরকম প্রতিবাদী হৃদয় ছিল না। ছিল এক প্রেমময় হৃদয়। কৈশোরে
এক বালিকার প্রেমে পড়ে কবি জেনেছিলেন, তাকে পাবেন না তিনি। কিন্তু তার প্রেম সত্য,
প্রেম তাকে লতানো বৃক্ষের মতো ঘিরে ফেলেছে। কিন্তু যে প্রেমিকা, তার কাছে মোহাম্মদ
রফিক যে অন্য দশজনের মতো সাধারণ নন, বিশেষ এই ব্যাপারটা বোঝাতে কবিতা লিখতে শুরু করলেন।
তারপর বোধ হয় সেই মুখ, যার জন্য আরাধ্য কবিতা এসে ধরা দিল, তিনি এবং কবিতাÑ
এ দুটি মোহন ঐশ্বর্য কবিকে ঘিরে রাখল জীবনব্যাপী।
৩.
মোহাম্মদ রফিকের
সঙ্গে আমার পরিচয়ের বয়স দুই দশক বা তার কিছুটা বেশি। তিনি আমাকে স্নেহ করতেন। আমি তাঁকে
শ্রদ্ধা করতাম। তার বাইরে তাঁর সঙ্গে আমার বিনিময়সূত্রে একটা গভীর যোগাযোগ ছিল। এই
বিনিময়টা ছিল কবিতার। যাঁরা কবিতাকে একটা মানদণ্ডে নিয়ে গিয়েছিলেন। যাঁদের জীবনকে আমরা
কবির জীবন হিসেবে শনাক্ত করে কবি হওয়ার পাঁয়তারা করি, তাঁদের একজন মোহাম্মদ রফিক। ফলে
সাময়িকীর পাতায় অন্য উল্লেখযোগ্য কবির সঙ্গে তাঁর কবিতা ছাপাতে পারা ষাটের প্রভাববিস্তারকারী
এই কবির বিস্তার ছিল অন্য সমসাময়িকদের থেকে ভিন্ন। যেখানে তাঁর সমসাময়িক নির্মলেন্দু
গুণ বা মহাদেব সাহা ব্যাপক জনপ্রিয়, সেখানে ‘খোলা কবিতা’ তুমুলভাবে আলোচিত হলেও তিনি
কিন্তু জনপ্রিয় কবি ছিলেন না। তার কারণ, তাঁর কাব্যভাষা। তবে কবিতা লিখাতেই তার সিদ্ধি
নয়, তিনি বিভিন্ন ভাষার কবিতাকে বাংলা ভাষার পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। এটা কবিতার
অনুবাদে যত না, তার থেকে বেশি করেছেন প্রবন্ধ লিখে, গদ্যে, সঙ্গে শিক্ষকতার সূত্রে।
উল্লেখ করার মতো একটা ব্যাপার হলো, শঙ্খ ঘোষের কবিতার থেকে তাঁর গদ্য যে কখনও কখনও
অধিক সুস্বাদু, তেমনি মোহাম্মদ রফিকের গদ্য অনেক সময় তাঁর কবিতার থেকে বেশি আলোড়িত
করে।
তাঁর প্রকাশিত
বইয়ের মধ্যে রয়েছেÑ কীর্তিনাশা
(১৯৭৯), খোলা
কবিতা ও কপিলা (১৯৮৩) (খোলা কবিতা পরবর্তীকালে বর্ধিত আকারে এ নামে পুস্তকগ্রন্থ
হয়), গাওদিয়ায় (১৯৮৬), স্বদেশী নিশ্বাস
তুমিময় (১৯৮৮), মেঘে এবং কাদায় (১৯৯১), রূপকথা কিংবদন্তি (১৯৯৮), মৎস্য গন্ধ্যা (১৯৯৯),
মাতি কিসকু (২০০০), বিষখালি সন্ধ্যা
(২০০৩), নির্বাচিত কবিতা (২০০৩), কালাপানি (২০০৬) নোনাঝাউ (২০০৮), দোমাটির মুখ (২০০৯), ত্রয়ী (২০০৯)। গদ্যগ্রন্থÑ
গদ্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ভালবাসার জীবনানন্দ (২০০৩), আত্মরক্ষার প্রতিবেদন (২০০১), স্মৃতি
বিস্মৃতির অন্তরাল (২০০২)।
খোলা কবিতা বইটি কবির আলোচিত বই। কিন্তু তিনি কবি ‘কীর্তিনাশা’র।
‘কীর্তিনাশ’র কথা তাঁর মুখে বহুচর্চিত ছিল, (তাঁর পাঠকের মুখেও) আর চর্চিত ছিল বরিশালের
কথা। কবির জন্ম বাগেরহাটে হলেও তিনি বরিশাল বলতে বিমোহিত ছিলেন। সে কারণে কিন্তু ‘জীবন
আনন্দ’-ই, জীবনের গূঢ় এক বিমোহিত আনন্দের গন্তব্যস্থল ছিল বরিশাল। কেননা কবিমাত্রই
তো প্রেমিক।
মোহাম্মদ রফিক কোনো সরকারেরই প্রিয়ভাজন ছিলেন না, কোনো সরকারই মোহাম্মদ
রফিকের প্রিয় ছিল না। বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁর বিশেষ দুর্বলতা ছাড়া, তাঁর শিরদাঁড়া ছিল
কবির, এ কারণে কোনো ‘প্রিয়ভাজনের’ ছায়াতলে তাঁর যাওয়ার ব্যাপারে অনীহা ছিল। কিন্তু
নিজের ভেতর তিনি সরব ছিলেন। মানুষ ভালোবাসার ছায়াতলে আসুক, সেই স্বপ্নটা লালন করতেন।
এ শহরের শ্রদ্ধার, ভালোবাসার মানুষ ছিলেন তিনি। এই কবি, যিনি একটি রঙধনু। আমাদের কবিদের বর্ণিল বাগানে মোহাম্মদ রফিক ছিলেন সবচেয়ে ফলবান বৃক্ষের একজন। তিনি পতিত হলেন, মাটির সঙ্গে মিশে যাবেন। তাঁর ভেতর যে অনুরণন, প্রাণময়তা তা মাটি পাবে। আর আমরা তাঁর কাব্যসুধা, চিন্তাসুধা পান করে মুগ্ধ হতে থাকব। তাঁর প্রতি প্রয়াণে অপার শ্রদ্ধা।