রাজনৈতিক সংকট
ড. মোসলেহউদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২৩ ১৪:০৪ পিএম
অলঙ্করন : জয়ন্ত জন
নিকট অতীতে এ
কলামেই লিখেছিলাম, আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশিদের নাক গলানোর বিষয়টি মোটেও স্বস্তির
নয় এবং তা কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ব্যবস্থা কেন্দ্র
করে দেশ রাজনৈতিকভাবে সমস্যাগ্রস্ত নয় বরং বলা যায়, রীতিমতো সংকটে নিপতিত। আমরা দেখছি,
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশিদের নজর আরও গভীর হয়েছে। তবে তা
নতুন নয়। অতীতেও দেশের রাজনৈতিক সংকটে তারা নাক গলিয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সংকটের
নিরসন আমাদেরই করতে হয়েছে। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় জনগণেই সব ক্ষমতার
উৎস এবং জনগণের আস্থা অটুট রাখা রাজনৈতিক দল তো বটেই, সরকার, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসহ
অন্য সব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলদের গুরুদায়িত্ব। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, নানা ক্ষেত্রেই
এর ব্যত্যয় ঘটছে। আমাদের চলমান রাজনৈতিক সংকট এবং দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে
দফায় দফায় বিদেশি প্রতিনিধিদল আসছে এবং দেশে বিভিন্ন রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনরত কূটনীতিকরা
বলতে গেলে বিরতিহীনভাবে রাজনৈতিক দল বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের সঙ্গে দফায়
দফায় বৈঠক করছেন। আমাদের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের সঙ্গেও তারা বসছেন।
বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশেই কমবেশি রাজনৈতিক সমস্যা রয়েছে। কিন্তু সেসব দেশে
বিদেশিরা এভাবে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কথা বলার সুযোগ পান না।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে
এ আশঙ্কাও ক্রমেই জনমনে প্রকট হচ্ছেÑ সামনে রাজনৈতিক সংকট আরও বাড়বে। আমরা ইতোমধ্যে
দেখেছি, রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দিতে
শুরু করেছে এবং এ কর্মসূচিগুলো থেকে ইতোমধ্যে আমরা যে বার্তা পেয়েছি, তা স্বস্তির নয়।
এ দুটি দলের বাইরে জাতীয় পার্টিও রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে মাঠে রয়েছে। শক্তির জোরে কম
হলেও বাম দলগুলোও রয়েছে প্রায় একই অবস্থানে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সহযাত্রী কিংবা
সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোও কর্মসূচি পালন করছে। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এমনটি
অস্বাভাবিক নয় বটে বরং বলা যায় স্বাভাবিকই, যতক্ষণ পর্যন্ত এমন কর্মসূচি গণতান্ত্রিক
নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় ও শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এ স্বাভাবিকতারও
ব্যত্যয় ঘটেছে। আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, অতীতে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকারের নামে আন্দোলন-কর্মসূচি
পালন করতে গিয়ে ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল।
কোনো সভ্য সমাজে রাজনৈতিক দলের আন্দোলনের কারণে মানুষ সহিংসতার আগুনে পুড়ে প্রাণ হারাবে,
এমনটি মানবাধিকার কিংবা মানবতার ওপর চরম কষাঘাত বই কিছু নয়। জীবনবৈরী, রাজনীতির নীতিসূত্রবিরুদ্ধ
এমন কর্মকাণ্ডের শিকার যারা হয়েছেন, তাদের পরিবারে এখনও দুঃখের ভারী নিঃশ্বাস বইছে।
এমন দৃষ্টান্তও আছে, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি সহিংসতার শিকার হয়ে প্রাণ
কিংবা জীবনীশক্তি হারিয়ে ফেলায় এর বহুমুখী বিরূপ প্রভাব অনেককেই বিপন্ন-বিপর্যস্ত করেছে।
এই মর্মস্পর্শী ঘটনার দায় সরকার এবং রাজনীতিসংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষই এড়াতে পারে না। রাজনীতিকদের
অন্যতম দায় জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জনকল্যাণের পথ সুগম করা। কিন্তু এই নীতিজ্ঞান
যেন এখন অনেকের কাছে একেবারেই মূল্যহীন!
আমাদের রাজনীতির
অর্জন-অনার্জন-বিসর্জন নিয়ে নানা প্রেক্ষাপটে ফিরে ফিরে অনেক কথাই ওঠে। প্রথমত বলতে
হয়, আমাদের রাজনীতির অর্জন অনেক। আজকের যে বাংলাদেশ, যার অভ্যুদয় একাত্তর পর্বে ঘটেছে
মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে নিঃসন্দেহে বলা যায় রাজনীতির
অর্জন। স্বাধীনতার পূর্বাপর এ ভূখণ্ডেই অর্জনের দৃষ্টান্ত আরও অনেক আছে। পাশাপাশি এও
সত্য, ইতোমধ্যে অর্জনের বিসর্জনও কম ঘটেনি। রাজনীতির নামে অপরাজনীতি এবং হীনস্বার্থবাদীদের
কারণে অনেক কিছুরই বিসর্জন ঘটেছে। আমরা একেকটি রাজনৈতিক দুর্যোগ-উত্তর বারবার প্রত্যাশা
করেছি, রাজনৈতিক অঙ্গনে স্বচ্ছতা-দায়বদ্ধতা-জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু প্রত্যাশা
বহুবার হোঁচট খেয়েছে এবং ভবিষ্যতেও যে হোঁচট খাবে না, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। আমাদের
অনার্জনেরও আরও অনেক কিছু রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানে
ব্যর্থতা। গণতন্ত্র যদি প্রকৃতপক্ষেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেত, তাহলে পুনর্বার যে রাজনৈতিক
সংকটে আমাদের নিপতিত হতে হয় তা হতে হতো না। মোটা দাগে অনার্জনের এ বিষয়টি বিশেষভাবে
উল্লেখযোগ্য হলেও আরও কিছু বিষয় অনার্জিত রয়েছে, যেগুলো অর্জিত হলে মানুষের অধিকারের
মাঠ সমতল হতো। ৪ আগস্ট সংবাদমাধ্যমেই দেখলাম, বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত
পিটার হাস রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ৩ আগস্ট বৈঠক করেছেন।
আমরা দেখছি, অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে অধিকতর সক্রিয়
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি ইইউও কম সক্রিয় নয়। প্রতিবেশী বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র
ভারত আমাদের বিদ্যমান সংকটের ব্যাপারে প্রকাশ্যে তেমন কিছু না বললেও বাংলাদেশে তারা
স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চায় এমন অভিমত ব্যক্ত করেছে।
২ আগস্ট সংবাদমাধ্যমে
জানা যায়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ তৈরির জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে
সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল। ১ আগস্ট
মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি এ আহ্বান জানান। ওই দিনই পিটার
হাস বলেন, বাংলাদেশের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে অক্টোবরে
যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রাক্-নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল আসবে। ওই পর্যবেক্ষক দলে ন্যাশনাল
ডেমোক্র্যাটিক ইনস্টিটিউট এবং ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিক ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞরা থাকবেন,
যাদের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ও প্রস্তুতি নিয়ে অভিজ্ঞতা রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক
দেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে বিদেশি পর্যবেক্ষকরা উপস্থিত থাকেন এটা বিরল নজির নয়।
কিন্তু আমরা দেখছি, আমাদের নির্বাচন ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাদের আগ্রহের মাত্রাটি
একটু বেশি। এই যে একের পর এক বিদেশিরা আমাদের এখানে সিরিজ বৈঠক করছেন, সেসব বৈঠক থেকে
যে বার্তা মিলছে কিংবা বিদেশিরা যে ভাষায় কথা বলছেন, তা একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকদের
জন্য সম্মানজনক নয়। দেশের সচেতন জনগণ এজন্য খুব স্বাভাবিক কারণেই পীড়া বোধ করছে। ইতোমধ্যে
সংবাদমাধ্যমে এও জানা গেছে, বিদ্যমান সংকট নিরসনে সিইসি সংলাপের পরামর্শ দিলেও নানানরকম
শর্ত দিচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। আগেও বলেছি, চলমান সংকট
নিরসনের জন্য রাস্তা নয়, বেছে নিতে হবে আলোচনার টেবিল। সংবিধান সমুন্নত রেখেই এ আলোচনায়
বসতে হবে। প্রশ্নমুক্ত নির্বাচন এবং স্বচ্ছ রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ এ দুই-ই দেশ-জাতির
বৃহৎ স্বার্থে জরুরি।
নির্বাচনের নিয়ামক
মুখ্য শক্তি নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনকালীন সরকার তাদের সহযোগী শক্তিমাত্র। এ ক্ষেত্রে
সরকার ও রাজনৈতিক দল অর্থাৎ নির্বাচনে অংশীজন সবারই কমবেশি দায় রয়েছে। তবে মূল দায়টা
নির্বাচন কমিশনেরই। দলীয় সরকারের অধীনেও আমাদের দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের দৃষ্টান্ত আছে।
কিন্তু এও অসত্য নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে নির্বাচন কমিশন
তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে না পারার কারণে। আস্থার পারদ সেখান থেকেই
নিম্নগামী হতে শুরু করে। আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য নির্বাচন কমিশনের অবশ্যই বলিষ্ঠ ও
নির্মোহ ভূমিকা প্রয়োজন এবং আরপিও সংশোধনে ইসির ক্ষমতা কমেছে এ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও
সংবিধান এখনও যে ক্ষমতা তাদের দিয়ে রেখেছে, এর প্রতিপালন করে প্রশ্নমুক্ত নির্বাচন
অনুষ্ঠিত করা মোটেও দুরূহ নয়।
আস্থা ফিরিয়ে
আনা এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা নির্বাচন কমিশনের গুরু দায়। সরকারেরও এ
ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে বিরোধী রাজনৈতিক দলসহ সব পক্ষকেই
শান্তি ও স্থিতিশীলতা তো বটেই, উন্নয়ন-অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রাখতেও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক
ভূমিকা পালন করতে হবে। একটি কথা অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে আমলে রাখতে হবেÑ রাজনীতির দোষত্রুটি
রাজনীতি দিয়েই সারতে হবে, অন্য কোনো পথে নয়।
আমরা আশা করব, সরকার এবং রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারকরা তাদের দায় ভুলে যাবেন না। প্রশ্নমুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে নির্বাচন কমিশনের অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতিই যথেষ্ট নয়, তাদের চলমান কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে এ আস্থা অর্জন করতে হবে। আলোচনার টেবিলে বসা ছাড়া বিদ্যমান সংকটের নিরসন দুরূহ। এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নতুন করে নিষ্প্রয়োজন। আমরা শান্তি চাই, চাই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। রাজনৈতিক দল এবং সরকারের নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে তাদের কোনো কর্মসূচিই যাতে জনশান্তি বিনষ্টের কারণ না হয়ে দাঁড়ায়। ভুলে যাওয়া অনুচিত, এদেশের জনগণ গণতন্ত্রের জন্য এ পর্যন্ত কম মূল্য দেয়নি।