পরিপার্শ্ব
ডা. লিপি বিশ্বাস
প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২৩ ১৪:০০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
হিমালয়ের কোলঘেঁষা ছোট্ট শহর মানালি। অসম্ভব মায়াময় এক জনপদ। প্রথম দেখাতেই এ শহর মুগ্ধ এবং একই সঙ্গে বিস্মিত করেছিল। মনে হচ্ছিল বিয়াসের কোলঘেঁষা এ শহরটাতেই যদি থেকে যেতে পারতাম আজীবন! কথিত আছে, এক ভয়াবহ ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের পর আদিমানব মনু এই মানালিতে আশ্রয় নেন। সেই ‘মনু আলয়’ থেকে মানালি শব্দের উদ্ভব। শহরজুড়ে অসংখ্য পুরোনো মন্দির। বশিষ্ঠ মুনির আশ্রম, মহাভারতে উল্লিখিত হিদিম্বা দেবীর মন্দির এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। শহরের মাঝখানেই আছে একটি তিব্বতিয়ান মঠ। শহরঘেঁষে বয়ে গেছে বিপাশা (বিয়াস) নদী। মানালি থেকে ফেরার আগে আমরা একটা পড়ন্ত বিকাল ওখানে কাটিয়েছিলাম। এক জীবন যে নদীর তীরে বসে কাটাতে চায়, তার কি আর একটুকরো বিকালে মন ভরে! ওই সময়টায় সফরসঙ্গী সবাই কেমন যেন আনমনা হয়ে গিয়েছিলাম। নদীর কলকল শব্দের একটা অদ্ভুত সম্মোহনী শক্তি আছে। চিন্তাকে কেমন আচ্ছন্ন করে দেয়। সময় চলে যায়, তবু তার মোহ-মায়া কাটে না! নইলে এখনও বেশ ক’বছর পরও চোখ বন্ধ করে আমি কি তার বয়ে চলা অনুভব করি।
ভারত ভ্রমণের আগে মাস তিনেক বলতে গেলে প্ল্যান নিয়েই পড়ে ছিলাম। কোথায় যাব, কী দেখব এসবই ছিল আমার ধ্যানজ্ঞান! শেষ পর্যন্ত একটা ব্যাপার পরিষ্কার বোঝা গেল, মানালিতে গেলে রোটাং পাস যাওয়া বাধ্যতামূলক। এত সুন্দর ছবি, ভিডিও, ফিচার পড়ে পড়ে আর দেখে দেখে আমার মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। তবে সঙ্গে এও জানলাম, বছরের কয়েক মাস ওখানে যাওয়ার রাস্তা বন্ধ থাকে তুষারপাতের কারণে। ভিসা-পাসপোর্ট, ছুটি সবকিছু মিলিয়ে আমাদের যাওয়া নিয়ে প্রকৃতির যেরকম ছিনিমিনি খেলা চলছিল, তাতে মনে আশঙ্কা জন্মেছিল কি জানি আমরা না সেই দুর্ভাগাদের দলে পড়ে যাই! শেষ পর্যন্ত মানালি পৌঁছানোর দ্বিতীয় দিনে আমরা গেলাম রোটাং পাস। সবচেয়ে আরাধ্য স্পটে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৩ হাজার ফুটের বেশি উচ্চতায়! যা দেখলাম তা বর্ণনা করার মতো ক্ষমতা আমার তখনও ছিল না, এখনও নেই। এ ক্ষুদ্র জীবনে কত শতবার বৃহৎ অভিযোগ করেছি করুণাময়ের প্রতি, এটা দিলে না কেন! ওটা পেলাম না কেন! এমন কত কী। কেবলই অকৃতজ্ঞ অভিযোগ। অথচ সেই মহান শিল্পীর যত্নে গড়া শিল্পকর্মের সামনে একই সঙ্গে শ্রদ্ধায় আর বিনয়ে মাথা ঝুঁকে পড়ল। আমাদের জন্য তিনি কি বিশাল সুযোগ করে দিয়েছেন! সুগভীর মুগ্ধতা আর কৃতজ্ঞতায় মন পরিপূর্ণ হয়ে উঠল। সেই মুগ্ধতা ছেড়ে আসতে মন সায় দিচ্ছিল না। তবু সময়কে তো আর মুঠোয় বন্দি করা যায় না।
আমরা ফিরলাম, হয়তো নতুন করে আবারও একদিন যাব বলেই। এ ক্ষুদ্র জীবনের বৃহৎ আক্ষেপ এই, চারপাশের কত ‘অসুন্দর’কে নিয়ে নিত্য পথ চলছি, অথচ এ পৃথিবীর কত ‘সুন্দর’কে না দেখেই একদিন চলে যাব! তাই যতটুকু পারি এ ক্ষুদ্র জীবনে আরও হাজারটা জীবন যাপন করে যেতে চাই। মাতৃভূমির স্বাধীন ভূখণ্ডে যেমন ঘুরে বেড়াতে চাই, তেমনি সাধ ও সাধ্যের মেলবন্ধনে পাড়ি দিতে চাই দেশ-দেশান্তরেও। আর সৌন্দর্য আসলে কোনো কাঁটাতারের সীমারেখায় বন্দি নয়। সে তো মুক্তÑ মত ও পথ দুইয়ে মিলেই। মুক্তমনেই তাকে গ্রহণ করতে চাই। বিধাতার সৃষ্টি এবং মানুষের কৃষ্টিকে ধারণ করতে চাই আপন অন্তর্দৃষ্টিতে। সেই মুক্তমনের, মুক্তপথের যাত্রা যেন অব্যাহত থাকে আমৃত্যু। ‘ভুবনগ্রাম’ ধারণা নিয়ে এগিয়ে চলছে বর্তমান বিশ্ব। আশা করতে চাই , এ বাস্তবতা ঘুরে বেড়ানোদের পথ মসৃণ করবে ।