স্মরণ
‘জনতার সংগ্রাম চলবেই,/আমাদের সংগ্রাম চলবেই।/হতমানে অপমানে নয়, সুখ সম্মানে/বাঁচবার অধিকার কাড়তে/দাস্যের নির্মোক ছাড়তে/অগণিত মানুষের প্রাণপণ যুদ্ধ/চলবেই চলবেই,/আমাদের সংগ্রাম চলবেই’। ১৯৭১-এ মুক্তিপাগল মানুষকে প্রেরণা দেওয়া এই গণসংগীত আজও বাঙালির যেকোনো আন্দোলন-সংগ্রামে প্রেরণা। মুক্তিসংগ্রামে স্বপ্ন আঁকা মানুষের সামনে আজও জ্বলজ্বল করে উজ্জ্বল আলোকচ্ছটায় বিলিয়ে চলা পঙ্ক্তিমালা, ‘রক্তচোখের আগুন মেখে ঝলসে যাওয়া আমার বছরগুলো/…/ কাজ কি তবে আগলে রেখে বুকের কাছে কেউটে সাপের ঝাঁপি/আমার হাতেই নিলাম আমার নির্ভরতার চাবি/তুমি আমার আকাশ থেকে সরাও তোমার ছায়া/তুমি বাংলা ছাড়ো’-এর রচয়িতা কবি সিকান্দার আবু জাফর। তিনি ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী।
কবি, গীতিকার,
নাট্যকার, কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক এবং সাংবাদিক হিসেবেও রয়েছে তাঁর খ্যাতি। কলকাতা থেকে
আইএ পাস করে ১৯৩৯ সালে কলকাতার মিলিটারি অ্যাকাউন্টস বিভাগে যোগ দেন। পরে চাকরি করেন
সিভিল সাপ্লাই অফিসে। সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদারের সংবাদ সংস্থা ‘গ্লোব নিউজ এজেন্সি’তেও
কাজ করেছেন। ছাত্রাবস্থায়ই লেখালেখির চর্চা শুরু করেন। পরে আগ্রহ জন্মে সাংবাদিকতায়।
১৯৪১ সালে কবি কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ‘দৈনিক নবযুগ’-এও কাজ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের
পর ঢাকায় ফিরে আসেন কলকাতা থেকে। ১৯৪৮-৫৩ পর্যন্ত স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করেন রেডিও
পাকিস্তানে। ১৯৫৩ সালে সহযোগী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন ‘দৈনিক ইত্তেফাক’-এ। ১৯৫৪ সালে
‘দৈনিক মিল্লাত’-এর প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেন। ১৯৫৭ সালে প্রকাশ করেন ‘সমকাল’।
এ সাময়িকপত্রটি আমৃত্যু সম্পাদনা করে গেছেন। ‘সমকাল’ খুব দ্রুত প্রগতিশীল সাহিত্য আন্দোলনের
মুখপত্র হয়ে ওঠে। তরুণ লেখকদের উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি সমকাল তার পৃষ্ঠায় নতুন মত প্রকাশের
পথও উন্মুক্ত করে দেয়। সমকাল সম্পর্কে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেছিলেন, ‘সমকাল
সেকালে আমাদের সাহিত্যের ব্যাপারে নিজেদের মনের সমস্ত সন্দেহ ও দ্বিধাদ্বন্দ্বের অবসান
ঘটিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালি যেমন নিজের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছিল,
তেমনি অর্জন করেছিল নিজের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব।’
রেডিও ও টিভিতে
রবীন্দ্রসংগীত প্রচার বন্ধ করার পাকিস্তান সরকারের সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেন
সিকান্দার আবু জাফর। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি হানাদার-বাহিনীর বিরুদ্ধে তিনি
ঢাকা থেকে প্রকাশ করেন ‘অভিযোগ’ নামে একটি পুস্তিকা, যেখানে স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেন
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আমাদের সংগ্রামের যৌক্তিকতা। মুক্তিসংগ্রামে প্রবাসী সরকারের পক্ষে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী সিকান্দার আবু জাফরের জন্ম ১৯ মার্চ, ১৯১৯ সালে সাতক্ষীরার
তেঁতুলিয়া গ্রামে। কালজয়ী এই কবি শুধু কবিতাই নয়, অসংখ্য গণসংগীতেরও রচয়িতা। তাঁর রচিত
নাটক সিরাজউদ্দৌলা লাভ করে অসামান্য জনপ্রিয়তা। দুই ডজনের বেশি বইয়ের লেখক সিকান্দার
আবু জাফরের প্রথম কবিতার বই ‘প্রসন্ন প্রহর’। বইটি প্রকাশ পায় ১৯৬৫ সালে। পরে প্রকাশিত
তাঁর উল্লেখযোগ্য কবিতার বইয়ের মধ্যে রয়েছে : বাংলা ছাড়, বৈরীবৃষ্টিতে, তিমিরান্তিক,
কবিতা ১৩৭২, বৃশ্চিক লগ্ন মালব কৌশিক। এ ছাড়া সিরাজউদ্দৌলা, শকুন্ত উপাখ্যান, মহাকবি
আলাওল তাঁর রচিত নাটক। তিনি উপন্যাসও রচনা করেছেন। মাটি আর অশ্রু, পূরবী, নতুন সকাল
তাঁর উপন্যাস। মতি আর অশ্রু তাঁর পাঠকপ্রিয় গল্পগ্রন্থ। কিশোরদের জন্য লিখেছেন কিশোর
উপন্যাস : জয়ের পথে ও নবী কাহিনী। অনুবাদ করেছেন রুবাইয়াৎ ওমর খৈয়াম, সেন্ট লুইয়ের
সেতু, বারনাড মালামুডের জাদুর কলস, সিংয়ের নাটক।
বহুমাত্রিক প্রতিভা সিকান্দার আবু জাফর তাঁর লেখায় তুলে ধরতে চেয়েছেন বাংলাদেশকে। তিনি বিশুদ্ধ বাংলাদেশের প্রত্যাশা করেছেন, সেই প্রত্যাশাকেই বারবার নানা রূপে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখায়। ১৯৭৫ সালের ৫ আগস্ট ঢাকায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করা কবি সিকান্দার আবু জাফর মতপ্রকাশে ও চিন্তার স্বাধীনতায় ছিলেন আপসহীন যোদ্ধা। বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করি।