× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

জাতির গর্ব, আমাদের অনুপ্রেরণা

শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন

প্রকাশ : ০৪ আগস্ট ২০২৩ ১৪:২৩ পিএম

জাতির গর্ব, আমাদের অনুপ্রেরণা

১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠার পর প্রথম ৫০ বছরে শিক্ষা, গবেষণা ও বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে অনন্য ভূমিকা। কিন্তু কী জানি কী হলো, স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর একদার পূর্ববঙ্গ, কিছুদিনের পূর্ব পাকিস্তান এবং হালের বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের মানুষের অন্যতম ভরসার স্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার আগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারছে না। এই দু-তিন দশক আগেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জ্ঞান, ব্যক্তিত্ব ও ওজনের কারণে তাঁদের অনেককেই প্রতিষ্ঠানসম বলে মনে করা হতো। দেশবিদেশে তাঁরা হতেন সমাদৃত। প্রশ্ন উঠেছেÑ এখন কি এ ক্ষেত্রে কিছুটা ভাটার টান পড়েছে?

আমরা স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় দেখেছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা ও সৃজনশীলতার জগতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। কলেজে পড়ার সময় আমরা আহমদ শরীফ, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, অধ্যাপক অজয় রায় স্যারদের কলাম পড়ে সমৃদ্ধ ও উজ্জীবিত হতাম। অধ্যাপক হ‍ুমায়ূন আহমেদ ‘শংখনীল কারাগার’ ও ‘নন্দিত নরকে’র মতো উপন্যাস লিখে পাঠকপ্রিয়তা পেলেন। তারপর টেলিভিশন নাটকের সুবাদে তিনি এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে নাটক, লেখালেখি ও চলচ্চিত্রের জগতে থিতু হলেন। ওই সময়ের আরেক শিক্ষক অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদও ছিলেন সৃজনশীল, গবেষণা ও কলাম লেখায় সিদ্ধহস্ত। অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিম, ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল এবং অধ্যাপক মনিরুজ্জামান অনুবাদ, লেখালেখি ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের জন্য বিশিষ্ট স্থান অর্জন করেছিলেন।

এরকম আরও অনেক অধ্যাপকের নাম করা যেতে পারে, যাঁদের ছিল এবং আছে দেশজোড়া খ্যাতি। আবার অনেকে তাঁদের বিষয়ে শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে এতটাই দক্ষ ও চৌকশ ছিলেন যে, আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ও গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী এবং সরকারি কর্মকর্তা ও অন্যান্য পেশায় কর্মরত সাবেক ছাত্রছাত্রীদের মুখে তাঁদের নাম প্রায়ই উচ্চারিত হতো। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ, অধ্যাপক তালুকদার মনিরুজ্জামান, অধ্যাপক সিরাজুল হক, অধ্যাপক মোহাব্বত খান, অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, অধ্যাপক মিজানুর রহমান, অধ্যাপক এমএম আকাশের নাম। সেসব ওজনদার ও প্রতিষ্ঠানসম শিক্ষক এখন আর আমরা দেখছি না। কেন দেখছি না, তা বিশ্লেষণের জন্য বড় পরিসরের আলোচনা দরকার। অল্প কথায় এটুকু বলা যেতে পারে যে, সারা দেশের প্রতিটি ক্ষেত্র ও প্রতিষ্ঠানে যে ক্ষয় শুরু হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও তার বাইরে নয়।

তবু আশার কথা, চার দিকের নানা অবক্ষয়, হতাশা ও রক্ত হিম করে দেওয়া সব খবরের মধ্যে কয়েক দিন আগে একটি ভালো খবর পাওয়া গেল। সেটি হচ্ছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার সাবেক ছয়জন শিক্ষককে ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। যে ছয়জন সাবেক অধ্যাপককে এ সম্মান প্রদান করা হচ্ছে তাঁদের সবাই কর্মবীর, শিক্ষা ও গবেষণায় নিষ্ঠাবান এবং শিক্ষাবিদ হিসেবে অনুসরণীয়। এই অধ্যাপকদের কেউ কেউ সৃজনশীল লেখা ও কর্মকাণ্ডে নিজস্ব মান তৈরি করতে সমর্থ হয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক হতে যাচ্ছেন যে ছয়জন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক তাঁরা হলেনÑইংরেজি বিভাগের সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, আন্তর্জাতিক ব্যবসায় বিভাগের খন্দকার বজলুল হক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের আতিউর রহমান (বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর), ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের নজরুল ইসলাম, চারুকলার অঙ্কন ও চিত্রায়ণ বিভাগের রফিকুন নবী এবং প্রাচ্যকলা বিভাগের হাশেম খান। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক ফোরাম সিন্ডিকেটের সভায় অনুমোদিত হওয়ার পর এ ছয় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষককে ইমেরিটাস অধ্যাপকের মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলে (শিক্ষা পরিষদ) অনুমোদন পেয়েছে।

শিক্ষা কার্যক্রমে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খ্যাতিমান অধ্যাপকদের চাকরির নির্দিষ্ট বয়সসীমা (৬৫ বছর) শেষ হওয়ার পর ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার রীতি আছে। ইমেরিটাস অধ্যাপকের মর্যাদা পাওয়া অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকরা ৭৬ বছর বয়স পর্যন্ত একজন অধ্যাপকের পূর্ণ সুযোগসুবিধা পেয়ে থাকেন। গত তিন দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সাতজন শিক্ষক এ মর্যাদা পেয়েছেন তাঁরা হলেনÑআবদুল জব্বার, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আনিসুজ্জামান, সুলতানা সারওয়াত আরা জামান, নাজমা চৌধুরী, আবদুল মতিন ও একে আজাদ চৌধুরী।

নতুন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক হতে যাওয়া সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বাংলাদেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, কথাসাহিত্যিক ও সাহিত্যসমালোচক। সিলেট মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের পড়াশোনা শেষ করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৮১ সালে কানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে অধ্যাপনার পাশাপাশি নিয়মিত লেখালেখি করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে : থাকা না থাকার গল্প, অন্ধকার ও আলো দেখার গল্প, প্রেম ও প্রার্থনার গল্প, সুখদুঃখের গল্প। উপন্যাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে : দিনরাত্রিগুলি, আজগুবি রাত এবং তিন পর্বের জীবন।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের কথনশৈলী, ভাষা আর গল্পকাঠামোর নতুনত্ব তাঁর রচনাকে পাঠকপ্রিয় করেছে এবং কথাসাহিত্যিক হিসেবে তাঁকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করেন ১৯৯৬ সালে। ১৪১১ বঙ্গাব্দে তাঁর প্রেম ও প্রার্থনার গল্প বইটির জন্য পান ‘প্রথম আলো বর্ষসেরা বই’-এর পুরস্কার। এ বইয়ের জন্য ২০০৬-এ তাঁকে দেওয়া হয় কাগজ সাহিত্য পুরস্কার। কথাসাহিত্যে অবদানের জন্য ২০১১ সালে কথাসাহিত্য কেন্দ্র তাঁকে পুরস্কৃত করে।

ইমেরিটাস অধ্যাপক হতে যাওয়া আরেক গুণী অধ্যাপক হলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান। এই অর্থনীতিবিদ এবং লেখকের জীবন হচ্ছে সংগ্রাম, সাফল্য ও অনুপ্রেরণার। তাঁর নিজের বয়ানে, ‘অজপাড়াগাঁয়ের দরিদ্র পরিবারের এক ছেলে ১৯৬৫ সালে নিজের মেধা আর যোগ্যতায় ভর্তির সুযোগ পেলেন ক্যাডেট কলেজে। কিন্তু গ্রাম ছেড়ে শহরে পড়তে যাওয়ার টাকা নেই। গ্রামের স্কুলের শিক্ষকরা হাটে চাঁদা তুলে জোগাড় করে দিলেন প্রথম তিন মাসের খরচ ১৫০ টাকা।’ তার পরের গল্পটুকু কেবলই অনুপ্রেরণার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পর লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করল ছেলেটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নাম করলেন, গবেষক ও লেখক হিসেবেও খ্যাতি জুটল তাঁর। একসময় নিয়োগ পেলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে।

নিজের জীবনের কথা শিক্ষার্থীদের শোনাতে গিয়ে তিনি বললেন, দারিদ্র্যকে ভয় পেলে চলবে না। দারিদ্র্যের ভয়কে জয় করে এগিয়ে যেতে হবে। আতিউর রহমান বলেন, ‘বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সেদিন যে ১৫০ টাকা জোগাড় করে দিয়েছিলেন, আজ ৭০০ কোটি টাকা দিয়েও তা শোধ হওয়ার নয়। তাই আমি সারা জীবন কাজ করেছি সাধারণ মানুষকে নিয়ে। অর্থের অভাবে যেন কোনো শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে না যায়, সেজন্য আমরা প্রতিটি ব্যাংককে সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে এগিয়ে আসতে বলেছি। এখন অনেক দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থী শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়াশোনা করছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন করে ইমেরিটাস অধ্যাপকের মর্যাদা পেতে যাওয়া খন্দকার বজলুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি, সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য। তিনি বর্তমানে আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক উপকমিটির চেয়ারম্যান। নজরুল ইসলাম একজন শিক্ষাবিদ, ভূগোলবিদ, নগর বিশেষজ্ঞ ও লেখক। রফিকুন নবী একজন খ্যাতিমান চিত্রকর ও কার্টুনিস্ট। হাশেম খান খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী।

যে ছয়জন শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, লেখক, গবেষক, চিত্রকর ও চিত্রশিল্পীকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইমেরিটাস অধ্যাপকের মর্যাদা দিতে যাচ্ছে তাঁদের নিয়ে সারা জাতি গর্ব করতে পারে। এসব নমস্য ব্যক্তিকে সম্মানিত করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষই শুধু সম্মানিত হয়নি, বরং পুরো জাতি সম্মানিত হয়েছে। এই অধ্যাপকদের প্রতি রইল টুপি খোলা অভিবাদন। অভিনন্দন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, সহ-উপাচার্যসহ যেসব শিক্ষক একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় সর্বসম্মতিক্রমে এই গুণী অধ্যাপকদের সম্মানিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। এটি একটি সুন্দর নজির হয়ে থাকল যে, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষা, গবেষণা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত থাকলে অনন্য স্বীকৃতি ও সম্মান পাওয়া যায়। তরুণ শিক্ষকরা এ থেকে অনুপ্রাণিত হবেন-এই প্রত্যাশা মোটেও অমূলক নয়। এই অনুপ্রেরণা নিশ্চয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চার মাঠ আরও উর্বর করবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আরও আলোকিত হোক জ্ঞানচর্চার ক্রমবিকাশের মধ্য দিয়ে।


  • অধ্যাপক, আইন বিভাগ ও পরিচালক, সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা