× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রাজনৈতিক সংকট

বিদেশিদের সহায়তায় সমাধান মিলবে না

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ

প্রকাশ : ০২ আগস্ট ২০২৩ ১৫:৩৭ পিএম

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

রাজনৈতিক সংকট ক্রমেই সহিংসতার দিকে মোড় নিতে শুরু করেছে- দৃশ্যমান পরিস্থিতি যেন তা-ই সাক্ষ্য দিচ্ছে। দেশের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘোষণা করছে।

অনেকের অভিমত, বিরোধী দলের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি ক্ষমতাসীন দলকে চ্যালেঞ্জ জানাতে না পারায় হঠাৎ করেই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সহিংসতা কিংবা পেশিশক্তির ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। আদর্শগত রাজনীতিতে পেশিশক্তির ব্যবহারের কদর্য রূপ অতীতেও দেখা গেছে। দেশের রাজনীতির ইতিহাসে বড় সংঘর্ষ ছাড়া দলগুলো অহিংস কার্যক্রম পরিচালনা করেছে এমন নজির এখনও বেশ কম। তবে নির্বাচন সামনে রেখে অতীতে রাজনৈতিক সংঘাত অনেকবার হলেও বিগত এক দশকে তুলনামূলকভাবে রাজনৈতিক সংঘাত কম হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি বা তৎপরতার অভাবের কথা বলেন অনেকে; যা বিগত কয়েক বছরে দলটি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। মূলত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে না পারার ব্যর্থতা থেকেই এ সংকটের সৃষ্টি। তবে ঐতিহাসিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এবং তুলনামূলক বিচারে এবার এখনও বড় কোনো সংঘর্ষ-সহিংসতা ঘটেনি। কিন্তু সম্প্রতি দুই দলের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির কৌশল পর্যালোচনা করে বড় সংঘাতের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। মূলত আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিএনপি-আওয়ামী লীগের মতপার্থক্য থেকে রাজনৈতিক সংকটের সৃষ্টি। যতদিন দুই দলের মধ্যে নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে তাদের অবস্থানের বিষয়টি আলোচনা কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক পদ্ধতিতে মীমাংসিত না হবে ততদিন পর্যন্ত এ সংকট দূর হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন খুব দূরে নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এখনও অনেক সময় হাতে রয়েছে। তারা এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন শুরু করেছে। এখন বিএনপিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসতে হবে তারা কি দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করবে নাকি নিজেদের দাবি আদায়ের জন্য ভিন্ন রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করবে। এসব সিদ্ধান্তের ফল হয়তো দ্রুতই আমরা দেখতে পাব। বিরোধী দল স্বভাবতই বিভিন্ন কর্মসূচি দিচ্ছে। তাদের এসব কর্মসূচির মাধ্যমে দলটি বুঝতে চাচ্ছে মানুষ তাদের কতটা সমর্থন করছে। বিএনপি এ ক্ষেত্রে কোনো ইতিবাচক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবে কি না তা-ই এখন দেখার বিষয়। তবে আমাদের কাম্য নির্বাচন হোক অংশগ্রহণমূলক।

বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকটে সংঘাত দূর করার একটিই উপায় রয়েছে এবং তা হলো সংলাপ। রাজনীতিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বিশ্লেষকের অনেকেই সংলাপের বিষয়ে জোর দিচ্ছেন। এমনকি বিদেশিরাও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা সাপেক্ষে রাজনৈতিক সংকট সমাধানের তাগিদ দিয়েছেন। কিন্তু বিদেশিদের তাগাদায় অতীতে আমাদের সমস্যার সমাধান হয়নি। আমাদের সমস্যা নিরসনের জন্য আমাদেরই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়েছে। অতীতেও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের আয়োজন করা হয়েছে কিন্তু দলগুলোর মধ্যে আস্থা কিংবা পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বাড়েনি। কারণ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান থেকেই তারা প্রতিপক্ষকে কিছু বিষয়ে সুযোগ দিতে রাজি নয়।

গণতন্ত্রের চর্চা করে এমন পশ্চিমা অনেক দেশের উদাহরণ টেনে আমরা বরাবরই সংলাপের বিষয়ে জোর দিয়ে আসছি। পশ্চিমা দেশগুলোয় নির্বাচনী কাঠামো যেভাবে পরিচালিত হয় তা একটু সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। সেখানে নির্বাচনের ন্যূনতম শর্তÑ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকা। রাজনৈতিক আস্থার মাধ্যমে তারা আইডেন্টিটি পলিটিক্স করতে পারে। পশ্চিমা দেশের দলগুলো নিজেদের এক ধরনের পরিচয় গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।

অন্যদিকে আমাদের দেশের বড় দলগুলোর মধ্যে সাংঘর্ষিক পরিচয়ই বেশি দেখা যায়। আমাদের স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট বা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতপার্থক্য রয়েছে। দেখা যায়, অনেকে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যাযজ্ঞের বিষয় এখনও স্বীকার করে না। আবার শহীদের সংখ্যা নিয়েও অনেকের মতপার্থক্য রয়েছে। শুধু তাই নয়, ২১ ফেব্রুয়ারি কিংবা ১৫ আগস্টের মতো ঘটনা নিয়েও তাদের নিজস্ব দৃষ্টিকোণ রয়েছে। এ মতপার্থক্য ও স্বাধীন রাষ্ট্রের ইতিহাসের প্রতি ভিন্ন দৃষ্টিই রাজনীতিতে আস্থার সংকট বাড়াচ্ছে। রাজনৈতিক সংকটে বিরোধী দলগুলো বিদেশিদের ‘নাক গলানো’র সুযোগ করে দেয়। বিদেশিরা অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয়ে যে বক্তব্য দেয় তা সমস্যার নিরসন না করে বিভাজন বাড়ায়। এ কারণে সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকট সমাধানের প্রত্যাশা কখনও কখনও হয়ে পড়ে কঠিন। সন্দেহ নেই, সংকট নিরসনে জনগণই মুখ্য ভূমিকা পালন করবে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোর মাধ্যমে জনগণের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে জনগণই সব সময় রাজনৈতিক সংকটের সমাধান করেছে। এবারও জনগণই সংকট সমাধানে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে। কিন্তু সেজন্য হয়তো আমাদের নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার অপেক্ষায় থাকতে হবে।

বিদেশিরা এসে আমাদের রাজনীতির সমস্যার সমাধান করবে এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। এ কথা সত্য, রাজনীতিতে স্টেকহোল্ডার হিসেবে বিভিন্ন গোষ্ঠী রয়েছে। তাদের স্বার্থের কথা বিবেচনায় রাজনৈতিক দলগুলো নানা রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করে। কিন্তু এ কৌশল অবলম্বনের ক্ষেত্রে ফিরে ফিরে বিদেশিদের সহযোগিতা চাওয়ার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দলের দৈন্যচিত্রই বারবার ফুটে ওঠে। অতীতে আন্দোলনের নামে জ্বালাও-পোড়াও, সংঘাত-সহিংসতা জননিরাপত্তার জন্য বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এবারও তেমন পরিস্থিতির দিকেই এগিয়ে চলেছে রাজনীতিÑ এ আশঙ্কা অমূলক বলে উড়িয়ে দেওয়ার অবকাশ ক্ষীণ। অতীতে দাবি আদায়ের নামে অপতৎপরতা ও জনজীবন পর্যুদস্ত করার পরও আইনি ব্যবস্থার ফল মেলেনি। এ বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি আমাদের রাজনীতির জন্য মোটেও শুভ নয়। পশ্চিমা বিশ্বের মতো আমরা আইডেন্টিটি পলিটিক্স করতে পারি না। ফলে নির্বাচনে কোনো দল হারলে তারা সর্বস্বই হারায় বলা যায়। এ অবস্থার পরিবর্তন আনা জরুরি। রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব বা রাজনীতিচর্চার বিষয়টি সীমাবদ্ধ গণ্ডিতে আটকে ফেলার মানে নেই।

ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, আদর্শ গণতান্ত্রিক পরিবেশে বাস করে এমন মানুষের সংখ্যা গোটা বিশ্বে ৬ শতাংশেরও কম। ওই সমীক্ষায় এও বলা হয়েছে, প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষই ভুল গণতন্ত্রচর্চা, কর্তৃত্ববাদী, না হয় বিক্ষিপ্ত রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থার অধীনে জীবনযাপন করে। ভুল গণতন্ত্রচর্চার তালিকায় বাংলাদেশের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রও রয়েছে। এমনকি বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতের নামও পাওয়া যাবে এ তালিকায়। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ভুল প্রক্রিয়া কিংবা হাইব্রিড প্রক্রিয়া থাকে। যখন ভুল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া কিংবা হাইব্রিড মডেল গণতন্ত্রচর্চায় থাকে তখন রাতারাতি আদর্শ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে এমনটি আশা করা যায় না। বাংলাদেশে পশ্চিমা রাজনৈতিক অঙ্গনের মতো আইডেন্টিটি পলিটিক্স রাজনৈতিক দলগুলো অনুসরণ করছে বটে কিন্তু তাদের রাজনৈতিক কৌশলে কিছু ভুল রয়েছে। এ সমস্যা সমাধানের জন্য রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ভুলগুলো শনাক্ত করে তা সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে। রাতারাতি দেশে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা যাবে না। বিশেষত আমাদের দেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি বলেই সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সুসংহত রূপ দেখতে পাওয়া যায় না।

গণতন্ত্রে জনগণের ভূমিকাই মুখ্য। তারাই সব শক্তির উৎস। দেখার বিষয়, বিরোধী দলের আন্দোলন ও দাবির প্রতি জনগণের সাড়া কেমন মেলে। এ সাড়া শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক হলে হবে না। দেশব্যাপী তাদের কর্মসূচির গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিও আমলে নিতে হবে। পরিস্থিতি এমন একপর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে যে, শান্তিপ্রিয় মানুষ সব সময় থাকে আতঙ্কগ্রস্ত। রাজনীতির মধ্যে আইডেন্টিটি পলিটিক্স প্রবেশ করে আস্থার যে সংকট তৈরি করেছে তা খতিয়ে দেখা দরকার। কেন এ মতপার্থক্য তা খতিয়ে দেখে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা শুরু করতে হবে। দেশের ইতিহাস ঘিরে যে মতবিরোধ তারও সমাধান করতে হবে। কিছু কিছু মৌলিক বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। রাজনীতিতে আস্থা বাড়ানোর জন্যও আলাদা বিনিয়োগ প্রয়োজন। বিদেশিরা বিভাজন বাড়াচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি মহলের স্বার্থই বেশি প্রাধান্য পায়। আইডেন্টিটি পলিটিক্স রাজনৈতিক দলগুলো গ্রহণ করলেও এর ফলে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান করা কিন্তু সহজ নয়। তাই বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকটে জনগণই সমস্যার সমাধানের চাবিকাঠি। জনগণ যাদের সঙ্গে থাকবে তারাই ক্ষমতায় আসবে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে আমরা দেখছি, আওয়ামী লীগ-বিএনপি দুই দলই দাবি করছে জনগণ তাদের পক্ষে। সেজন্য বিরোধী দলকে জনগণের সমর্থন আদায় করতে হবে। জনগণই সব ক্ষমতার উৎস। রাজনৈতিক দলগুলোও তা জানে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান কতটা স্পষ্ট প্রশ্ন সেখানেই। সংঘাত কিংবা বিদেশিদের সহযোগিতা কোনো সমাধান নয়। এ ক্ষেত্রে জনগণকেই আস্থায় নিতে হবে। জনগণের আস্থা অর্জনের মধ্য দিয়েই সংকট নিরসনের পথ মসৃণ হবে।

  • কূটনীতি বিশ্লেষক ও অধ্যাপক
  • আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা