রাজনৈতিক সংকট
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
প্রকাশ : ৩১ জুলাই ২০২৩ ১৩:৩১ পিএম
অলঙ্করন : জয়ন্ত জন
বিএনপি জোটের
আন্দোলন বেশ দ্রুতগতিতেই গতিপ্রকৃতি পরিবর্তন নেওয়া শুরু করেছে। যারা আন্দোলনের এই
পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করতে কর্মসূচিতে পরিবর্তন আনছেন তাদের নিশ্চয়ই কিছু হিসাবনিকাশ
আছে। মূল লক্ষ্য তাদের একটাই এবং তা হলো শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটিয়ে নিজেদের পরিকল্পনামতো
দেশে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন করানো। তাতে সরকারের কথা নাইবা ধরলাম, কিন্তু রাজনীতি
সচেতন মহল যেসব আশঙ্কার কথা বলছেন তা তাদের বিবেচনায় নেওয়ার কোনো লক্ষ্য নেই। তা তারা
বিবেচনা করবেনÑ এমনটি বোধ হয় তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। বিষয়টি শুধু যে জেদাজেদি তা
নয়, এটি একটি রাজনৈতিক শক্তির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসাধনের বিষয়ও। কেননা পরিস্থিতিটি সৃষ্টির
ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বেশ কিছু দল, জোট ভূমিকা রাখছে। সুতরাং তারা তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি
থেকেই আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।
এ সম্পর্কে যাদের
ধারণা স্পষ্ট, তারা বিষয়টিকে রাজনীতির বিশেষ আদর্শ, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সাধন করার
পরিকল্পনার বিষয় হিসেবেই দেখছেন। সহজসরলভাবে রাজনীতির ময়দানের বিষয়কে দেখা ও বোঝার
মধ্যে অনেক অধরা বিষয় থেকে যায়। বাংলাদেশে এ মুহূর্তে বিএনপিকে সামনে নিয়ে অনেকগুলো
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শক্তি দৃশ্যপটে কিংবা আড়ালে থেকে সমর্থন জোগাচ্ছেÑ এটি অনেকটাই
স্পষ্ট। জামায়াতও এই আন্দোলনের যুগপৎ শরিক দল। আবার আরও কোনো কোনো দল ও গোষ্ঠী নেপথ্যে
কিংবা অদৃশ্যে থেকে এর গতিপ্রকৃতি লক্ষ করে সুযোগসুবিধামতো যুক্ত হওয়ারও অপেক্ষায় আছে।
সুতরাং এসব বিবেচনায় নিয়েই বিএনপি জোটের কর্মসূচি নির্ধারণে দেশ-বিদেশ থেকে যেসব নেতৃত্ব
কিংবা উপদেশদাতা ভূমিকা রাখছেন তারা মোটেও তাদের লক্ষ্যসাধনের কর্মসূচি প্রদানে বেহিসাবি
আচরণ করছেনÑ এমনটি বোধ হয় বলা যাবে না। অন্যদের দৃষ্টিতে যা রাজনৈতিকভাবে বেহিসাবি
বলে বিবেচিত হতে পারে, তাদের দৃষ্টিতে সেই কর্মসূচিরও রয়েছে নানা হিসাবনিকাশ। সুতরাং
বিষয়টিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ এবং ১৪ দলীয় জোটের বিপক্ষ শক্তির
সম্মিলিত আন্দোলনের কর্মসূচি হিসেবে দেখাই রাজনৈতিকভাবে যথার্থ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয়
হতে পারে। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দেশ-জাতির স্বার্থ থাকুক অগ্রভাগে।
আগামী জাতীয় সংসদ
নির্বাচনের সময় খুব বেশি দূরে নয়। আগস্ট মাসটি যে বিরোধী দলের জন্য এই মুহূর্তে রাজনৈতিকভাবে
অনুকূল, তাও নয়। কারণ বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে আগস্ট মাসের সুবিধা তারাই সবচেয়ে
বেশি ভোগ করেছে এবং ভবিষ্যতেও করার ক্ষেত্রে কোনো ব্যত্যয় ঘটবে না বলে ধারণা। কিন্তু
যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকে, তখন এ মাস তাদের জন্য চোখ মুখ বন্ধ করে রাখার বেশি সুযোগ
দেয় না। এ কারণে আগস্ট মাসে চলমান রাজনৈতিক আন্দোলনের গতি ধরে রাখা বিএনপির জন্য কিছুটা
প্রতিকূল হবেÑ এমন হিসাবনিকাশ থেকেই পরিস্থিতিটাকে আন্দোলনময় করে তোলার লক্ষ্য ও বিবেচনা
নিয়ে দলটির নীতিনির্ধারকরা জুলাই মাসে একের পর এক কর্মসূচি প্রদানের মাধ্যমে নিজেদের
শক্তি সঞ্চয় করার উদ্যোগ হয়তো নিয়েছে। গোটা জুলাই মাসেই বিএনপি তাদের ছাত্র, যুব ও
স্বেচ্ছাসেবী তরুণদের দলীয় ব্যানারে সংগঠিত করার আয়োজন করেছে। জামায়াতে ইসলামী, ছাত্র
শিবিরও তাদের যুব সমর্থকদের অপ্রকাশ্যে প্রস্তুত করেছে।
বিএনপি তরুণদের
এবারের আন্দোলনে সবচাইতে সম্মুখ সারিতে দেখতে চায়। তাদের আবেগ, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ এসব
কর্মসূচিতে নাড়া দেওয়ার মাধ্যমে যেভাবে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে, তাতে রাজনৈতিক
নেতৃত্বের হিসাবনিকাশটিকে মোটেও হালকা করে দেখার উপায় নেই। পৃথিবীর ইতিহাসে জাতীয়তাবাদী
আন্দোলনে যেমন আবেগ, দেশপ্রেম এবং রাজনৈতিক স্বপ্নচারিতার বিশেষ নিয়ামক শক্তি হিসেবে
তরুণদের ভূমিকা রাখার অভিজ্ঞতা আছে; একইভাবে ফ্যাসিবাদ, নাৎসিবাদ, উগ্র ধর্মান্ধতার
আবেদনে সাড়া দিয়ে পৃথিবীর অনেক দেশেই তরুণদের একটি অংশ প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক শক্তি
হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বাংলাদেশে রাজনীতির বাস্তবতায় তরুণদের একটি অংশ রাজনীতিবিমুখ।
অন্য একটি অংশ সাম্প্রদায়িকতা, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী, ভারতবিরোধী মানসিকতা এবং নিজেদের
রাজনীতি, রাষ্ট্র ও সমাজজীবনে কোনো না কোনোভাবে প্রতিষ্ঠিত করার চিন্তা থেকে এমন একটি
ধারার কাছে সচেতন বা অবচেতনে সমর্পণ করছে। বিএনপি জোট তাদেরকেই আন্দোলনে সবচাইতে উপযুক্ত
শক্তি হিসেবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়ে আগস্ট মাসে বাঁধভাঙা আন্দোলনের লক্ষ্যে জুলাই
মাসে তারুণ্যের শক্তিকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করেছিল বলে এখন মনে হচ্ছে।
২৭ তারিখে পূর্বনির্ধারিত
সমাবেশ অনুষ্ঠিত না হলেও ২৮ তারিখ তা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে
দলীয় সমর্থিত তরুণরাই সমবেত হয়েছে। নিশ্চয় এর পেছনে দলের ব্যাপক প্রস্তুতি ছিল। সে
কারণে সমাবেশে জনউপস্থিতিও ব্যাপক ঘটেছে। গণমাধ্যম এবং বাইরের ধারণা ছিল সমাবেশ শেষেই
সচরাচর যা ঘটে এর ব্যত্যয় ঘটবে না। অর্থাৎ তরুণ, যুবকরা যার যার গন্তব্যে নতুন কর্মসূচির
কথা শুনে ফেরত চলে যাবে। কিন্তু কৌশলী নেতৃত্ব বিষয়টি গোপন রেখেছিল। তারা সমাবেশে বেশ
আবেগ উদ্দীপিতভাবে তরুণ যুবাদের স্বপ্নকে নাড়া দেওয়ার মতো বক্তৃতা করেছেন, ধন্যবাদ
ও কৃতজ্ঞতাও জানিয়েছেন। পরদিন থেকে জোটের কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য ঢাকায় থাকার কথা
ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু পরদিন মহররমের ছুটি থাকা সত্ত্বেও আকস্মিকভাবে বিএনপির মহাসমাবেশ
থেকে ঢাকার প্রবেশমুখগুলোতে অবস্থান ধর্মঘটে অংশ নেওয়ার জন্য তাদের ঢাকায় থেকে যাওয়ার
আহ্বানও জানানো হয়। ঢাকায় বিএনপির নেতাকর্মী দিয়ে কোনো কর্মসূচি পালন করার ক্ষেত্রে
তেমন সমস্যা হওয়ার কথা ছিল না, যদি সেটি নিতান্তই রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে অবস্থান নেওয়ার
কোনো কর্মসূচি হতো। কিন্তু অবস্থান নেওয়ার কর্মসূচিটি ছিল যান চলাচল বন্ধ করে ১১টা-৪টা
পর্যন্ত রাস্তায় বসে থাকা। এটি নিশ্চয়ই কোনো নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের কর্মসূচি হতে
পারে না।
এর ফলে লাখ লাখ
মানুষ ঢাকা থেকে বাইরে যেতে কিংবা বাইরে থেকে ঢাকায় আসতে পথে যে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে
পড়বেনÑ সেটি বিএনপি নেতারাও জানতেন। এমন কর্মসূচি আগে গোপন রেখে দেওয়ার অর্থ ছিল অবস্থান
ধর্মঘটে ব্যাপকসংখ্যক তরুণের উপস্থিতি নিশ্চিত করা। কারণ এমন অসহনীয় গরমে কোনো বয়স্ক,
অসুস্থ এবং নারীদের অংশগ্রহণে অবস্থান ধর্মঘট এত ঘণ্টা ধরে রাখা সম্ভব নয়। সে কারণেই
আন্দোলনের কর্মসূচি নির্ধারকরা সুচতুরভাবে সারা দেশ থেকে তরুণদের ২৮ তারিখে সমাবেশে
অংশগ্রহণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছিলেন এবং তাদেরই ২৯ তারিখে অবস্থান ধর্মঘটে রেখে দিয়েছিলেন।
এখন মনে হচ্ছে ২৭ তারিখ মহাসমাবেশটি অনুষ্ঠিত হলে গোপন এই কর্মসূচি শুক্র ও শনিবার
কী রূপ ধারণ করেÑ সেই পরীক্ষানিরীক্ষার কোনো হিসাবনিকাশ সিদ্ধান্তগ্রহণকারী নেতৃবৃন্দের
হয়তো ছিল। এ থেকেই হয়তো এই সপ্তাহের কর্মসূচির গতিপ্রকৃতি, ধরন নির্ধারণ করা হতো। আগস্ট
মাসের আগে থেকেই আন্দোলন চাঙ্গা করা গেলে জোটের রাজনীতির বিব্রতকর সময় ঢেকে দেওয়ার
সম্ভাবনা তৈরি হতো। সেক্ষেত্রে আগস্ট মাসেই সরকারের পদচ্যুতির আন্দোলন কিংবা অন্যকিছু
দেখার পরিকল্পনার একটা রূপ হয়তো আমরা দেখতে পেতাম।
বিএনপি এতদিন
যেসব সমাবেশ ও পদযাত্রা করেছিল সেগুলোর একটি সমন্বিত রাজনৈতিক গতিবেগ দেওয়ার জন্যই
২৭ জুলাইয়ের মহাসমাবেশটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। সেটি পুলিশের আইনি অনমনীয় অবস্থানের
কারণে বিএনপি এক দিন পিছিয়ে সবাইকে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল যে, বন্ধের দিন শুক্রবারেই
তারা তা আইন মান্য করে তার পরিবর্তন করেছে। সবাই তা-ই বুঝেছিলেন। কিন্তু শুক্রবারেই
শনিবারের অবস্থান ধর্মঘটের ঘোষণাটি মোটেও আইন মান্য করার রাজনীতি থেকে দেওয়া হয়নি।
বরং আইনকে তোয়াক্কা না করে রাজধানী ঢাকার প্রবেশমুখে পাঁচ ঘণ্টা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ
প্রতিষ্ঠা করার হিসাবটি ছিল। তা প্রতিষ্ঠা করা গেলে বৃহত্তর আন্দোলনে অবস্থান নেওয়ারও
কোনো হিসাবনিকাশ তাৎক্ষণিকভাবেই হয়তো করা হতো। বিএনপির জোটের সঙ্গে অঘোষিত আন্দোলনকারী
দল জামায়াতের তরুণ যুবশক্তি ছাত্র শিবির চট্টগ্রামে তাদের শক্তির জানান দিয়েছে। অন্যত্রও
কিছু কিছু ঝটিকা মিছিল হয়েছে। বিএনপির অন্যতম শরিক জোট ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’ ২৮ তারিখ প্রায়
সমাবেশবিহীন মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করলেও ২৯ তারিখ কোথাও কোনো অবস্থান নিতে পারেনি,
কারণ তাদের সেই যুব সমর্থনও তেমন নেই। অন্যদের কথাও আর তেমন বেশি আলোচিত হয়নি।
প্রশ্ন উঠেছে, ঢাকার প্রবেশমুখে হঠাৎ বিএনপির এই কর্মসূচি কেন? এর একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছি। অনেকেই এর সঙ্গে একমত নাও হতে পারেন। কিন্তু ২৯ তারিখ যে কর্মসূচি তারা পালন করেছে সেটি চরিত্রগতভাবেই অনিয়মতান্ত্রিক, আইনগতভাবে বেআইনি, আইন প্রতিষ্ঠা করতে পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে যেতে হয়েছে। তাতে পুলিশ ও বিএনপির সমাবেশকারীদের মধ্যে সংঘাত হয়েছে, গাড়ি ভাঙচুর, পোড়াপুড়ি হয়েছে। একটি ছোটখাটো রিহার্সাল তো হয়েই গেছে, বেশিও হতে পারত। কিন্তু সেদিন ঢাকার এতগুলো প্রবেশমুখ বন্ধ থাকায় ঢাকা থেকে বের হতে কিংবা ঢাকায় প্রবেশ করতে যে নির্মম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছিল লাখ লাখ মানুষকে, তার কোনো সদুত্তর আছে কি? ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী কিংবা অন্য রোগীদেরও পথে দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকতে হয়েছিল। আওয়ামী লীগের কেউ কেউ বলছেন, বিএনপির কর্মসূচির দিন তাদের কর্মসূচি থাকলে বিএনপি বাড়াবাড়ি করার সাহস পায় না। সেদিন তাদের কর্মসূচি ছিল না, সে কারণেই রাস্তায় অবস্থান ধর্মঘটের নামে ঢাকায় অঘোষিত রিহার্সাল বিএনপির পক্ষে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এই যুক্তি কেউ মানেন, কেউ মানেন না। তবে বিএনপি জোট নিকট ভবিষ্যতে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের গতিপ্রকৃতিকে পরিবর্তন করে অনিয়মতান্ত্রিক পর্বে উত্তরণ ঘটানোর শক্তির যে মহড়া দিয়েছে, তা-ই বোধ হয় ঘটাতে চায়। এটি শুধু শক্তিরই অপচয় নয়, রাষ্ট্র ও রাজনীতিরও অপচয়। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় এখন এসব কর্মসূচিতে জনগণের সমর্থন বা অংশগ্রহণ কেউ আশা করতে পারে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি শুধু দলীয় সমর্থকদেরই বিষয়। বেশিরভাগ মানুষই মনে করে সব পক্ষের অংশগ্রহণে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার পরিবেশ বিরাজ করছে। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার জন্য সরকার ও বিরোধী পক্ষের গঠনমূলক রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। সংঘাত-সহিংসতায় সমাধান আসবে না, বরং তাতে জনভোগান্তি ও রাষ্ট্রীয় ক্ষতির চিত্রই স্ফীত হবে।