যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক
ফরিদ জাকারিয়া
প্রকাশ : ৩১ জুলাই ২০২৩ ১৩:২৮ পিএম
অলঙ্করন : জয়ন্ত জন
চীনের
পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিন গ্যাংয়ের রহস্যময় অন্তর্ধান আমাদের মনে করিয়ে দেয়
যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক শুধু মার্কিন বৈদেশিক নীতি অনুসারে নির্ধারিত হবে না।
বরং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে যা ঘটছে (বিশেষত নির্বাচনী প্রচারণা) তাও এখানে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই প্রভাবক চীনের অগ্রগতিকেও প্রভাবিত করবে যা, এ
মুহূর্তে অন্ধকারাচ্ছন্ন; একই সঙ্গে উদ্বিগ্নেরও। বাইরে থেকে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা
যায়, গত কয়েক দশকে আমরা যা দেখিনি সেই মাওবাদী রাজনীতির দিকে ঝুঁকছে চীন। বিষয়টি
কিনের অদ্ভুত অন্তর্ধানের মাধ্যমে বোঝা সহজ। চীনের বিভিন্ন ওয়েবসাইট এবং
সংবাদমাধ্যমে বলা হচ্ছে, শারীরিক অসুস্থতার কারণে কিন কিছুদিনের জন্য ছুটিতে আছেন।
অন্যদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাফল্য এবং অংশগ্রহণ বিষয়ক সব খবরই মুছে ফেলার কাজ
করছে সংবাদমাধ্যম। ‘অতীতের নিয়ন্ত্রণ যার হাতে তিনিই বর্তমানে দিকনির্দেশনা দেন’Ñ
জর্জ অরওয়েল তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘১৯৮৪’-তে এ চমৎকার বাক্যটি লিখেছিলেন। তার এই
ভবিষ্যদ্বাণীর বাতাবরণেই চীনের অভিজাত রাজনীতির পথ এগিয়ে চলেছে বলে মনে হচ্ছে।
আপাতত চীনের
অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ১৯৮০ সালে ডেন শিয়াওপিংয়ের নেতৃত্বে পুনর্গঠিত চীনের
টেকনোক্র্যাটিক সরকার ধারণা থেকে অনেক দূরে। ওই সময় চীনা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় এক
ধরনের স্ববিরোধিতা স্পষ্ট প্রতিভাত হয়েছিল। তখনকার একনায়কতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা আর
কোথায় এতটা স্পষ্ট বোঝা গিয়েছিল? আজও চীনের নেতার ক্ষমতার সীমা-পরিসীমা নেই। ‘তৃতীয়
বিপ্লব’ (প্রথমটি মাও সে তুং করেন, দ্বিতীয়টি ডেন আর তৃতীয়টি শি জিনপিং) এখন
যথেষ্ট শক্তিশালী। তৃতীয় বিপ্লবকে চীনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ করলে ভুল
হবে। শি নিজের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করেছেন। পাশাপাশি চীনা কমিউনিস্ট পার্টিকে সমাজের
কেন্দ্রস্থলে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু তিনি সারা বিশ্বের কাছে চীনকে আরও শক্তিশালী ও
ইতিবাচক রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন। এর কিছু নেতিবাচক প্রভাব গোটা
বিশ্বেই কিছুটা হলেও পড়েছে। বিশেষত এশিয়ায় চীনের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো শি জিনপিংয়ের
আগ্রাসি নীতিমালা ও পদক্ষেপে ব্যাপক নাড়া খেয়েছে।
মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্রও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারেনি। বাইডেন
প্রশাসন এ ক্ষেত্রে প্রতিবারই চীনের কড়া সমালোচকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। প্রেসিডেন্ট
ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীনা টারিফও তারা ধরে রেখেছে যদিও বিষয়টি বরাবরই ব্যর্থ হয়েছে
(মনে রাখতে হবে, এই টারিফের টাকা মার্কিনিদের দিতে হয়। চীনাদের নয়)। ট্রাম্পকে
অন্তত ১০ বিলিয়ন কৃষককে বিভিন্ন সময়ে ভর্তুকি দিতে হয়েছিল তার এই নীতির কারণে। বেইজিংয়ের
ক্ষেত্রে বৈদেশিক নীতি অনুসরণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো পদক্ষেপই দেখা যায়নি। অথচ
চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বড় অর্থনীতির দেশ, পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র এবং জাতিসংঘ
নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো অধিকার আছে এমন একটি দেশ।
তবে বাইডেন কিছু
কিছু সমস্যার সমাধান করেছেন। বাইডেন প্রশাসনের একাধিক সিনিয়র কর্মকর্তা চীনের
প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে বৈঠক করেছেন। মূলত দুই দেশের কূটনৈতিক
সম্পর্ক জোরদার করার জন্যই এ প্রচেষ্টা। অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন একবার এক
সাক্ষাৎকারে আমায় জানিয়েছিলেন, গোটা বিশ্বই চায় চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের
মধ্যে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে উঠুক। মার্কিন প্রশাসনও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে
নিয়েছে এবং তারা সহযোগিতার ক্ষেত্রে শুধু কয়েকটি উচ্চমানের প্রযুক্তিগত সহায়তা
চীনকে দেবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ছোট উঠোনের বড় বেড়াÑ প্রবাদটিকেই তারা গ্রহণ
করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু নীতিমালা অবশ্য চীনের পছন্দ হবে না এবং চীন এ ব্যাপারে
আগাম সতর্কবার্তাও দিতে শুরু করেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
এখনও একাধিক জায়গায় কাজ করতে পারবে। বাইডেন প্রশাসন যদি সামরিক বনাম সামরিক
পদ্ধতিতে এগোতে চায় তাহলে ট্রাম্পের সময়কার চীনের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা
হয়েছিল সেগুলোর দিকেই যেতে হবে। সেদিকে না গিয়ে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক বাড়ানো জরুরি যাতে
তারা সংকট সমাধানের একাধিক পদক্ষেপ নিতে পারে। বিশেষত তাইওয়ান প্রসঙ্গে ভুল
বোঝাবুঝির জায়গাগুলো তারা শনাক্ত করে সমাধান করতে পারে। তবে বলটা চীনের কোর্টে। গত
তিন দশকে চীনা নীতিমালা গোটা বিশ্বেই নানা বদল এনেছে। দক্ষিণ চীনা সাগরে শি তার
প্রসার নীতির মাধ্যমে সামরিক কার্যক্রম বাড়িয়েছেন তাইওয়ানে। ভারতের সঙ্গে হিমালয়ে
তাদের যুদ্ধ হয়েছে এবং অস্ট্রেলিয়াকে সতর্ক করে দিয়েছে যেন তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে
কোনো মন্তব্য না করে। শুধু তাই নয়, মস্কোকে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়ার ব্যাপারে
তারা অঙ্গীকারবদ্ধ; যদিও রাশিয়া ইউক্রেনের ওপর জোরদখল করছে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের
সমালোচনায়ও তিনি খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছেন না।
কোনো নীতিমালাই শেষ পর্যন্ত কাজে আসছে না। চীনের পাশের দেশগুলো চীনের প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য নানা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বেইজিংয়ের প্রভাব কাটিয়ে সহযোগিতার জন্য তারা অন্য দেশের কাছে সহযোগিতা চাচ্ছে। জাপান, ফিলিপাইন, ভারতের মতো রাষ্ট্রগুলো নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। অধিকাংশ রাষ্ট্রই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করছে। প্রশ্ন হচ্ছে, বেইজিং বদলে যাবে কি না? তাদের একচ্ছত্র সিদ্ধান্ত নেওয়ার এ প্রক্রিয়া আদৌ বদল হবে কি না? অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে কি তারা কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারবে? কিন গ্যাংকে আচমকা তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর উত্তরটা অনুমান করা যেতে পারে। আমরা অন্তত ইতিবাচক উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না।
ওয়াশিংটন পোস্ট
থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত অনুবাদ : আমিরুল আবেদিন