পবিত্র আশুরা
আফতাব চৌধুরী
প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০২৩ ১৫:১৮ পিএম
ধর্মপ্রেম, দেশপ্রেম, মানবপ্রেমের মহান আদর্শে বলীয়ান হয়ে বিশ্বে সর্বপ্রথম গণতন্ত্রে উত্তরণের লক্ষ্যে আত্মদান ও সপরিবার রক্তে রঞ্জিত করার সুমহান শিক্ষা এবং পৃথিবী সৃষ্টি থেকে শুরু করে বহু ঐতিহাসিক সুখদুঃখবিজড়িত অবিস্মরণীয় ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে ম আসে আমাদের মাঝে প্রতি বছর। হিজরি বর্ষ বা আরবি প্রথম মাসকে বলা হয় মহররম। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্যময় ফজিলতের মাস। ধর্মীয় ও সামাজিক কারণে মাহে মহররমের গুরুত্ব অপরিসীম। এ মাসের ১০ তারিখে বহু ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়। ইসলামের ইতিহাসে ১০ মহররমকে ইয়াওমে আশুরা নামকরণ করা হয়েছে। রসুল (সা.) বলেন, মহান আল্লাহ বিশ্ব ধরিত্রী সৃষ্টির সূচনা শুরু করেন ১০ মহররম আর মানবজাতির আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-কে এই ১০ মহররম সৃষ্টি করা হয় এবং দুনিয়ায় নিক্ষেপের দিনটিও ছিল ১০ মহররম। আদম ও হওয়া (আ.) সুদীর্ঘ ৩৫০ বছর পর এ দিনেই আরাফাতের মাঠে প্রথম মিলিত হন। এ দিনেই কেয়ামত বা মহাপ্রলয় সংঘটিত হবে। এ দিনেই সর্বপ্রথম দুনিয়ায় রহমতের বৃষ্টি বর্ষণ হয়। এক কথায় আল্লাহতায়ালা জগতের সব বস্তুসামগ্রী সৃষ্টি করে তাঁর আরশে আজিমে সমাসীন হয়ে প্রভু হিসেবে অভিষিক্ত হন ১০ মহররম বা আশুরার দিনে। এ মাসের গুরুত্ব, তাৎপর্য ও ফজিলতও বহুগুণে বেশি।
মাহে মহররমের গুরুত্ব, তাৎপর্য ও ফজিলত পৃথিবীর সূচনাকাল থেকেই আছে এবং কেয়ামত বা মহাপ্রলয় পর্যন্ত থাকবে। ইসলামের পূর্বাপর এ মাসটি অত্যন্ত সম্মানিত ও মর্যাদাশীল হিসেবে পরিগণিত হয়। আইয়ামে জাহেলিয়ায় আরববাসী এ মাসের গুরুত্ব ও মর্যাদা রক্ষার্থে কোনো প্রকার অন্যায়, অবিচার, জুলুম, অত্যাচার, যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত হতো না। মহান আল্লাহ যে চারটি মাসকে সম্মানিত করেছেন তা হলো জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও সফর। এ চার মাসের মধ্যে মহররম অন্যতম ফজিলতপূর্ণ বরকতময়, যা কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত আছে।
শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র এবং হজরত আলী ও ফাতেমা (রা.)-এর সন্তান হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) গণতন্ত্রের মাধ্যমে এবং ইসলামি ভাবধারায় দেশের শাসনভার গ্রহণ ও পরিচালনার জন্য মারিয়ার ছেলে সৈরাচার এজিদকে বলেন। কিন্তু তিনি বাদশাহপুত্র বাদশাহ হবেন, এই ভাবধারায় জোরপূর্বক মক্কার শাসনভার গ্রহণ করে নেন এবং স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করতে থাকেন। তখন ইমাম হোসাইন (রা.) স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য এজিদ শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে সংগ্রামে লিপ্ত হন। এজিদ বাহিনী সম্মুখসমরে না গিয়ে ষড়যন্ত্র করে কুফা নামক স্থানে আমন্ত্রণ করে রাস্তায় অতর্কিতভাবে আক্রমণ করে এবং কারবালার প্রান্তরে তাদের ঘিরে ফেলে ও পানি বন্ধ করে দেয়। ইমাম হোসাইন (রা.)-এর পরিবারসহ অন্য লোকেরা কাতর হয়ে অনেকেই শত্রুদের হাতে শহীদ হন।
ইমাম হোসাইন (রা.) যুদ্ধ করে পানি সংগ্রহ করে পান করার সময় দেখেন তার স্বজনরা শহীদ হয়ে গেছেন। তখন তিনি স্বজনহারার বেদনায় পানি হাতে নিয়েও আর পান করেননি। স্বৈরাচারের সঙ্গে কোনো ধরনের আপস না করে যুদ্ধ করে শহীদ হন। মহররম মাসের ১০ তারিখ বিশ্বের প্রথম গণতন্ত্রের লক্ষ্যে স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে আপসহীন সংগ্রাম করে আত্মাহুতি দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে কারবালার মরুপ্রান্তর রক্তে রঞ্জিত করে পৃথিবীর মানুষকে যুগান্তকারী অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় পথপ্রদর্শন করে গেছেন ইমাম হোসাইন (রা.)। যে কারণে আশুরার এ দিনটি শোকাবহ হলেও চিরস্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে থাকবে গণতন্ত্রকামী মানুষের মনে।
এ আলোচনার দ্বারা প্রতীয়মান হয়, মাহে মহররমের গুরুত্ব- তাৎপর্য অপরিসীম। সে কারণেই এ মাসটি অধিক মর্যাদাশীল, সম্মানিত ও বরকতময়। শরিয়ত সমর্থিতভাবে এ মাসের যথাযথ মর্যাদা রক্ষা করে তার মূল্যায়ন করা প্রত্যেক মুসলমানের উচিত। মহান আল্লাহ আশুরার দিন ২ হাজার নবী-রসুলকে দুনিয়ায় পাঠান। আবার এই দিনে ২ হাজার নবী-রসুলের দোয়া কবুল করেন। তবে ১০ মহররম তথা আশুরার মূল তাৎপর্য বা আসল হাকিকত হলো ইসলাম-পরবর্তী যুগের হৃদয়বিদায়ক ঘটনা। ৬১ হিজরির ১০ মহররম ইরাকের কুফা নগরীর অদূরে ফোরাত নদীর তীরে ঐতিহাসিক কারবালা প্রান্তরে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা সংঘটিত হয়। তা হলো ইমাম হোসাইন (রা.) সত্যধর্ম ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য আত্মোৎসর্গ করেন।
এ মাসে ধর্মীয় অনুশাসন ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণে বিচার- বিশ্লেষণ করে আশুরা উপলক্ষে যেসব অযৌক্তিক কর্ম হয় তা না করে আশুরার প্রকৃত গুরুত্ব উপলব্ধিপূর্বক ইমাম হোসইন (রা.)-এর ধর্ম ও দেশপ্রেমের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ইবাদত-বন্দেগি করে এবং দেশমাতৃকার প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে দেশের ও দশের কল্যাণার্থে কাজ করি- পবিত্র মহররমে এই হোক আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।