× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রাজনীতি ও নির্বাচন

বলটা আমাদের কোর্টে

ড. বদিউল আলম মজুমদার

প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০২৩ ১২:৪৬ পিএম

অলঙ্করন : জয়ন্ত জন

অলঙ্করন : জয়ন্ত জন

রাজনৈতিক অঙ্গন ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। দেশের রাজনৈতিক দলগুলো পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘোষণার মাধ্যমে সক্রিয় রয়েছে। ২৬ জুলাই প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রধান প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘পাল্টাপাল্টি রণপ্রস্তুতি’। এ রকম শিরোনাম থেকে সহজেই অনুমেয় বিদ্যমান পরিস্থিতি কেমন? সাধারণের শঙ্কার জায়গা কোথায়? দেশের প্রধান দুটি দলের মাঠের রাজনীতিতে পাল্টাপাল্টি অবস্থান থেকে সংঘাতের আশঙ্কা যে সাধারণের মধ্যে অমূলক নয়, তা-ও স্পষ্ট। সম্প্রতি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও প্রধান বিরোধী দল বিএনপি পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের শক্তিমত্তা প্রদর্শন করতে চাইছে। আর এ দুইয়ের অবস্থান থেকেই সাধারণের মাঝে শান্তি বিনষ্টের শঙ্কা তাড়া করছে। সাধারণের মধ্যে এই যে রাজনৈতিক সহিংসতা বাড়ার আশঙ্কা, সেই আশঙ্কা কাজ করছে বিদেশিদের মধ্যেও। ফলে তারাও নানা সময়ে আমাদের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচনসহ নানা বিষয়ে সবক দিচ্ছে।

সত্যিকার অর্থেই বর্তমানের রাজনৈতিক সংকট নিয়ে শান্তিপ্রিয় মানুষমাত্রই উদ্বিগ্ন। মানুষের যাপিত জীবন নির্বাহ, জীবিকা এবং স্বস্তিতে নাগরিক সুবিধা ভোগের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে রাজনৈতিক সংকট। বিদেশিরাও বিভিন্ন সময়ে এ বিষয়ে তাদের শঙ্কার কথা জানাচ্ছে। তাদের এই শঙ্কা প্রকাশের বিষয়টি আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বাস্তবেই কি তাদের এই হস্তক্ষেপ অযাচিত? আমাদের রাজনীতিকদের ভেবে দেখতে হবে বিদেশিদের এই যে নানান সবক দেওয়াÑ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশ, তা কি আসলেই আমাদের জন্য কোনো চাপ? নাকি এর সবই আমাদের নিজেদের ঘর সামলানোর ব্যর্থতা? আমাদের রাজনীতিকদের অদূরদর্শিতা, দায়বদ্ধতাহীনতা? আর আমাদের নির্বাচন নিয়েই বা কেন বিদেশিদের এত আগ্রহ? প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে দেখার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের এ-ও মনে রাখতে হবে, জাতি হিসেবে আমরা বিচ্ছিন্ন বা বিক্ষিপ্তভাবে বিশ্বে অবস্থান করি না। আমরা একটি বিশ্বগ্রামে অবস্থান করি। বিশ্বগ্রামের ধারণা বাংলাদেশকে সারা বিশ্বের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। আমাদের দেশে যা ঘটবে এর প্রভাব বিশ্বের অন্যান্য দেশেও পড়বে।

মনে রাখতে হবে, অনেক উন্নত দেশই আমাদের এখানে বিনিয়োগ করেছে। তা ছাড়া বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নে তারা সহযোগী হিসেবেও কাজ করছে। উদাহরণ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাম বলা যেতে পারে। দেশটি বর্তমানে আমাদের তৈরি পোশাকশিল্পের প্রধান আমদানিকারক। তা ছাড়া রেমিট্যান্সের উৎসের দিক থেকেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সবদিক বিবেচনায় আমাদের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল, জনজীবনে শঙ্কা তৈরি হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সঙ্গত কারণেই চিন্তিত হবে। আমাদের রাজনৈতিক সংকট কিংবা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শঙ্কার একাধিক কারণ থাকতে পারে। রাজনৈতিক সহিংসতার ফলে উৎপাদন ব্যাহত হলে কিংবা অভিবাসী সংখ্যা বাড়লে আমাদের বন্ধু দেশগুলোর জন্যও বাড়তি আশঙ্কার কারণ। অভিবাসী অনেক দেশেই একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ইস্যু। এ ছাড়া পরিস্থিতি চরম অস্থিতিশীল হলে আমাদের তরুণ প্রজন্ম বিপথগামী হয়ে উগ্র পথে পা বাড়াতে পারে, যা বিশ্বের কারও জন্যই মঙ্গলকর হবে না। এসব নানা বিষয় বিবেচনায় আমাদের রাজনীতি নিয়ে পশ্চিমা দেশের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

গণতন্ত্র ও মানবাধিকার কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। বরং এগুলো নিয়ে কিছু সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক রীতিনীতি রয়েছে। মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে যা করণীয় তা কতগুলো চুক্তির মাধ্যমে নির্ধারিত হয় এবং প্রত্যেকটি রাষ্ট্রই তা মেনে নিতে বাধ্য। গণতন্ত্র চর্চাকারী রাষ্ট্র হিসেবে একটি সুষ্ঠু-সুন্দর-অংশগ্রহণমূলক ও অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ। আমাদের সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে।’শুধু সাংবিধানিকভাবেই নয়, আমরা সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক কভেনেন্ট অন সিভিল রাইটসেও স্বাক্ষরকারী দেশ। এসব আন্তর্জাতিক সনদে সুস্পষ্টভাবে নাগরিক অধিকার, গণতন্ত্রচর্চার উপায়, মানবাধিকার এবং সুষ্ঠু নির্বাচন বিষয়ে নানা নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে। এর অর্থ সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আমরা যেমন সাংবিধানিকভাবেই অঙ্গীকারবদ্ধ, তেমনি মানবাধিকার রক্ষার বিষয়েও অঙ্গীকারের অংশীজন। এখন এই আইন এবং ঘোষণা যদি যথাযথভাবে অনুসরণ করা না হয়, সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সত্যিকারের প্রতিনিধি নির্বাচিত না হয়, তাহলে তো স্বাভাবিকভাবেই সংবিধানের মূলনীতির লঙ্ঘন হয়। আন্তর্জাতিক আইন ও ঘোষণা লঙ্ঘিত হয়। অথচ আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণার মূল চেতনার ভিত্তিই হলো জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। আর জনগণের এই আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার অধিকার আদায়ের জন্যই মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা আত্মোৎসর্গ করেন।

সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়েও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ। আমরা স্বাক্ষর করেছি ‘ইন্টারন্যাশনাল কভেনেন্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস’-এ। ইন্টারন্যাশনাল কভেনেন্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটসের ২৫(খ) ধারায় বলা হয়েছে, ‘সময়মতো অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ভোট প্রদান ও প্রার্থিতা হতে হবে সর্বজনীন, সমতার ভিত্তিতে ও গোপন ব্যালটের মারফত, যা ভোটারদের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চয়তার বিধান করে।’ সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে আমাদের ওপর বাধ্যবাধকতা রয়েছে যথাযথভাবে চুক্তি অনুসরণ করার। এখন আমরা যদি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের অবস্থানকে মর্যাদাপূর্ণ করতে চাই, আমাদের সুনাম অক্ষুণ্ন রাখতে চাই, তাহলে আমাদের অবশ্যই স্বাক্ষর করা এসব আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তি যথাযথভাবে মেনে চলতে হবে। এখন এই আইন এবং চুক্তিগুলো যদি যথাযথভাবে অনুসরণের অভাব দেখা দেয়, আন্তরিকতার ঘাটতি দেখা দেয়, বিষয়গুলো যথাযথভাবে প্রতিপালিত হচ্ছে না বলে অভিযোগ ওঠে, তাহলে সেগুলো নিয়ে যে কেউ প্রশ্ন তুলতে এবং সমালোচনাও করতে পারেন। বিদেশিরা আন্তর্জাতিক আইনের অংশ হিসেবে বিভিন্ন বিষয়ে সমালোচনা করলে তা নিয়ে আমাদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ নেই। কিন্তু তারা আমাদের অভ্যন্তরীণ এবং স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে মন্তব্য করলে তা অবশ্যই অনধিকারচর্চা বলে বিবেচিত হবে। এখন বিষয়টি রাজনৈতিক নেতৃত্ব কীভাবে সামলে নেবে, তা দেখার বিষয়। সঠিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব থাকলে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে নিরপেক্ষতা ও আস্থা থাকলে এগুলোকে বড় সমস্যা মনে হবে না।

আন্তর্জাতিক চুক্তি ও আইন অনুসারে, জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার ক্ষমতারোহণ করবে এবং দেশ পরিচালনা করবে। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চার ক্ষেত্রে আমরা আন্তর্জাতিক আইনের নীতিমালা অনুসরণ করছি না বলেই বিভিন্ন সময়ে বিদেশিরা এ বিষয়ে মন্তব্য করছে এবং আমাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাচ্ছে। তাই আমাদের এ বিষয়ে অধিকতর সতর্ক হতে হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা একটু বাড়াবাড়ি করছে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু তাদের অযাচিত বক্তব্য আমাদের অপারগতারই প্রতিফলন। আমাদের দুর্ভাগ্য স্বাধীনতা অর্জনের দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ে আমরা জনগণের সম্মতিতে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা রদবদলের সমস্যার সমাধান করতে পারিনি। গত এক দশকে আমাদের এ অপারগতা আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। এর অধঃপতিত রূপ দেখা গেছে লগি-বৈঠা দিয়ে প্রকাশ্যে পিটিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যার মধ্যে, বাসে পেট্রোলবোমা মেরে সাধারণ মানুষকে খুন করার মধ্যে, ট্রেনের ফিশপ্লেট তুলে রাখার মধ্য দিয়ে। মোহগ্রস্ত রাজনীতি এক্ষেত্রে আমাদের বিবেককে বাধা দেয়নি। ক্ষুদ্র স্বার্থপ্রণোদিত এবং মনুষ্যত্ববিবর্জিত এসব কর্মকাণ্ডে আমরা ভয় পাইনি। আর আমাদের দায়বদ্ধতার এই অভাব এবং রাজনৈতিক অপারগতাই বিদেশিদের কথা বলার সুযোগ করে দিচ্ছে। এ সংকট নিরসনের জন্য রাজনীতির নীতিনির্ধারকদের সংলাপে বসতে হবে। আলোচনা সাপেক্ষে রাজনৈতিক সংকট নিরসনের পথ খুঁজে বের করতে হবে।

আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে দায়িত্বশীল সবার স্বচ্ছ ধারণা থাকলে সংকট মোকাবিলা কঠিন কিছু নয়। বাইরের কারও কথা বা পরামর্শে নয়, সমস্যা আমাদেরই সমাধান করতে হবে। বল আমাদের কোর্টেই রয়েছে। বিদ্যমান সংকট থেকে উত্তরণে রাজনীতিকদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বাড়ানো জরুরি। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণের জন্য যা যা করণীয় তা আলোচনা সাপেক্ষে নির্ধারণ করতে হবে। দেশ-জাতির বৃহৎ স্বার্থেই বের হতে হবে সংকটের বৃত্ত থেকে। রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের অধিকার নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলেরই রয়েছে। কিন্তু কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে যেন জনবিড়ম্বনার সৃষ্টি না হয়, তা নিশ্চিত করার দায়ও তাদেরই। 


  • সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিকÑসুজন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা