উন্নয়ন
ড. আকতার মাহমুদ
প্রকাশ : ২৪ জুলাই ২০২৩ ০১:০৬ এএম
‘আমার গ্রাম
আমার শহর’Ñ
প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামে শহরের মতো সুযোগ-সুবিধা
অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে এমনিতেই দেশের অনেক শহর জঞ্জালে পরিণত হয়েছে। রাজধানী ঢাকায় মেট্রোরেল,
উড়ালসড়ক এমনকি কিছু দিনের মধ্যেই উদ্বোধন হতে চলেছে এক্সপ্রেসওয়েও। এতদসত্ত্বেও শুধু নগর পরিকল্পনার অভাব আমাদের নানাভাবে ভোগাচ্ছে। এমন সময়ে গ্রামীণ অবকাঠামো মজবুত করার জন্য শহরের কিছু বৈশিষ্ট্য সংযোজন করলে শহরের মতোই বেহাল দশা হবে কি না,
এ প্রশ্নও নানা মহলে দেখা দিয়েছে। তা ছাড়া শহরের মতো কিছু বৈশিষ্ট্য যোগ করলে আদৌ গ্রামের বৈশিষ্ট্য থাকবে কি না,
তা নিয়েও অনেকে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনী প্রচারণায় ক্ষমতাসীন দল বেশ গুরুত্ব দিয়েই বলেছিল,
তারা জয়ী হলে নগরের সুবিধা গ্রামে সম্প্রসারিত করবে। ‘আমার গ্রাম
আমার শহর’
নামে এক প্রকল্পের মাধ্যমে নগরের সুবিধা গ্রামে সম্প্রসারিত করার কথা তখন প্রচারিত হয় জোরেশোরে। প্রথমে বুঝতে হবে এ প্রকল্পে তারা মূলত কী করতে চেয়েছে। কেউ কেউ বলছেন,
গ্রামকে শহরের আদলে গড়ে তোলা হবে। বিষয়টি আদতে ভুল। এ প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামকে শহরে রূপান্তর করা হবে না,
এ বিষয়টি প্রথমে আমাদের স্পষ্টভাবে মনে রাখতে হবে। মূলত এ প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ এলাকায় যেসব নাগরিক সুবিধা সম্প্রসারণ জরুরি,
সেগুলোকেই নিশ্চিত করা হবে।
গ্রামীণ এলাকায় নাগরিক সুবিধা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে আবাসনের বিষয়টি এ পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত। তা ছাড়া গ্রামের যোগাযোগব্যবস্থার প্রভূত উন্নতিসাধনও এ প্রকল্পের আরেকটি মুখ্য উদ্দেশ্য। যেসব গ্রাম জনবিচ্ছিন্ন বা যেসব গ্রামীণ এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা তুলনামূলক দুর্বল,
সেসব এলাকায় সুষ্ঠু অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হবে। যোগাযোগকাঠামোর উন্নয়ন নানা পন্থায় করা যেতে পারে। জনপথ,
সড়কপথ কিংবা রেললাইনের মাধ্যমে এ উন্নয়ন করা সম্ভব। বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে। মূলত মাল্টিমডাল পদ্ধতিতে জনবিচ্ছিন্ন গ্রামের মধ্যে যোগাযোগের সমন্বয় করা হবে। তা ছাড়া গ্রামীণ অঞ্চলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি নিয়ন্ত্রিত নয়। এ বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্যও অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তি ছাড়া উন্নয়নের পথ পুরোপুরি রুদ্ধ হয়ে যাবে। তথ্যপ্রযুক্তি সুবিধা নিশ্চিত হলে গ্রামীণ এলাকায়ও মানুষ তাদের কর্মসংস্থান ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা ভোগের সুযোগ পাবে। শুধু তাই নয়,
এখনও গ্রামীণ এলাকার বাজারব্যবস্থা সুসমন্বিত নয়। আর সুসমন্বিত নয় বলেই এসব বাজার অপূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক ধরনের রয়ে গেছে। এ বাজারব্যবস্থাকেও উন্নয়নের আওতায় আনতে হবে। গ্রাম কিংবা শহরÑ
এ দুই অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবাকে গ্রামীণ অঞ্চলে নিয়ে যাওয়া হবে এবং এ সেবাগুলো যেন গ্রামের মানুষ আরও সহজে এবং কম ভোগান্তিতে নিতে পারে তা নিশ্চিত করা হবে।
অর্থাৎ ‘আমার গ্রাম
আমার শহর’ প্রকল্পের মাধ্যমে
যোগাযোগকাঠামোর উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা,
আবাসন সমস্যা নিরসন, তথ্যপ্রযুক্তির নিশ্চয়তা, বাজারব্যবস্থার
সুসমন্বয়,
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা
আরও উন্নতকরণÑ এসব বিষয়
নিশ্চিত করা হবে।
এ সুবিধা নিশ্চিত করতে
হলে একটি বড় আকারের
পরিকল্পনা জরুরি। বলা হচ্ছে, এজন্য
মাস্টারপ্ল্যান করা হবে। মাস্টারপ্ল্যান করার জন্য গ্রামটি যে উপজেলায় রয়েছে ওই উপজেলার সম্পূর্ণ আয়তনকে বিবেচনায় রেখে মাস্টারপ্ল্যান করা হবে। অর্থাৎ মাস্টারপ্ল্যান হবে উপজেলাকে কেন্দ্র করে। এ মাস্টারপ্ল্যান অনুসারে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে কীভাবে সুযোগ-সুবিধা
নিশ্চিত করা যায় তার সঠিক পরিকল্পনা করা হবে। একনেকে এ প্রকল্পের আওতায় ১৫টি গ্রামে পাইলট প্রকল্পের অনুমোদন পাওয়া গেছে। গত দেড়-দুই বছরে
কারিগরি পরিকল্পনার মাধ্যমে যা বোঝা গেছে তার আলোকে এ ১৫টি গ্রামে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।
সারা দেশেই গ্রামের রূপান্তর ঘটে চলেছে। এ রূপান্তরের ফলে কৃষি খাতের মাধ্যম অর্থাৎ জমি অকৃষিজ খাতে রূপান্তরিত হচ্ছে। গ্রামে এখন সড়কব্যবস্থার উন্নতি হচ্ছে এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিল্পপ্রতিষ্ঠান তৈরি হচ্ছে। গ্রামে এখন শহরের আদলেও বাড়ি নির্মিত হচ্ছে। কিন্তু এসব হচ্ছে অপরিকল্পিতভাবে। এ অপরিকল্পনার সবচেয়ে বড় শিকার আবাদি জমি। গবেষণায় দেখা গেছে,
৬৮ হাজার হেক্টর আবাদি জমি অথবা মোট আবাদি জমির ১ শতাংশ প্রতি বছর অকৃষিজ খাতে রূপান্তরিত হচ্ছে। আবাদি জমি কমে যাওয়া ভবিষ্যতে আমাদের খাদ্যসংকট বাড়ানোর শঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এজন্য আমাদের কৃষিভূমি সংরক্ষণে মনোযোগী হতেই হবে। শুধু তাই নয়,
সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য নদী,
পুকুর,
জলাশয়,
খাল ও হাওর। আরও আছে পার্বত্য অঞ্চল ও বনভূমি। জলবায়ু পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাকৃতিকভাবে সংবেদনশীল এ এলাকাগুলো সংরক্ষণ করা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের সংকটকে আমরা যেমন সামাল দিতে চাই তেমনি আমাদের প্রবৃদ্ধির উন্নয়নের চাকাও সচল রাখতে চাই। কৃষি উৎপাদনের পাশাপাশি শিল্প খাতেও উৎপাদন বাড়ানোর দিকে আমরা মনোযোগ বাড়াতে চাচ্ছি। অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান বাড়ানোর দিকেও আমাদের মনোযোগ বাড়তে শুরু করেছে।
অর্থাৎ আমাদের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ঠিক এ কারণেই নীতিনির্ধারক পর্যায় থেকে বলা হচ্ছে,
গ্রামীণ ও উপজেলা পর্যায়েও মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করতে হবে। এ মাস্টারপ্ল্যান কয়েকটি ধাপে করা হবে। ‘আমার গ্রাম
আমার শহর’
প্রকল্পটির মাত্রা হয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ২০৩০ সাল নাগাদ মেয়াদ ধরা হয়েছে। দেশের ৪৯৫টি উপজেলায় এ মাস্টারপ্ল্যান ধাপে ধাপে প্রণয়ন করা হবে। উপজেলা পর্যায়ে মাস্টারপ্ল্যান করার জন্য কয়েকটি পদ্ধতি অবলম্বন করা হবে। এ পদ্ধতি অবলম্বনের মাধ্যমে ৪৯৫টি উপজেলার জন্য মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা সম্ভব হবে। তৈরিকৃত মাস্টারপ্ল্যান অনুসারে গ্রামীণ এলাকায় নাগরিক সেবা ও সুবিধা প্রদান করা হবে। বলে রাখা ভালো,
পাইলট প্রকল্পের জন্য যে ১৫টি গ্রাম নির্বাচন করা হয়েছে তার মধ্যে কিছু গ্রাম বিভাগীয় শহর থেকে যেমন নেওয়া হয়েছে,
তেমনি বিশেষ চিহ্নিত এলাকা থেকেও কিছু গ্রাম নির্বাচন করা হয়েছে। যেমন চরাঞ্চল,
হাওরাঞ্চল ও উপকূলীয় অঞ্চল থেকে বেশ কয়েকটি গ্রাম নির্বাচন করা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করে এ গ্রামগুলো নির্বাচন করা হয়েছে। গ্রাম নির্বাচনের ক্ষেত্রে অন্য কোনো বিবেচনা আনা হয়নি। পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সহজে যাচাই করা যাবে। নির্বাচিত গ্রামে সুযোগ-সুবিধা
নিশ্চিত করার পর আমরা বুঝতে পারব বাস্তবিক পর্যায়ে কতটুকু কাজ করতে পারব এবং এর ফলাফল কেমন হবে। গ্রামের সঙ্গে প্রকল্পের সামঞ্জস্যপূর্ণতা যাচাই করে অন্যান্য গ্রামে প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা যাবে।
‘আমার গ্রাম আমার শহর’ প্রকল্প নিয়ে অনেকের মনে ভিন্নমত থাকতে পারে। অনেকে ভাবতেই পারেন, আচমকা এ প্রকল্পে কোনো বড় পরিবর্তন হবে কি না অথবা গ্রামের স্বকীয়তা নষ্ট হবে কি না। এমন ধারণার কোনো কারণ নেই। এ প্রকল্প সম্পূর্ণভাবে গ্রামের সার্বিক উন্নয়ন ও সেবার মান নিশ্চিত করার জন্য নেওয়া হচ্ছে। ওই গ্রামের স্বতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য অনুসারে গ্রামের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হবে এবং নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে গ্রামের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কিছুই রাখা হবে না। বিশেষত এ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষিজমি সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে। যখন এ প্রকল্পে আবাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে তখন এমনভাবে তা করা হবে যেন তা গুচ্ছ আকারে হয়। অর্থাৎ অল্প জায়গায় একটি সুসমন্বিত আবাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়। গুচ্ছ আকারে আবাসন গড়ে তোলা সম্ভব হলে গ্রামীণ এলাকায় বিভিন্ন সেবা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পথও মসৃণ হবে। গুচ্ছ পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ সংযোগ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, তথ্যপ্রযুক্তিসেবা এমনকি স্বাস্থ্যসেবা দেওয়াও সহজ হবে। অর্থাৎ এ প্রকল্পটি একটি সুসমন্বিত গ্রামীণ অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য নেওয়া হয়েছে। গ্রাম যেন শহরের মতোই। তবে গ্রাম তার স্বকীয়তা ঠিকই বজায় রাখবে। নাগরিক পরিষেবার সম্প্রসারণে গ্রামীণ জীবনে নগর জীবনের ছোঁয়া লাগবে তা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক খবর। এর যথাযথ বাস্তবায়নই কাম্য।