× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্তা আমলে নিন

ড. মো. ইদ্রিস আলম

প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০২৩ ১৩:৩৯ পিএম

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্তা আমলে নিন

বাংলাদেশে শিশু-কিশোরের অনেকের মৃত্যু ঘটে পানিতে ডুবে; যা একটি অবহেলিত জাতীয় সংকট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-এর ২০১৭-এর রিপোর্ট অনুযায়ী বছরে ৩ লাখ ৬০ হাজার লোক পানিতে ডুবে মারা যায়; যার ৯০ শতাংশ নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশসমূহে ঘটে। বৈশ্বিক তথ্যানুযায়ী এক থেকে চার বছরের শিশুরা পানিতে ডুবে সবচেয়ে বেশি মারা যায় এবং দ্বিতীয় ঝুঁকিপূর্ণ বয়স হলো পাঁচ থেকে নয় বছর। হুর তথ্যানুযায়ী, মেয়ে শিশুর চেয়ে ছেলে শিশু পানিতে ডুবে মারা যায় প্রায় দ্বিগুণ। পানিতে মৃত্যু পরিহারযোগ্য তবে পানিতে ডুবে মৃত্যু পরিহারে প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশে অপেক্ষাকৃত কম। বাংলাদশের প্রথম স্বাস্থ্য এবং তথ্য জরিপ (২০১৩) অনুযায়ী, এক থেকে ১৭ বছরের শিশুর অপমৃত্যুর বেশিরভাগ ঘটে পানিতে ডুবে; যা যৌথভাবে নিউমোনিয়া, অপুষ্টি ও কলেরা দ্বারা মৃত্যুর চেয়ে বেশি। বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাস্থ্য ও তথ্য জরিপ (২০১৬) অনুযায়ী, বছরে ১৪ হাজার ৪৩৮ (এক থেকে ১৭ বছর বয়সি) শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ বয়স্কদের তত্ত্বাবধানের অভাব, গ্রামে শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রের অভাব, অতিদারিদ্র্য, পুকুর-জলাধারে নিরাপত্তা বেষ্টনীর অভাব এবং সাঁতার না জানা। বাংলাদেশে প্রায়ই আট থেকে নয় বছরের বাচ্চারা সাঁতার না জানায় পানিতে ডুবে মারা যায়। পুকুর, ডোবা, খাল, বালতি, বাকেট ইত্যাদি জায়গায় বিভিন্ন বয়সি শিশু মারা যায়। এক গবেষণায় জানা যায়, পাঁচ বছর বয়সিদের ৮০ শতাংশ পানিতে ডুবে মৃত্যু ঘটে বসতঘর থেকে ২০ মিটার দূরত্বের মধ্যে পুকুর-জলাশয়ে। বাংলাদেশে একাধিক শিশু বিশেষভাবে জোড়া শিশু একই স্থানে একই সঙ্গে পানিতে ডুবে মারা যেতে দেখা যায়। সাধারণত একটি শিশু অন্য শিশুকে পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার সময় বাঁচাতে গিয়ে একসঙ্গে মারা যায়। এতে বোঝা যায়, শিশুকে পানি থেকে নিরাপত্তা কৌশল বিশেষত নিরাপদ উদ্ধার কৌশল সঠিকভাবে শিক্ষা দেওয়া হয় না।

সচেতনতা ও বয়স্কদের দ্বারা শিশুদের তত্ত্বাবধানের অভাব এবং অবহেলাকে পানিতে ডুবে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়। আমরা কেউই ভাবি না, আমাদের শিশু পানিতে ডুবে মারা যেতে পারে। সঠিক তত্ত্বাবধান ছাড়া কোনো শিশু পানি থেকে নিরাপদ নয়। অনেক সময় মনে করা হয়, বাড়ির বড় ছেলেমেয়েরা শিশুটিকে দেখাশোনা করছে, আশপাশেও অনেক মানুষ তাই মনে করে শিশু পানিতে ডুববে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ভাইবোনের তত্ত্বাবধানে থাকার সময়ও অনেক শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। আবার ধারণা করা হয়, আমার শিশু নিরাপদ, কারণ সে সাঁতার জানে। অথচ বাস্তবতা হলো, শিশুরা পানিতে একা বিপদে পড়ে। সাঁতার শেখানোর সময় যে যেভাবে নির্দেশনা অনুযায়ী সাঁতার কাটে, একা পানিতে পড়ে সে সেভাবে করে না বরং পানি খেতে খেতে ডুবে যায়। অনেক সময় ভাবা হয়, আমার শিশু কোথাও পড়লে আমি জানব। কিন্তু বাস্তবতা হলো পানিতে ডোবা অত্যন্ত নীরব ঘটনা। শিশুরা পানিতে ডোবার সময় কোনো আওয়াজ বা সাহায্য প্রার্থনা করতে পারে না, ফলে নীরবে পানিতে ডুবে মারা যায়। হু (২০১৭) পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু নিবারণে ছয়টি প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে। এগুলো হলোÑ প্রাকস্কুল বয়সি শিশুদের পানি থেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ, পানিতে গমনপথে বেষ্টনী প্রদান, সাঁতার শেখানো এবং পানি থেকে নিরাপত্তা কৌশলে প্রশিক্ষণ প্রদান, বন্যা ও অন্যান্য পানি থেকে সংঘটিত দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা, পানি থেকে শিশুদের নিরাপদে উদ্ধার এবং সিপিআর প্রশিক্ষণ প্রদান, বোট, জাহাজ ও ফেরিতে নিরাপদে যাতায়াতে কার্যকর বিধিব্যবস্থা প্রণয়ন এবং প্রতিষ্ঠাকরণ। উল্লিখিত ছয়টি নিবারণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে হু চারটি কৌশল প্রণয়নের সুপারিশ করে। এগুলো হলোÑ বিভিন্ন সেক্টরের কর্মকাণ্ডে সমন্বিতভাবে পানিতে ডুবে মৃত্যুর কথা বিবেচনা করা এবং কৌশলগত যোগাযোগের মাধ্যমে গণসচেতনতা বৃদ্ধি করা, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং গবেষণার মাধ্যমে পানিতে ডুবে মৃত্যু নিবারণে সৃজনশীল কৌশল প্রণয়ন, জাতীয় নিরাপত্তা নীতি প্রণয়ন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বৈশ্বিক পানিতে ডুবে মৃত্যু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণ করছে। ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে পানিতে ডুবে মৃত্যুসংশ্লিষ্ট মানবিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির দিক উল্লেখ করে নিবারণ কৌশল বাস্তবায়নের জন্য জোর দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার আমন্ত্রণে হু বিশ্বব্যাপী পানিতে ডুবে মৃত্যু বিষয়ে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালনে সম্মত হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৩ সাল থেকে প্রতি বছর ২৫ জুলাই ‘বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু পরিহার দিবস’ পালনের ঘোষণা দিয়েছে। ২০২৩ সালের পানিতে ডুবে মৃত্যু নিবারণ দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো, ‘যে কেউই পানিতে ডুবে যেতে পারে, কারও ডুবে যাওয়াই কাম্য নয়’। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিসংশ্লিষ্ট মৃত্যু মোকাবিলায় দেশব্যাপী বিভিন্ন প্রস্তুতি ও নিবারণমূলক কার্যক্রম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে থাকলেও পানিতে ডুবে মৃত্যু বিষয়ে কার্যক্রম অত্যন্ত অপ্রতুল। সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) ২০০৬ এবং ২০১৩ সময়ে রায়গঞ্জ, শেরপুর ও মনোহরদী উপজেলায় পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করে কমিউনিটি ডে কেয়ার সেন্টার (আঁচল) এবং সাঁতার প্রশিক্ষণকে কম খরচে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু নিবারণের কার্যকর কৌশল হিসেবে চিহ্নিত করে। উপর্যুক্ত দুটি নিবারণ কৌশলের সঙ্গে জনসচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করলে আরও বেশি সুফল পাওয়া সম্ভব। পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যু নিবারণে বাস্তবায়িত আরও একটি প্রকল্পে কোনো এলাকায় একই সঙ্গে বেষ্টনীযুক্ত খেলাঘর এবং শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র বাস্তবায়ন করলে শিশুমৃত্যু নিবারণে ভূমিকা রাখার প্রমাণ পাওয়া যায়। বাংলাদেশ সরকার ২০১১ সালের স্বাস্থ্যনীতিতে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুকেও একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে। শিশু নিরাপত্তায় পাইলট প্রকল্পে পানিতে ডুবে মৃত্যু বিবেচনা করলেও সরকার কর্তৃক বাস্তবায়িত প্রকল্প এখনও সীমিত।

অর্থ সংকট, বাস্তবায়নের সক্ষমতার অভাব এবং অন্যান্য সামাজিক-সাংস্কৃতিক কারণে হু কর্তৃক প্রদানকৃত নিবারণ কৌশলকে দেশব্যাপী বাস্তবায়নে সময়ের প্রয়োজন। এ অবস্থায় ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমের মাধ্যমে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু রোধে ভূমিকা রাখতে পারে। দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে আমরা সবাই শিশুমৃত্যু রোধে ভূমিকা পালন করতে পারি।


  • অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা