পুলিশ
মো. সাখাওয়াত হোসেন
প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০২৩ ১১:২১ এএম
ফ্রান্সে পুলিশের গুলিতে নিহত কিশোর নাহেল এমের মা আলজেরিয়ার বংশোদ্ভূত মোনিয়া বলেছেন, তিনি ছেলেকে ‘সেরা বন্ধু' মনে করতেন। ছেলেই ছিল তার জীবন। তবে অনেকের মতো ঢালাওভাবে তিনি পুরো পুলিশ বাহিনীকে দোষারোপ করেননি। তিনি বলেন, “আমি শুধু একজনকেই দোষারোপ করি, যিনি আমার ছেলের জীবন নিয়েছেন।' গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় এক তল্লাশিচৌকিতে পুলিশের গুলিতে নিহত হয় নাহেল। এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে দেশজুড়ে টানা বিক্ষোভ হয়। প্রায় ২ হাজার বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিক্ষোভ দমাতে দেশে ৪৫ হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পুলিশি নির্যাতনের এ ধরনের ঘটনা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেখা যায়। পুলিশের নিষ্ঠুরতা বা নির্মমতার ইতিহাস বেশ পুরোনো। সারা পৃথিবীতে পুলিশের নিষ্ঠুর আচরণের আলামত পাওয়া যায়। সেসবের পেছনে বর্ণবাদসহ আরও অনেক সাংস্কৃতিক উপাদান থাকে। তবে পুলিশের দায়িত্বশীল আচরণের বাইরে মানবিক পুলিশিংয়ের নমুনাও রয়েছে। করোনার সময় মানবিক পুলিশিং একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তবে এও সত্য, পুলিশের নেতিবাচক আচরণ যেভাবে জনসম্মুখে চলে আসে অন্য বাহিনী কিংবা স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের নেতিবাচক সংবাদ বাইরে তেমনটা আসে না।
পুলিশের বিভাগীয় শাস্তি অত্যন্ত কঠোর। কারণ সরাসরি জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকায় পুলিশের কোনো বিষয়ই লুকিয়ে রাখার সুযোগ নেই। কাঠামোগত দিক বিবেচনায় পুলিশের নৃশংস আচরণের কোনো সুযোগ নেই। পুলিশকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে আইন প্রয়োগ করতে হবে। পুলিশের নৃশংসতা বলতে অতিমাত্রায় বলপ্রয়োগ, বেআইনিভাবে দেহে আঘাত, মৌখিকভাবে আক্রমণ, হুমকি প্রদান ইত্যাদি কর্মকাণ্ডকে বোঝানো হয়। সাধারণত অবৈধভাবে গ্রেপ্তার, ভয় দেখানো, জাতিগত বিদ্বেষ তৈরি, রাজনৈতিকভাবে দমনপীড়ন চালানো, নজরদারি অপব্যবহার, যৌন নির্যাতন ও দুর্নীতি- এ ধরনের নৃশংস আচরণের উদাহরণ দেখা যায়। অতীতে এ কলামেই পুলিশের সাবকালচার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। তখন পুলিশের কোনো কোনো সদস্যের স্বেচ্ছাচারিতা ও নৃশংসতা নিয়ে আলোচনা করেছি।
পুলিশে নৃশংসতার জন্য একটি মহল পুলিশের অস্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়াকে দায়ী করে। কিন্তু এ কথা সত্য, পুলিশের বিভাগীয় শাস্তি অত্যন্ত কঠোর। কারণ সরাসরি জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকায় পুলিশের কোনো বিষয়ই লুকিয়ে রাখার সুযোগ নেই। কাঠামোগত দিক বিবেচনায় পুলিশের নৃশংস আচরণের কোনো সুযোগ নেই আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় স্বচ্ছ হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে কনস্টেবল, সাব-ইন্সপেক্টর ও সার্জেন্ট নিয়োগ নিয়ে অনিয়মের খবর সংবাদমাধ্যমে পাওয়া যায় না। এএসপি নিয়োগে একটি সুনির্দিষ্ট পরীক্ষা পদ্ধতি অনুসরণ করেই প্রার্থীদের কোয়ালিফাই করতে হয়। এএসপি নিয়োগ নিয়ে কোনোকালেই তেমন কথা হয়নি, কথা হয়েছে কনস্টেবল, সাব-ইন্সপেক্টর ও সার্জেন্ট নিয়ে। সমসাময়িক সময়ে পুলিশে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সম্পন্ন হওয়ায় নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের নৃশংসতা তথা নিষ্ঠুরতার একটি সমীকরণিক সম্পর্ক আছে। সেই সম্পর্কের সূত্র ধরে বলা যায়, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতায় নিয়োগপ্রাপ্তদের নৃশংস আচরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। অন্যদিকে এ প্রশ্নও উত্থাপিত হতে পারে, তাহলে পুলিশে নৃশংস আচরণের নমুনায়ন কেন দেখা যায়? এর যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা উপস্থাপন দরকার।
একজন মানুষ পৃথিবীতে যেমন নিষ্পাপ অবস্থায় আসে ঠিক তেমনিভাবে একজন পুলিশ সদস্য দৃপ্তমন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে দেশের মানুষের কল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার শপথে বলীয়ান হয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়েই দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তাহলে কেন একজন পুলিশ সদস্যের মধ্যে নৃশংস আচরণের বহিঃপ্রকাশ লক্ষ করা যায়। একজন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে অফিসের নিয়মকানুন ও অন্যান্য বিধিবিধান সম্পর্কে সিনিয়রদের কাছে অবগত হওয়ার চেষ্টা করেন। অফিসিয়াল ম্যানেজমেন্ট ও পাবলিক সম্পর্ক অনুশীলনের ক্ষেত্রে সিনিয়রদের দেখে শিখন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সদ্য যোগদানকৃত সদস্যরা অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। শুরুতেই কোনো পুলিশ সদস্য জাতিগত ব্যবচ্ছেদ সৃষ্টি করার মতো গর্হিত কাজ করতে পারবেন না। ধাপে ধাপে একটি পর্যায় পার হওয়ার পরই কিন্তু একজন পুলিশ সদস্য নৃশংস হয়ে ওঠেন। আমরা যদি দুর্নীতির কথাই উল্লেখ করি, দেখা যায় দুর্নীতির ব্যাপকতা দুই ধরনের। একটি হচ্ছে গ্রাস ইটারস অর্থাৎ যা-ই পাচ্ছে তা-ই ঘুষ হিসেবে গ্রহণ করছে; যেমন হতে পারে রেস্টুরেন্টে ফ্রিতে দুপুরের খাবার খাওয়া। আরেকটি হচ্ছে মিট ইটারস অর্থাৎ পুলিশের ডিমান্ড অনুযায়ী ঘুষ পরিশোধ করতে হয়; যেমন হতে পারে সরকারি রাস্তায় দোকান পরিচালনায় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে মাসোহারা দিতে হয় দোকানিকে। কাজেই শুরুতেই কেউ কিন্তু গ্রাস ইটারস হয়ে ওঠেন না, পরিবেশ-পরিস্থিতি অবলোকন করে পুলিশ যখন গ্রাস ইটারসদের সংস্পর্শে আসে তখন ধীরে ধীরে নব্য যোগদানকৃত সদস্যও অপকর্মে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। পর্যায় ক্রমে তার চাহিদা বেড়ে যায় এবং তিনি যখন গ্রাস ইটারসে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন এবং বিষয়টিকে স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নেন তখন তার মধ্যে অতিরিক্ত চাহিদার উপযোগিতা তৈরি হয়। ফলে তিনি ধীরে ধীরে গ্রাস ইটারসের ধাপ অতিক্রম করে মিট ইটারসে পরিণত হয়। সে কারণেই বলা চলে, কোনো কোনো পুলিশ সদস্যের নৃশংসতা এক দিনে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। একটি কালচারের মধ্য দিয়ে ডেভেলপ করে পুলিশে অনিয়মের চর্চা গড়ে ওঠে। তবে এ অনিয়মের চর্চা প্রতিহত করার লক্ষ্যে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে ইন্টার্নাল ও এক্সাটার্নাল দায়বদ্ধতার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চাপের কারণে হলেও পুলিশ সদস্যরা নিয়মনীতির মধ্যে থেকে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কাজ করে থাকেন। বিশেষ করে কমিউনিটি পুলিশিং, বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে সমাজের মানুষের তরফ থেকে শৃঙ্খলা পুলিশিংয়ের ব্যাপারে চাপ প্রয়োগ করার সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিত্তিতে এক ধরনের অঘোষিত চাপ সৃষ্টি করা যায়। বিপরীতপাশে পুলিশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার তাগিদে বিভাগীয় নজরদারি ও জবাবদিহিতার অনুশীলন জারি রাখতে হবে। তবে সাম্প্রতিককালে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অনলাইনভিত্তিক ব্যাপক কর্মযজ্ঞ হাতে নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে অনলাইনে জিডি করা যায়, থানার যাবতীয় কার্যক্রম সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে সেন্ট্রালি মনিটর করা হচ্ছে। ৯৯৯ সেবা চালুর পর থেকে সাধারণ মানুষ পুলিশের সার্ভিস পেয়ে তাদের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে।
পুলিশের ট্রেনিং সেন্টারগুলোয় ইথিকাল ইস্যুজের ওপর বিষয়ভিত্তিক কোর্স কারিকুলাম প্রণয়ন করে প্রশিক্ষণ প্রদান করা উচিত। বিশেষ করে নিয়মিত বিরতিতে প্রত্যেক সদস্যকে প্রশিক্ষণের জন্য আহ্বান করতে হবে। পুলিশের কাজের চাপ কমিয়ে কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। আবার এও নিশ্চিত করতে হবে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ নৃশংস কাজের জন্য প্রত্যেককে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। সর্বোপরি জনগণের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে নিয়ে এসে জনবান্ধব পুলিশিংয়ের ধারণা বাস্তবে প্রয়োগের নিমিত্ত আধুনিক ও সৃষ্টিশীল প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত। তবেই দায়িত্বশীল ও মানবিক পুলিশ সদস্যের তালিকা দীর্ঘ হব।