× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রাজনীতি ও নির্বাচন

বিদেশিদের চাপ নয়, জনগণকে গুরুত্ব দিন

ড. ফরিদুল আলম

প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৩ ১৩:৫৩ পিএম

বিদেশিদের চাপ নয়, জনগণকে গুরুত্ব দিন

আমাদের রাজনীতিতে উজরা জেয়া নামটি এখন বেশি আলোচিত। যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন প্রশাসনের এই প্রভাবশালী নেতা ভারত হয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করেন। সংক্ষিপ্ত সফর শেষে ফিরে যাওয়ার আগে তিনি প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ‘বাংলাদেশের মানুষকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিন’। আমাদের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি শক্তিগুলোর তৎপরতা ক্রমেই দৃশ্যমান। আমরা এই তৎপরতাকে বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাই, বিদেশিদের দিক থেকে যতটা না আমাদের রাজনীতি, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, নির্বাচনব্যবস্থা ইত্যাদি নিয়ে আগ্রহ দেখানো হচ্ছে, এর অন্তরালে আসলে কাজ করছে আমাদের নিজেদেরই আস্থা ও বিশ্বাসহীনতা। অন্য কথায় আমাদের আত্মবিশ্বাসের চরম অভাবই বিদেশিদের সুযোগ করে দিচ্ছে রাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জেয়া এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুর বাংলাদেশ সফর ঘিরে আমাদের একশ্রেণির রাজনীতিবিদদের মনে এই প্রত্যাশা ছিল, এর মধ্য দিয়ে সরকারের গদি বোধ হয় নড়বড়ে হবে। তাই সফরটি শেষে আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। তারা আসলে কী বার্তা দিয়ে গেলেন এ নিয়ে যখন বিশ্লেষণ চলছে, এমন অবস্থায় আমরা যদি কিছুটা অতীতের দিকে তাকাই তাহলে দেখব আমাদের রাজনীতি ও দেশ নিয়ে আমাদেরই ভাবতে হয় এবং সব সময় তাই হয়েছে। একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বব্যবস্থায় যেখানে রাজনৈতিক ক্ষমতা এখন নতুন করে এক ধরনের বহু মেরুকেন্দ্রিকতার দিকে ধাবিত হচ্ছে, পিছিয়ে থাকা দেশগুলো নিজেদের সক্ষমতায় ঘুরে দাঁড়ানোর মতো কারিশমা দেখাচ্ছে, সেখানে এ কথা ভাবতে অবাক লাগে, কেন এক বা একাধিক দেশ থেকে প্রতিনিধিরা এসে আমাদের রাজনৈতিক এবং নির্বাচনী ব্যবস্থা সাজিয়ে দেবে। তুমূল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই বিশ্বব্যবস্থায় যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্রই নিজেদের জাতীয় স্বার্থ চরিতার্থকে প্রধান উপজীব্য করছে, সেখানে এ ধরনের ভাবনা শুধু অমূলকই নয়, চরম বোকামিও।

মার্কিন প্রতিনিধিদলের সফর শেষে সার্বিক বিচারে যে বিষয়টি রাজনৈতিক বিশ্লেষণের প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা হলো তাদের একটি বার্তাই নতুন করে দিয়ে যাওয়া। বার্তাটি হলো মানবাধিকার ও গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখতে আগামী দিনে সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য সবাইকে কাজ করতে হবে। এখানে তাদের স্বার্থের জায়গা, এর মাধ্যমে প্রকৃত অর্থে জনগণের ক্ষমতায়নের দিকটি স্পষ্ট হবে। জনগণ যত বেশি নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গায় আসবে, পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার কর্তৃত্ব তত মজবুত হবে। অন্যদিকে জনগণকে আস্থায় না রেখে কোনো ধরনের পরিবর্তন কখনও ফলপ্রসূ হতে পারে না, এটি সর্বক্ষেত্রে প্রমাণিত। উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশে বিএনপিসহ কিছু সমমনা রাজনৈতিক দল বিগত বছরগুলোতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের যে দাবি জানাচ্ছে তা নিয়ে মার্কিন প্রতিনিধিদল এবার কোনো সফরেই কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। সার্বিক বিচারে তাদের দিক থেকে উদ্বেগের যে বিষয়টি উঠে এসেছে, তা হলো সুষ্ঠু ভোটের একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা এবং এর মধ্য দিয়ে জনগণকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া।

উজরা জেয়ার নেতৃত্বে মার্কিন প্রতিনিধিদলের এবারের সফরের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয়, এই সফরে তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ছাড়া রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেছে এবং এর বাইরে দেশের কোনো বিরোধী দলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেনি। সফরের শেষ দিকে তারা প্রতিক্রিয়ায় যা বলেছেন, মোটা দাগে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, আগামী দিনগুলোতে তারা বাংলাদেশকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে পেতে চায়। যেহেতু এ অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান উত্থান ঘটছে, সেটি মোকাবিলায় ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় কৌশল নিয়ে তারা মাঠে নেমেছে। এদিক দিয়ে বাংলাদেশ সফরের আগে তারা ভারত সফর করেছে। ভারতের দিক থেকে বিভিন্ন সময়ে এ অঞ্চলের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে বর্তমান সরকারের সঙ্গে কাজ করে যাওয়ার আগ্রহের বিষয়টি ফুটে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের এক ধরনের উপস্থিতি ক্রমেই লক্ষণীয়। যে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কথা বলা হচ্ছে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অধীনে এটি সম্ভব, বিষয়টি বিদেশি প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে নাকচ করা হয়নি, বরং তাদের পর্যবেক্ষণে নিশ্চিতভাবে যে বিষয়টি ধরা পড়ছে তা হলো নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার ভয়ে বিরোধী দলগুলো, বিশেষ করে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে চলছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নামে যেনতেনভাবে বিএনপি যেন রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হতে পারে, সেটিই দলটির সরকারবিরোধী আন্দোলনের মূল লক্ষ্য। মার্কিন প্রতিনিধিদলের সফর থেকে তাই সরকারকে সেরকমভাবে বিরোধী দলের অনুকূলে কোনোরকম বার্তা দেওয়ার অবকাশ রয়েছে বলে মনে করার কারণ নেই।

উজরা জেয়ার সফরে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয়Ñ এ সফর শেষে সরকারের সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, মার্কিন সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের দূরত্ব অনেকটাই কমেছে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে র‍্যাবের কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞার জবাবে সফরকারী মার্কিন প্রতিনিধি যা বলেছেন, তা হলো এটি একটি পদ্ধতিগত বিষয়, এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দিকটিও নির্ভর করছে নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণের ওপর। তবে এ ক্ষেত্রে যে বিষয়টি মার্কিন প্রতিনিধিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকবে তা হলো গত প্রায় দেড় বছর বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়নি বললেই চলে। অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়গুলোতে বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থা নিয়েও সরকারের দিক থেকে আন্তরিকতার অভাব পরিলক্ষিত হয়নি। এই বিচারে বিরোধী দলগুলো যে দাবিতে সরকারের বিরুদ্ধে অনড় অবস্থানে রয়েছে, সেটি তাদের কাছে খুব একটা যুক্তিগ্রাহ্য হয়েছে, এমনটি ভাবার অবকাশ নেই। বিরোধী দলগুলোর সরকারবিরোধী নানা অপপ্রচারের বিপরীতে মার্কিন সরকারের কাছে তাদের শাসনামলের যে খতিয়ান রয়েছে, সেগুলোও খুব একটা সুখকর নয়। মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদে আকন্ঠ নিমজ্জিত সে সময়ের সরকারের চেহারা আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পেয়েছিল। তাদের হাতে আবারও দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা গেলে বাংলাদেশের চেহারা কেমন হবে, সেটি নিয়ে তারা যতটা না চিন্তিত, নিশ্চিতভাবেই তার চেয়েও বেশি তাদের চিন্তিত করবে পরিবর্তিত এক বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের ভবিষ্যৎ কৌশলগত অংশীদারত্বের দিকটি।

বাংলাদেশের জনগণকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিতে বলেছেন উজরা জেয়া। তার এই বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয় তা হলো বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সত্যিকার অর্থে জনগণের সে রকম সম্পৃক্ততা নেই। আমরা যদি আমাদের অতীত রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করি তাহলে দেখব, দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক পরিবর্তনে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ব্যতিরেকে সেগুলো সফল হয়নি। এ ধরনের কোনো ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে বিদেশি শক্তি এসে আমাদের ভাগ্যকে পরিবর্তন করতে পেরেছে। বর্তমান বাস্তবতায় সে জন্য বলতে হয়, আওয়ামী লীগ সরকার যদি রাষ্ট্রক্ষমতা আঁকড়ে রাখতে চায় তাহলেও বাইরের শক্তির সে ক্ষমতা নেই। তাহলে যা দাঁড়াল তা হচ্ছে একদিকে বিদেশি শক্তির তৎপরতা এবং অন্যদিকে সরকারকে হটিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে সফল করে বিরোধী দলের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়াÑ এ দুটি বিষয়ই আপাতত দিবাস্বপ্ন।

মার্কিন প্রতিনিধিদলের সফরের মধ্যেই শুরু হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলের সফর। তারা দুই সপ্তাহের সফরে সরকারি ও বিরোধী দলের বাইরেও সুশীল সমাজ এবং অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। ইতোমধ্যে তারা সরকারি দল এবং বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় পার্টির সঙ্গে এক দফা বৈঠক সেরেছেন। সরকারের পক্ষ থেকে সংবিধানের আওতায় আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে তাদের আশ্বাসের বিপরীতে অপরাপর দলগুলো, বিশেষ করে বিএনপির পক্ষ থেকে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান ছাড়া আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখানেও মার্কিন প্রতিনিধিদলের মত তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে আগামী দিনে বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্ভব কি না সেটির ওপর নির্ভর করছে তারা আগামী নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠাবে কি না। তাদের দৃষ্টিতেও নিশ্চিতভাবেই বিরোধী দলের দাবির সপক্ষ্যে কতটুকু জনমত রয়েছে সেটি নিশ্চয়ই পর্যালোচনায় আসছে। এখন এই একটি দাবিতে যদি বিএনপি নির্বাচন বর্জন করার সিদ্ধান্তে অটল থাকে, তাহলে প্রতিনিধিদলের দিক থেকে যে বিষয়টি পরামর্শ হিসেবে থাকতে পারে তা হলো সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান। এখানেও বিপত্তি হচ্ছে সরকারি দল এবং বিএনপিদলীয় সরকার এবং নির্দলীয় সরকারের অধীনে দাবির প্রতি অটল থাকা। এ ক্ষেত্রে তারা সংলাপের সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করে না দিলেও কার্যত সংলাপের কোনো পরিবেশ আদৌ সৃষ্টি হবে কি না সেটি নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। সবকিছু নির্ভর করছে আন্দোলনে জনগণ কতটুকু সম্পৃক্ত, তার ওপর। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, মাঠে-ময়দানে নেমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কোনো আগ্রহ মানুষের মধ্যে নেই, তবে আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হোকÑ এটিই সবার প্রত্যাশা। বিদেশিদেরও এর বাইরে গিয়ে অন্য কিছু ভাবার কোনো অবকাশ নেই।


  • কূটনৈতিক ‍বিশ্লেষক ও অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা