ইতিহাস-ঐতিহ্য
সোমদিপ সেন
প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৩ ১৩:৫১ পিএম
ফিলিস্তিনের অধিবাসীদের অস্তিত্ব মুছে
ফেলা ইসরায়েলের একটি বড় লক্ষ্য। ১৯৪৮ সালে ‘নাকবা’র সময় ব্যবস্থাগত সামরিক
অভিযানের মাধ্যমে ফিলিস্তিনের মানুষকে উৎখাত করা হয়। পরবর্তীতে অনেকেই ওয়েস্ট
ব্যাংকে আশ্রয় নেয় এবং এখনও সেখানে তাদের ইসরায়েলের অত্যাচার সহ্য করতে হচ্ছে। তবে
ফিলিস্তিনের অধিবাসীদের অস্তিত্ব মোছার বিষয়টি শুধু বাহ্যিক বিষয় নয়। তাদের অতীত
মুছে ফেলার মাধ্যমেও তা করা সম্ভব। এক্ষেত্রে ইসরায়েলের জাদুঘর একটি বড় অবদান রাখে
এক ধরনের ঔপনিবেশিক পদক্ষেপের মাধ্যমে। ২০১৫ সালে হিব্রু ইউনিভার্সিটি অব
জেরুজালেমে গবেষণা করার সময় তা বুঝতে পেরেছিলাম।
ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আজ
প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মাধ্যমে ইহুদি সম্প্রদায়ের ইতিহাস জানতে পারে। মূলত এই
অঞ্চলের ইসরায়েলি চিহ্ন দেখাতেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা জানতেই পারে
না, তারা এই অঞ্চলের অধিকাংশ ভূমি দখল করে রেখেছে। ডেভিড জাদুঘরের পরিস্থিতিও
অনেকটা একই। অভিযোগ আছে জাদুঘরটি অনেকদিন ধরেই ইসলামি এবং ফিলিস্তিনিদের ঐতিহ্য
বদলে কাজ করছে। এই অংশটি ইসরায়েলের দখলে আসার পর মসজিদে নামাজ পড়তে দেওয়া হয় না।
এমনকি সেখানের অনেক কিছুই তারা সরিয়ে ফেলে শুধু ইসরায়েলের স্মারক প্রতিষ্ঠার জন্য।
যদিও বলা হচ্ছে, সামাজিক দূরত্ব নিরসনের জন্য এমনটি করা হচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো,
তারা কিছু বিষয় লুকিয়ে রাখছে। এই জাদুঘরটি মূলত এক সময় ফিলিস্তিনের বারকামি
পরিবারের বাসভবন ছিল। ‘নাকবা’র সময় তাদের ওই অঞ্চল ত্যাগ করতে হয়। জাদুঘরটি ইসরায়েল
রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ইহুদি প্যারামিলিটারি সংস্থার উৎপত্তি যেভাবে প্রচার করে, তাও ফিলিস্তিনের
অস্তিত্ব বিলোপের ক্ষেত্রে প্রভাব রাখে। জাফফা, হাইফা, একর এবং টিবেরিয়াসে এই
সংস্থাগুলো ব্যাপক সহিংসতা চালায়।
২০১৩ সালে তেলআবিবের পালমাখ জাদুঘরে যখন যাই, তখনও দেখেছি মুছে ফেলার এই রাজনীতি চলমান। সেখানে তরুণ প্রজন্মের জানার জন্য ইসরায়েলের এই সংস্থাগুলোকে স্বাধীনতার অগ্রদূত হিসেবে অভিহিত করে কিছু ফিল্ম দেখানো হয়। ফিলিস্তিনিদের সেখানে ‘আরব’ বলে উল্লেখ করা হয়। আরববিশ্বে এভাবেই একটি সম্পূর্ণ জাতিকে পুরোপুরি অস্তিত্বহীন করে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে। যদিও ফিলিস্তিনিদের উল্লেখ সেখানে ছিল, তবু তাদের পরিচিত করানো হয় সংখ্যালঘু হিসেবেই। কিন্তু ফিলিস্তিনি হিসেবে এই উল্লেখ থাকলেও একাধিকবার আরব বলেই তাদের অভিহিত করা হয়। ফিল্মে ফিলিস্তিনের যোদ্ধাদের সহিংস আরব জঙ্গিও বলা হয়। এই ফিল্মে ফিলিস্তিন শরণার্থী সমস্যাও এমনভাবে দেখানো হয় যা অমানবিক। ফিল্মের একটি চরিত্র বলে, ‘এত শরণার্থী আমরা কী করব?’ অন্য এক চরিত্র উত্তর দেয়, ‘তোমার কী মনে হয় এখন কি করা উচিত?’ বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন তারা জানেই না এই শরণার্থী সমস্যার উৎপত্তি কোথায়।
২০১৫ সালে তেলআবিবে হাগানাহ জাদুঘর ভ্রমণের সময় এমনই আরেকটি ঘটনার সঙ্গে পরিচয় হয়। ১৯৩৬-৩৯ সালে ব্রিটিশ ম্যান্টেডের বিরুদ্ধে মহাবিপ্লব এবারের প্রেক্ষাপট। ইতিহাসবিদ রোজমেরি সাই এই বিপ্লবকে ফিলিস্তিনের কৃষকদের বিপ্লব বলে আখ্যায়িত করেন। ওই প্রদর্শনীতে এই বিপ্লবের মাহাত্ম্য সম্পর্কে কিছুই বলা হয় না। ফিলিস্তিনের মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকেও তারা স্বীকৃতি দেয় না। বরং এই মহাবিপ্লবকে তারা ‘দাঙ্গা’ এবং ‘অহেতুক রক্তপাত’ বলে উল্লেখ করে। এই বিপ্লব পরিচালনার অগ্রভাগে থাকা আরব ব্রিটিশ এবং ইহুদিদের লক্ষ্য করেছিল বলা হয়। যারা ওই প্রদর্শনীতে ছিলেন তারা বের হওয়ার সময় কেমন অনুভূতি নিয়ে বের হয়েছিলেন? এই বিপ্লব যে ইহুদিদের ওপর নির্যাতনের জন্য করা হয়েছিল তাদের মনে তা স্পষ্ট এবং এই বিপ্লবের পেছনে কোনো যৌক্তিক কারণই থাকতে পারে না, অন্তত এটাও তাদের বিশ্বাস হয়ে ওঠে।
ঔপনিবেশিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যম
হিসেবে জাদুঘর বহুদিন ধরেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ইতিহাসবিদ রবার্ট আলড্রিকের মতে,
‘সাম্রাজ্য এবং জাদুঘর হাতে হাত রেখে চলে।’ ফল, উদ্ভিদের নিদর্শন, বিভিন্ন মূর্তি,
মূল্যবান ধাতু, মমি এবং হাড় প্রদর্শনের মাধ্যমে দূরাগত দেশের প্রাচীনত্ব
প্রদর্শনের সুযোগ পাওয়া যায়। এর মধ্যে হেজেমনিক এবং নাগরিক বর্ণনাও লুকিয়ে থাকে। ১৮৯৮
সালে ব্রাসেলসে রয়াল মিউজিয়াম অব সেন্ট্রাল আফ্রিকা প্রতিষ্ঠা করেন দ্বিতীয়
লেওপোল্ড। মূলত বেলজিয়ামের কঙ্গোতে ‘সভ্যকরণ প্রক্রিয়া’ প্রদর্শনের নিদর্শন
দেখাতেই এই জাদুঘর গড়ে তোলা হয়। সেখানে তিনি বেলজিয়ামকে সভ্য জাতি হিসেবে
প্রতিষ্ঠা করেন এবং কঙ্গোর জাতিগোষ্ঠীকে অসভ্য ও বর্বর হিসেবে চিহ্নিত করেন। লন্ডনের
ব্রিটিশ মিউজিয়াম ইন ব্লুমসবেরি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা এবং জাদুঘর প্রতিষ্ঠার আঁতাত
ভালোভাবেই দেখিয়ে দেয়। এই জাদুঘরে একটি বিষয় স্পষ্টÑপৃথিবীর যে প্রান্তই হোক,
ব্রিটিশদের ক্ষমতার কোনো শেষ নেই।
ফিলিস্তিনের অধিবাসীদের ওপর সামরিক
নির্যাতন ক্রমেই বাড়ছে। এই নৃশংসতার পাশে জাদুঘর নিয়ে আলোচনা অনেকের কাছেই মনে হবে
ঠিক মানানসই নয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ইতিহাস ও ঐতিহ্যকেও অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার
করা যেতে পারে। এ জন্য ইসরায়েলের এই সহিংসতা ও আগ্রাসন বন্ধে ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে
রসদ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক জাদুঘরে ফিলিস্তিনের ইতিহাস
প্রদর্শনের উদ্যোগ নেওয়া শুরু হয়েছে। ফলে ২০২২ সালে ১৩২ জন মানুষের উপস্থিতি
থাকলেও ২০২৩ সালে অংশগ্রহণের পরিমাণ ২৭৭ জনে চলে আসে। ফিলিস্তিনের প্রতি মানুষের
সহমর্মিতা বাড়ছে তা বোঝা কঠিন নয়। ২০১৬ সালে বিরজেইতে ফিলিস্তিন জাদুঘর প্রতিষ্ঠা
করা হয়। সেখানে প্রথমে ‘জেরুজালেমে জীবন’ নামে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন হয়। ওই প্রদর্শনীতে
ইসরায়েলি সেনা হামলার নৃশংসতা এবং ফিলিস্তিনের মানুষদের বাস্ত্যুচ্যুত করার
প্রক্রিয়াটি দেখানো হয়। পবিত্র ভূমিতে অস্ত্রের মাধ্যমে ঐতিহাসিক বর্ণনা এবং
ঐতিহ্যকে মুছে ফেলার একটি প্রক্রিয়া চলমান। কিন্তু ফিলিস্তিনও তার ঐতিহ্য নিয়ে
লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। তারা খুব জোর গলায় বলছে, ‘আমরা আছি এবং আমাদের অস্তিত্ব
এখানেই।’
আলজাজিরা থেকে ঈষৎ
সংক্ষেপিত
অনুবাদ : আমিরুল
আবেদিন