সম্পাদকীয়
সম্পাদক
প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৩ ০৫:৪৯ এএম
অলঙ্করন : প্রবা
ডেঙ্গু এবার জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে, এই বার্তা জনস্বাস্থ্যবিদদের কাছ থেকে আগেই পাওয়া গিয়েছিল। ‘ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার বাংলাদেশে বেশি' শিরোনামে ১৫ জুলাই প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে যে তথ্য উঠে এসেছে তা উৎকণ্ঠার পারদ আরও ঊর্ধ্বমুখী করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুহারে বাংলাদেশের যে অবস্থান এর পেছনে ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি অন্যতম কারণ। এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই বলেছিলাম, পরিকল্পিত ও সুসমন্বিত কার্যক্রম ছাড়া বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ দুরূহ। আমরা জানি, অতীতে যখন বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছিল তখন থেকেই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণের কথা বলে আসছেন। কিন্তু রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মোতাবেক ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ‘ডেঙ্গু একটি ভাইরাল ইনফেকশন। ডেঙ্গু সংক্রমিত মশার কামড়ে ডেঙ্গু ভাইরাস মানবদেহে সংক্রমিত হয়।' কীটতত্ত্ববিদদের মতে, “এডিস মশা কামড়ালেই যে কারও ডেঙ্গু হবে এমন কোনো কথা নেই। বরং যে এডিস মশার ভেতর ডেঙ্গু ভাইরাস রয়েছে শুধু সে মশা কামড়ালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।' আমরা দেখছি, দায়িত্বশীলদের আলোচনা- পর্যালোচনা শুধু এডিস মশা মেরে, মশা নিধনে লার্ভা ধ্বংসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম। কিন্তু এর পাশাপাশি ভাইরাসের প্রতিও মনোযোগ বাড়ানো যে গুরুত্বপূর্ণ তা আমলেই নেওয়া হয়নি। আমাদের এখানে এডিস অথচ সুষ্ঠুভাবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনার জন্য এর ভাইরাস নিয়েও কাজ করা অত্যন্ত জরুরি। একটা সময় ডেঙ্গু শুধু রাজধানী ঢাকার সমস্যা ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে ঢাকার বাইরেও ডেঙ্গু রোগীর সন্ধান মিলেছে এবং এ বছর তা আরও অনেক বেশি। সংবাদমাধ্যমেই জানা গেছে, সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু। জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ হুমকির কারণ ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ দৃষ্টির বিরূপ ফল বহুমুখী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমতাবস্থায় আমরা মনে করি, কার্যকরভাবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সর্বাগ্রে ব্যবস্থাপনার গলদ সারানো ছাড়া বিকল্প নেই।
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির হার ক্রমাগত বাড়ছে। ১৫ জুলাই প্রতিদিনের বাংলাদেশ- এর ভিন্ন একটি সচিত্র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই ঢাকায় হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরেও স্বজনরা চিকিৎসার জন্য রোগীকে ভর্তি করতে পারছেন না। ঢাকার বাইরের চিত্রও প্রায় একই রকম। আরও বিস্ময়কর হলো, সরকারির চেয়ে বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু চিকিৎসার খরচ প্রায় পাঁচগুণ বেশি। সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গুর চিকিৎসায় জনপ্রতি খরচ যেখানে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা, সেখানে বেসরকারি হাসপাতালে তা লাখ টাকার ওপরে। প্রশ্ন হচ্ছে, একই রোগের চিকিৎসা খরচে এত বড় ব্যবধানের কারণ কী। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের নজর এড়িয়ে সংকটকে পুঁজি করে এই বাণিজ্য চলছে কীভাবে? আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, বিগত করোনা দুর্যোগেও চিকিৎসার ব্যয়ভারের ক্ষেত্রে একই রকম চিত্র দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল। চিকিৎসা খরচের এই লাগামহীনতার দায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ দায়িত্বশীল কোনো প্রতিষ্ঠানই এড়াতে পারে না। একদিকে এডিস মশার উৎস নির্মূলে ব্যর্থতা, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি, অন্যদিকে চিকিৎসা খরচের ব্যয়ভার সাধারণ মানুষকে বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সব পক্ষকে জবাবদিহির পাশাপাশি চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার নৈরাজ্য বন্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া বাঞ্ছনীয়। সংকটকে পুঁজি করে নিজেদের পকেট ভারী করার পাঁয়তারার অপপ্রবণতা নতুন কিছু নয় এবং এ ব্যাপারে বিভিন্ন মহল থেকে বারবার কথা উঠলেও এ যেন এক প্রতিকারহীন ব্যাধি হিসেবে জিইয়ে আছে। এমনটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
এডিস মশার প্রজননের উৎসস্থল নির্মূলের পাশাপাশি ভাইরাসের প্রতিকারের প্রতিবিধান নিশ্চিত করার দায় যাদের, তাদের তাদূরদর্শিতাও সমভাবে পরিস্থিতি জটিল করে তুলছে। জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় সমন্বয়হীনতা দূর করার পাশাপাশি ভাইরাস ম্যানেজমেন্টে পিছিয়ে থাকা এবং গবেষণা কম হওয়ার উপসর্গগুলোর দিকে আশু নজর দিয়ে কাজের কাজ করতে হবে সময়ক্ষেপণ না করে। শুধু মশক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনার দিকেই নজর সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, ভাইরাস ব্যবস্থাপনার দিকেও দৃষ্টি গভীর করা জরুরি। একই সঙ্গে চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তি সহজলভ্য করতেই হবে।