বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য
ঐশ্বর্য্য সংযুক্তা রয় প্রমা
প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৩ ০৫:৪০ এএম
অলঙ্করন : জয়ন্ত জন
দক্ষিণ এশিয়ার দুই গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশ-ভারত ডলারের পরিবর্তে রুপিতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য শুরু করেছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের এই নতুন যুগে প্রবেশ নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। ভারতের সঙ্গে ১৯তম দেশ হিসেবে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের মাধ্যম হিসেবে রুপি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। এর আগে রাশিয়া, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, শ্রীলঙ্কা, মালেয়শিয়া, ওমান, নিউজিল্যান্ডসহ মোট ১৮টি দেশ রুপিতে বাণিজ্য শুরু করেছে। ২৯ মার্চ ভারত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতি প্রণয়নের মাধ্যমে যে রাষ্ট্রগুলো ডলার সংকটে ভুগছে তাদের সঙ্গে বাণিজ্যের পথ সহজ করে। ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সুসমন্বিত রাখতে বাংলাদেশের সোনালি ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংক বাংলাদেশকে ভারতের স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া ও আইসিআইসিআই ব্যাংকের সঙ্গে নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে হবে। নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট মূলত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পন্ন করার জন্য ব্যবহৃত হয়।
ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্যিক সম্পর্কে রুপির ব্যবহার দুই দেশের জন্যই অর্থনৈতিক উন্নয়ন বয়ে আনবে। বিশেষত দুই দেশে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার হবে বলেই প্রত্যাশা। ২০২১-২২ সালে বাংলাদেশ থেকে ভারতে প্রায় দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ পণ্য রপ্তানি হয়। তা ছাড়া ভারত থেকে বাংলাদেশ প্রায় ১৩ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের পণ্য আমদানি করে। যেহেতু ডলারের মাধ্যমে লেনদেন করতে হচ্ছে না, তাই উভয় দেশই অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে। অধিকাংশ বাণিজ্যই যেহেতু রুপিতে হবে আর রপ্তানি ডলারে হবে, তাই অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও এখানে কম নয়। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ডলার সংকট ক্রমেই গাঢ় হচ্ছে। আমদানিনির্ভরতা বাড়ায় রিজার্ভে ডলার সংকট বাড়ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে দেশটির রিজার্ভের পরিমাণ ৩৪ শতাংশ কমেছে। চলতি বছরের মে মাসে মার্কিন মুদ্রার বিপরীতে টাকার মূল্যমান ১৬ শতাংশ কমেছে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বাধ্য হয়েই মুদ্রা তারল্য বজায় রাখার জন্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে অর্থ নিতে হয়। ডলার সংকটের বিষয়টি মাথায় রেখে বাংলাদেশকে বাণিজ্যিক লেনদেনের ক্ষেত্রে কৌশলী হতেই হবে। সম্ভবত এ জন্যই বিনিময়ের জন্য ডলারকে এড়িয়ে যাওয়ার চুক্তিতে তাদের অংশ নিতে হয়েছে। অর্থাৎ এই চুক্তির মাধ্যমে দেশটির রিজার্ভে দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ হওয়ার শঙ্কা কমছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারত ডলারকে এড়িয়ে চলার নীতিতে সম্প্রতি উদ্যোগী হয়ে ওঠে। দেশটির অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও আয় বাড়ানোর জন্যই শক্তি উৎপাদনকারী পণ্য এবং কাঁচামাল রপ্তানি করতে হয়। ফলে বিভিন্ন সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি দেখা দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের মুদ্রানীতি ভারতের ডলার সংগ্রহে বাড়তি চাপ তৈরি করে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ঠিক রাখার জন্য দেশটিকে ভিন্নপথ নিতেই হতো। ২০২২ সালে তারা সর্বপ্রথম রুপিতে বাণিজ্যের পদ্ধতি চালু করে। যেসব দেশে ডলার সংকট রয়েছে, সেসব দেশের সঙ্গে রুপিতে বাণিজ্য শুরু করে। ভারত-শ্রীলঙ্কার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ক্রমেই গতিশীল হতে শুরু করেছে। যদিও এই বাণিজ্যের কৌশলগত দিক নিয়ে বহু আলোচনা- সমালোচনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার মূলত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বাড়তে শুরু করেছে। মূলত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো ডলারনির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের আঞ্চলিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য এই পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। এর ফলে বাজারে বিনিময়মূল্যের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ-ভারত রুপিতে বাণিজ্য সম্পন্ন করবে। ফলে ডলারের ওপর দ্রব্যমূল্যের দামের ওপর নির্ভরতা কমছে। তা ছাড়া ডলারের আধিপত্য কমানোর ক্ষেত্রে ভারত, বাংলাদেশ, চীন ও রাশিয়ার মধ্যকার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বড় প্রভাব রাখবে। রাশিয়ান রুবল এবং চীনের ইয়ুয়ান ক্রমেই আন্তর্জাতিক মুদ্রার স্বীকৃতি পেতে শুরু করেছে। ডলারের আধিপত্য এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বাণিজ্যের পথ এই রাষ্ট্রগুলোর জন্য এখন আর বড় সমস্যা নয়। তৃতীয় সুবিধাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন মুদ্রানীতির ফলে এই অঞ্চল থেকে অনেক বিনিয়োগকারী তাদের বিনিয়োগ তুলে নিতে শুরু করেছে। এশিয়ার উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো তাই নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছে।
ভূ-অর্থনৈতিক দিক থেকে ভারত রুপিকে আন্তর্জাতিকীকরণের মাধ্যমে একাধিক সুবিধা অর্জন করতে পারবে। বিনিময় হারের অনিশ্চয়তা দূরীকরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সচল রাখা তাদের জন্য সহজ হবে। তা ছাড়া রুপির মাধ্যমেই তারা আন্তর্জাতিক মুদ্রা ও অর্থনৈতিক সম্পদ সংগ্রহ করতে পারবে। ভারতের ভেতর বাণিজ্যের প্রসার এখন আরও সুসংহত হবে। তা ছাড়া অভ্যন্তরীণ ব্যবসাও এখন সহজেই বিনিয়োগ আকর্ষণ করছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই ডলার আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে স্বীকৃত এবং বিভিন্ন রাষ্ট্র তাদের রিজার্ভে এই মুদ্রা সংরক্ষণ করে থাকে। কিন্তু সম্প্রতি ডলার তার আধিপত্য হারাতে শুরু করেছে। এ কথা সত্য, ডলারের আধিপত্য কমাতে বাংলাদেশ-ভারতের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সামান্য অবদানই রাখে। কিন্তু উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো ক্রমেই ডলারের ওপর আস্থা হারাতে শুরু করেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় অভ্যন্তরীণ মুদ্রা মূল্যস্ফীতি সংকটে ভুগছে। খাদ্য এবং শক্তির মূল্য বাড়তে শুরু করেছে। বর্তমানে বিভিন্ন দেশের মধ্যে বিভিন্ন মুদ্রায় বাণিজ্যের রীতি জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে।
সবশেষে বলা যায়, মার্কিন ডলারের আধিপত্য কমাতে দক্ষিণ এশিয়ার এই নিজ মুদ্রায় বাণিজ্য একটি সূচনা। তবে এও মনে রাখতে হবে, ডলারকে এড়িয়ে বাণিজ্য করার প্রক্রিয়াটি সহজ নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে ডলার তার আধিপত্য আরও অনেক দিন ধরে রাখবে তা সহজেই অনুমেয়। তা ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে এই পদ্ধতির কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য এই ঝুঁকি আরও বেশি। কারণ উদীয়মান অর্থনীতির দেশের মুদ্রার মানের গড়পতন অনেক সময় শঙ্কার। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতির রাষ্ট্র যেমন বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য সম্পর্ক ইতিবাচক দিকেই এগুচ্ছে তাই বাণিজ্যের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করা জরুরি এবং দুই পক্ষকেই লেনদেনের ক্ষেত্রে স্থিতাবস্থা অর্জন করতে হবে। ভূ-অর্থনীতির যে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো তাতে কার লাভ কতটা হবে তা নির্ণয়ে অপেক্ষা করতে হবে।
■ দ্য জিওপলিটিক্স থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত অনুবাদ : আমিরুল আবেদিন