সম্পাদকীয়
সম্পাদক
প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০২৩ ১১:০৮ এএম
বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিবেশী ভারতের রয়েছে বিস্তীর্ণ সীমান্ত। সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী
(বিএসএফ)
কর্তৃক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে শুধু দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর উচ্চ পর্যায়েই নয়,
উভয় দেশের মন্ত্রী পর্যায়েও এ পর্যন্ত বৈঠক কম হয়নি। প্রতিবারই ভারতের তরফে সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বন্ধে প্রতিশ্রুতি মিলেছে,
তবে দুঃখজনক হলেও সত্য,
এর পরও সীমান্তে হত্যাকাণ্ড ঘটছেই। ১২ জুলাই প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
গত সাড়ে পাঁচ বছরে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর গুলিতে ১৫৭ বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন। গত ৫ জুন লালমনিরহাটের কালিরহাট সীমান্তে মেসেরডাঙ্গা এলাকায় বিএসএফের গুলিতে এক যুবক প্রাণ হারান এবং বিএসএফ তার মরদেহ নিয়ে যায়। বাংলাদেশের তরফে এ ঘটনার প্রতিবাদপত্র পাঠানো হয় বিএসএফ কর্তৃপক্ষের কাছে এবং যুবকের মৃতদেহ ফেরত পাওয়ার জন্য চিঠিও দেওয়া হয়। কিন্তু হতভাগ্য ওই যুবকের মৃতদেহ ফেরত পাওয়া যায়নি,
তা জানা গেছে ওই প্রতিবেদনেই। এর আগে,
অর্থাৎ ফেব্রুয়ারিতে দিনাজপুরের হিলি সীমান্তেও একই ঘটনা ঘটে। একই মাসে ঝিনাইদহ সীমান্তে আরেকটি মর্মন্তুদ ঘটনা ঘটে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযোগ রয়েছে লাশ ফেরত না পাওয়ার।
কোনোভাবেই থামছে না সীমান্তে বাংলাদেশের নাগরিক হত্যা। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলনসহ নানা ফোরামে সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি বিএসএফের তরফে মিললেও কেন তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না, এটি প্রশ্ন বটে। আমরা জানি, প্রাণঘাতী নয় এমন অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্তও দফায় দফায় ইতঃপূর্বে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এরও বাস্তবায়ন দৃশ্যমান নয়। অভিযোগ রয়েছে এ ব্যাপারে বিএসএফের সদিচ্ছার ঘাটতির। এও অভিযোগ আছে, যারা সীমান্তে আসা-যাওয়া কিংবা অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করেন, তার সংখ্যা বাংলাদেশির চেয়ে ভারতীয়দেরই বেশি। এর মূল কারণ চোরাচালান। এ অভিমতও বিভিন্ন পর্যায়ে এর আগে উঠে এসেছে। সীমান্ত এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মান সীমান্তকেন্দ্রিক না করে তাদের নিজস্ব জীবন-জীবিকার পন্থা তৈরি করতে হবে। অনস্বীকার্য, ভারত বাংলাদেশের অন্যতম পরীক্ষিত রাষ্ট্র। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকার বিষয়টি গুরুত্বসহকারেই উচ্চারিত হয়। বস্তুত কয়েক দশকে দুই দেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে সীমান্ত হত্যার বিষয়টি অমানবিক বলা হলেও ভারতের তরফে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের এই চিত্র আমাদের কেবল উদ্বিগ্নই করে না, হতাশও করে। আমরা জানি, বিশ্বের প্রায় সব দেশের সীমান্তেই চোরাচালানের মতো বেআইনি তৎপরতা কমবেশি চলে আসছে। কিন্তু এর জন্য ওই সব দেশের সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের মতো মর্মন্তুদ ঘটনার নজির প্রায় নেই বললেই চলে। ভারত বাংলাদের পরীক্ষিত বন্ধুরাষ্ট্রÑ এ বক্তব্যের মধ্যে কোনো অতিরঞ্জন নেই।
মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে আমাদের মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভারতীয় সৈনিকরা যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন,
সেই অনন্য নজির প্রাণঘাতী বুলেটে ক্রমাগত ম্লান হতে থাকবে,
তা কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত নয়। যেকোনো দেশেই অবৈধ পন্থায় সীমান্ত অতিক্রম নিশ্চয়ই সমর্থনযোগ্য নয়। তবে এ অবৈধ পথ রুদ্ধের জন্য প্রচলিত আইন ও দণ্ডের বিধান রয়েছে। সেই পথ অনুসরণ না করে বন্ধুত্বের আবহ দুই দেশের বিস্তীর্ণ সীমান্তরেখায় ফিরে ফিরে যেভাবে হোঁচট খাচ্ছে,
তা প্রত্যাশার বাইরে। উভয় দেশের আইন অনুযায়ী অবৈধ পথ অবলম্বনকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচারের বিধান থাকা সত্ত্বেও কেন দেখামাত্র গুলি করার কথা মাথায় আসবে,
এও অচিন্তনীয়। আমরা চাই উভয় দেশ আইনি কাঠামোর বিধিবিধান অনুসরণ করে জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুক। সীমান্তে হত্যার ঘটনা স্পষ্টতই যে মানবাধিকারের লঙ্ঘন,
এও আর বলার অপেক্ষা রাখে না। উদ্বেগজনক পরিস্থিতির নিরসনকল্পে সুসম্পর্কের স্বার্থের বিষয়টি অগ্রভাগে রেখে অবশ্যই এর স্থায়ী সমাধানের পথ নির্ণয়ের বিকল্প নেই।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক শীতল নাকি উষ্ণ এ বিষয়টি নির্ণয়ের জন্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন কিংবা উভয় দেশের দায়িত্বশীলদের প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর না করে আমলে নিতে হবে কে কার উদ্বেগ কতটা গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে। আমরা চাই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন যেন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে না থাকে। সীমান্তে যেকোনো ধরনের অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনে বিচার প্রক্রিয়ার ওপর শ্রদ্ধা রেখে দীর্ঘমেয়াদি এ সমস্যার সমাধানের রাস্তা খুঁজতে হবে। সীমান্তকে সম্প্রীতির সূচনা রেখায় পরিণত করতে এর কোনো বিকল্প নেই।